সম্পাদকের পাতা

পামারস গ্রীনের এক প্রভাতে নিভে গেলো ৫টি জীবন

নজরুল মিন্টো

শাহজাহান মিয়ার পরিবার

উত্তর লন্ডনের এক প্রান্তে অবস্থিত পামারস গ্রীন। শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে, মাঝারি আকারের এই আবাসিক এলাকাটি যেন লন্ডনের প্রাণের একটু বিশ্রামস্থল। এখানে নানা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বাস করে। ব্রিটিশ শ্বেতাঙ্গদের পাশে বসবাস করে তুর্কি, কুর্দি, সোমালি, বাংলাদেশি, ভারতীয়, ও আফ্রিকান অভিবাসীরা।

নিচু দোতলা, তিনতলা ফ্ল্যাট আর তার নিচে ছোট ছোট দোকান বা রেস্তোরাঁ এটাই এই পাড়ার ছন্দ। সেখানেই ছিল “দীপালী” নামের এক বাংলাদেশি মালিকানাধীন রেস্তোরাঁ, যার ওপরে বসবাস করত মালিক ও তার পরিবার। ফ্ল্যাটটি ছিল একটি বড় ভিক্টোরিয়ান ভবনের অংশ, যেটি ব্রুমফিল্ড পার্কের বিপরীতে অবস্থিত।

১৯৯৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ভোরে এই বহুসাংস্কৃতিক পাড়ার সবকিছু বদলে যায়। পামারস গ্রীনের শান্ত সকালে হঠাৎ ছুটে আসে আগুনের লেলিহান শিখা, আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিভে যায় পাঁচটি জীবন। যে পাড়ায় প্রতিদিনের সকাল শুরু হতো দোকানের শাটার ওঠার শব্দে, শিশুদের হাসিতে, সেই সকালটিই সেদিন পরিণত হয়েছিল এক বিভীষিকায়। ধোঁয়া আর আর্তচিৎকারে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল গোটা এলাকা। একটি পরিবারের স্বপ্ন, এক কমিউনিটির হৃদস্পন্দন, সবকিছু যেন মুহূর্তেই পুড়ে ছাই হয়ে গেল।

মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার কদমহাটা গ্রামের শাহজাহান মিয়া মাত্র ৮ বছর বয়সে চলে আসেন পিতার কাছে লন্ডনে। পিতার ইচ্ছে ছিল, ছেলেকে নিজের কাছে এনে পড়ালেখা শেখাবেন, বড় করবেন।

লন্ডনে এসে শাহজাহান মিয়া পড়াশোনার পাশাপাশি কাজও শুরু করেন। জীবন সহজ ছিল না, কিন্তু স্থির ছিল। সাত বছর আগে রুখসানা নামে এক তরুণীকে বিয়ে করেন, যিনি দেখতে যেমন সুন্দরী, তেমনি স্নেহময়ী। তাদের সন্তানেরা হলো মিশকাত, শামির আর নবজাতক মেরি। মেরির জন্ম হয়েছিল বড়দিনে, ২৫ ডিসেম্বর।

শাহজাহান ছিলেন দীপালী রেস্তোরাঁর অংশীদার। কর্মঠতা, বন্ধুবৎসল আচরণ ও কমিউনিটির প্রতি দায়িত্ববোধের জন্য তিনি এলাকার একজন প্রিয় মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। এমনকি বৃটেনের প্রতিরক্ষা সচিব মাইকেল পোরটিলো ছিলেন দীপালী রেস্তোরাঁর নিয়মিত ক্রেতা।

এক প্রতিবেশী জানান, “পোরটিলো প্রায়ই সেখানে খেতে যেতেন। রেস্তোরাঁটি যখন ১০ বছর আগে নতুন করে সাজানো হয়, তখন থেকেই তিনি সেখানে যাতায়াত শুরু করেন। পরবর্তীতে তাঁর সঙ্গে শাজাহান মিয়ার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।”

দীপালীর জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে, ১৯৯৪ সালে জর্জ আব্রাহাম নামে রাশিয়ার এক ব্যবসায়ী ৭৫০ পাউন্ড খরচ করে মস্কো থেকে উড়ে এসেছিলেন শুধু এই রেস্তোরাঁয় খেতে। পরে তিনি রেস্তোরাঁ থেকে নিজের প্রিয় ১০টি কারি রাশিয়ায় পাঠাতে আরও ৩০০ পাউন্ড খরচ করেন। আবার একবার শাহজাহান নিজেই কারি নিয়ে গিয়েছিলেন কানাডায় এক বিশেষ অনুষ্ঠানে।

