সম্পাদকের পাতা

ভালবাসার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছেন জাস্টিন ট্রুডো ও কেটি পেরি

নজরুল মিন্টো

প্যারিসে কেটির জন্মদিনে জাস্টিন

প্যারিসের শরতের রাত, হালকা বাতাসে ভেসে আসছিল দূরের সংগীত। সেন নদীর তীরে আলো-ছায়ার আবেশে দেখা গেল দু’টি অবয়ব। একজন বিশ্বের অন্যতম পপস্টার কেটি পেরি, আর অন্যজন কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। দু’জনের হাত একে অপরের হাতে জড়িয়ে, মুখে নির্ভার হাসি। ক্যামেরার ফ্ল্যাশে মুহূর্তটা বন্দি হলো, আর ঠিক সেখান থেকেই শুরু হলো নতুন এক গল্প—“কেটি পেরির প্রেমে পড়েছেন ট্রুডো।” রাজনীতির মঞ্চ পেরিয়ে সাবেক কানাডীয় প্রধানমন্ত্রীর জীবনে প্রেমের নতুন অধ্যায়।

খবরটি ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগেনি। People Magazine লিখল, “The relationship is already fairly serious।” The Guardian বিশ্লেষণ করল, “A pop star and a politician, a romance that blurs fame and power।” সারা বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে হঠাৎই আবার ফিরে এল ট্রুডোর নাম, তবে এবার রাজনীতি নয়, ভালোবাসার খবরে।

২৫ অক্টোবর ২০২৫, দিনটি ছিল কেটি পেরির ৪১তম জন্মদিন। প্যারিসের সেই রাতে যেন কেটির জন্মদিনের সঙ্গে জাস্টিনের নতুন জীবনেরও সূচনা ঘটে।

কেটির ইয়ট Caravelle–এর ডেকে জাস্টিন ও কেটি

প্যারিসের সেই সন্ধ্যার অনেক আগেই, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়েছিল এই গল্প। মন্ট্রিয়লের একটি রেস্তোরাঁ Le Violon–এর মৃদু আলোয় পিয়ানোর সুরে ভেসে যাচ্ছিল সন্ধ্যাটা। টেবিলে লবস্টার আর ওয়াইন সাজানো, আর কথার বিষয় ছিল না রাজনীতি বা সংগীত, ছিল কেবল মানুষ, সময় এবং জীবনের ছোট ছোট উপলব্ধি। রেস্তোরাঁর অতিথিরা বুঝতেও পারেননি, তাঁদের পাশের টেবিলে ইতিহাসের দুই নাম প্রথমবার মুখোমুখি বসেছে। খাবার শেষে কেটি ও জাস্টিন রান্নাঘরে গিয়ে শেফকে ধন্যবাদ জানালেন। বাইরে তখন অপেক্ষা করছিল পাপারাজ্জিদের ক্যামেরা, আর সেখানেই ধরা পড়ে তাঁদের প্রথম একান্ত মুহূর্ত।

এর কিছুদিন পরেই মন্ট্রিয়লের বেল সেন্টারে কেটির কনসার্টে উপস্থিত ছিলেন ট্রুডো। জনসমুদ্রের মাঝে, পাশে তাঁর কিশোরী কন্যা এলা-গ্রেস। কেটি যখন গাইছিলেন “Cause baby, you’re a firework…”, তখন আলোয় ঝলমল মঞ্চের দিকে তাকিয়ে জাস্টিনের চোখে ধরা পড়েছিল অদ্ভুত এক উচ্ছ্বাস। রাজনৈতিক ব্যস্ততা, প্রোটোকল, নিরাপত্তা ভুলে তিনি তখন শুধু এক দর্শক, এক পিতা, এবং হয়তো একজন সম্ভাব্য প্রেমিক।

সোফি ও জাস্টিনের বিয়ে হয় রাজকীয় আয়োজনে

অল্পদিন পর, ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা বারবারার সমুদ্রতীরে তাঁদের আবার দেখা যায়। কেটির ইয়ট Caravelle–এর ডেকে। রোদে চকচকে জলের ওপর ভেসে থাকা সেই বিকেলে, কেটির হাসি আর ট্রুডোর স্বস্তির মুখে যেন ছুঁয়ে যাচ্ছিল এক অচেনা প্রশান্তি। তিনি জিনস পরে ছিলেন, যা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় রসিকতা কম হয়নি, “Jeans at sea, oh JT nooo!” তবু সেই মুহূর্তে ট্রুডোর চোখে ছিল এক দীর্ঘ সময় পরের মুক্তি। এক চুম্বন, এক হাসি, এক নীরব আলিঙ্গন, মিডিয়া সেটিকে নাম দিল “The Pop-Politics Love Story of the Year।”

এই নতুন গল্পের নিচে ছিল পুরোনো এক নদীর স্রোত। সোফি গ্রেগোয়ার নামের এক নারীর স্মৃতি, যার সঙ্গে ট্রুডোর জীবন একসময় গড়ে উঠেছিল কানাডার ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত প্রেমকাহিনি হয়ে।