ফেব্রুয়ারির সেই শনিবার রাতে কিছুই অস্বাভাবিক ছিল না। শীত একটু কমে এসেছে। রুখসানা শিশু মেরিকে দুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়েছিলেন। চার বছরের মিশকাত খেলতে খেলতে বিছানায় গিয়েছিল। ১৭ মাস বয়সী শামির তার ছোট ট্রাকে উঠে “ব্রুম ব্রুম” করছিল। শাহজাহান মিয়া দেরিতে ফিরেছিলেন রেস্তোরাঁর কাজ শেষ করে। প্রতিদিনের মতোই শান্তিপূর্ণ ছিল রাতটি; অন্তত তাই মনে হচ্ছিল।

কিন্তু ভোর যখন আলো দেখেনি, তখনই বাতাসে ভেসে এলো ধোঁয়ার গন্ধ। সকাল সাতটারও আগে আগুন ছড়িয়ে পড়ে ফ্ল্যাটজুড়ে, আর কয়েক মুহূর্তেই এক নিস্তব্ধ রাত রূপ নিল এক মর্মান্তিক ভোরে।

নিচতলার ভাড়াটিয়ারা ধোঁয়া দেখতে পেয়ে বেরিয়ে যান। কিন্তু দ্বিতীয় তলার একমাত্র দরজাটি ছিল বন্ধ; আর ভেতরে আটকে থাকে পরিবারটি।

ফায়ার সার্ভিস জানায়, শাহজাহান ও রুখসানা ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাসে ভরা ফ্ল্যাটের ভেতর সন্তানদের বাঁচাতে মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলেন। শাহজাহান মিয়ার মৃতদেহ পাওয়া যায় হলওয়েতে। সম্ভবত তিনি দরজা খুলতে গিয়েছিলেন। রুখসানা কোলে মেরিকে নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন শয়নকক্ষে, হয়তো জানালার দিকে, কিন্তু জানালাটি ছিল লোহার গ্রিলে আটকানো।

চার বছরের মিশকাত এবং ছোট শামির বিছানায় নিথর পড়ে ছিল। রুখসানা ও শিশু মেরিকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় তাঁদের পাশেই মেঝেতে।

ফায়ার সার্ভিসের মুখপাত্র বলেন, “একটি পুরো পরিবারকে এমনভাবে পাওয়া ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। ফ্ল্যাটের অর্ধেকের বেশি অংশ এবং ছাদের ৫০ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। ধোঁয়া, আগুন এবং প্রচণ্ড তাপের কারণে উদ্ধার কাজ ছিল অত্যন্ত কষ্টকর।”

যখন খবর ছড়ায় পামারস গ্রীনের বাংলাদেশি মহল্লায়, তখন মানুষ বিশ্বাস করতে পারেনি। সকালের চায়ের কাপ হাতে প্রতিবেশীরা ছুটে যান দীপালীর সামনে। ফ্ল্যাটের জানালায় তখনও কালো ধোঁয়ার দাগ। ভেতরে পড়ে আছে পোড়া খেলনা, গলে যাওয়া বিছানা, এবং একটি পরিবারের স্বপ্ন।

সংবাদপত্রের হেডলাইন হয়: “Family of five perish in North London flat fire.”

লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সহায়তায় ২৮ ফেব্রুয়ারি তাদের মরদেহ কফিনবন্দী অবস্থায় দেশে পাঠানো হয়। পৌঁছায় সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। মৌলভীবাজার জেলার রাজনগরের কদমহাটা গ্রামে একসঙ্গে পাঁচটি জানাজা সম্পন্ন হয়। বাবা-মা আর তিনটি শিশুর দেহ পাশাপাশি কবরস্থ করা হয়।

এই মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি অভিবাসী জীবনের অনিবার্য ঝুঁকির প্রতিচ্ছবি। লন্ডনের বহু অভিবাসী পরিবার ছোট ছোট ফ্ল্যাটে গাদাগাদি করে থাকেন, যেখানে নেই যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, নেই পর্যাপ্ত নির্গমন পথ। কিন্তু জীবন আর স্বপ্নের টানে এসব ঝুঁকি নিয়েই তাদের জীবন তারা পার করছেন।

মাত্র ছ’মাস আগে শাহজাহান মিয়া দেশ থেকে ঘুরে এসে বলেছিলেন, “রুখসানা, পরের বছর ঈদটা দেশে করব।”

রুখসানা হাসি দিয়ে বলেছিলেন, “মেরি একটু বড় হোক, তারপর।”

কিন্তু সেই ‘তারপর’ আর এলো না।

বি.দ্র. আনুষ্ঠানিক তদন্ত রিপোর্টে (London Fire Brigade ও স্থানীয় সংবাদ সূত্র অনুযায়ী) আগুনের সঠিক উৎস নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়নি, তবে সবচেয়ে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বৈদ্যুতিক ত্রুটি (electrical fault) বা রান্নাঘরের কোনো যন্ত্রপাতি থেকে শর্ট সার্কিট–এর কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।


Back to top button
🌐 Read in Your Language