সোফি ও জাস্টিন

সোফি ছিলেন মন্ট্রিয়লের একজন টেলিভিশন সাংবাদিক, প্রাণবন্ত, তীক্ষ্ণবুদ্ধি আর দৃঢ়চেতা এক নারী। শৈশব থেকেই ট্রুডো পরিবারকে চিনতেন তিনি, আর বছর পনেরো পর এক দাতব্য অনুষ্ঠানে পুনর্মিলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁদের প্রেম। ২০০৫ সালের ২৮ মে, মন্ট্রিয়লের একটি গির্জায় তাঁদের বিয়ে হয় রাজকীয় আয়োজনে। ঘোড়ার গাড়ি, ব্যাগপাইপের সুর, কানাডার ঐতিহ্যবাহী পোশাক, আর ভেতরে কেবল দুটি তরুণ হৃদয়ের প্রতিশ্রুতি। সোফি তখন বলেছিলেন, “আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবতী নারী।”

বিয়ের পর তাঁদের সংসারে আসে তিন সন্তান—জেভিয়ার, এলা-গ্রেস ও হ্যাড্রিয়ান। একদিকে ট্রুডোর রাজনৈতিক উত্থান, অন্যদিকে পরিবারের উষ্ণতা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দু’টি জগতের দূরত্ব বেড়ে যায়। রাজনীতি, ভ্রমণ, দাপ্তরিক সভা সব মিলিয়ে সম্পর্কের মধ্যে ফাটল দেখা দেয়, যা শুরুতে কেউ টের পায়নি।

তিন সন্তান সহ সোফি ও জাস্টিন

২০১৫ সালে ট্রুডো যখন কানাডার প্রধানমন্ত্রী হলেন, তখন তাঁদের দাম্পত্যকে দেখা হয়েছিল এক ‘পারফেক্ট মডেল ম্যারেজ’ হিসেবে। অথচ সেই দীপ্ত দম্পতির ছবির আড়ালে জমতে শুরু করেছিল অদৃশ্য দূরত্ব। সোফি নিজেও পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “Public life is a blessing and a burden; you live for everyone but yourself।”

২০২৩ সালের আগস্টে তাঁরা একসঙ্গে ইনস্টাগ্রামে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন “After many meaningful and difficult conversations, we have decided to separate।” প্রধানমন্ত্রী দপ্তর নিশ্চিত করে তাঁরা একটি আইনি বিচ্ছেদ চুক্তিতে সই করেছেন। তবে সন্তানদের লালনপালন উভয়ের যৌথ দায়িত্বেই থাকবে।

একই ছাদের নিচে না থেকেও তাঁরা পরিবারকে ভাঙতে দেননি। সোফি পরে বলেন, “We are still bound by love, respect, and the smiles of our children।”

বিচ্ছেদের এক বছর পর, ২০২৪ সালের মে মাসে, সোফি এক পডকাস্টে খোলাখুলি বলেন “It hurts deeply because we are taught that marriage means success, and separation means failure।” তাঁর কণ্ঠে তখন এক ধরনের ক্লান্তি, কিন্তু সেই ক্লান্তির ভেতরেই ছিল শান্তি। যেমন হয় দীর্ঘ শীত শেষে সূর্যের প্রথম রোদে গা ভেজানোর প্রশান্তি।

ব্রিটিশ অভিনেতা অরল্যান্ডো ও কেটি

জাস্টিন ট্রুডো এ সময় রাজনীতির থেকেও ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিলেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ঘোষণা দেন লিবারেল পার্টির নেতৃত্ব থেকে তিনি সরে দাঁড়াবেন। এক দশকের ক্ষমতা, অগণিত দায়িত্ব, আর একাকিত্বের ভারে ক্লান্ত হয়ে তিনি বলেন, “It’s time to give others a chance to lead, and for me to rediscover life।”

এই পুনরাবিষ্কারের পথে তিনি যে একজন শিল্পীর সঙ্গে দেখা পাবেন, হয়তো তা নিজেও ভাবেননি। কিন্তু জীবনের নিয়মই এমন; কখনো তা রাজনীতির মঞ্চে শুরু হয়, কখনো একটি গানের সুরে। কেটি পেরি, যিনি তখন নিজের জীবন থেকেও এক অধ্যায় বন্ধ করছিলেন, তাঁর ভেতরেও ছিল হারানোর বেদনা। অরল্যান্ডো ব্লুমের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছিল ঠিক সেই সময়েই।

সুপরিচিত ব্রিটিশ অভিনেতা অরল্যান্ডো ব্লুম, যিনি ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস’ এবং ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান’ ছবির মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছেন। ২০১৯ সালে কেটি ও অরল্যান্ডোর বাগদান হয়, এবং ২০২০ সালে তাঁদের কন্যা ডেইজি ডাভ ব্লুমের জন্ম হয়। তবে পাঁচ বছরের মধ্যেই, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে, তাঁরা বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন। সম্পর্কের অবসান ঘটলেও সেটি ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ, কিন্তু ততদিনে কেটির জীবন আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে এক নীরব বিষণ্ণতায়।

সম্ভবত ঠিক এই জায়গাতেই কেটি আর জাস্টিনের জীবনের ছেদরেখাগুলো মিলে যায়। দু’জনেই অতীত থেকে মুক্তি খুঁজছিলেন, এবং একে অপরের মধ্যে পেয়ে যান এক ধরনের আশ্রয়।

যখন অক্টোবরের মাঝামাঝি কেটি লন্ডনের মঞ্চে এক ভক্তের প্রস্তাবে রসিক ভঙ্গিতে বললেন, “You should have asked me about 48 hours ago” তখন দর্শকেরা হাসল, কিন্তু তার পেছনের ইঙ্গিত বুঝে ফেলল সবাই। ঠিক দুই দিন আগেই প্যারিসে তাঁকে দেখা গিয়েছিল জাস্টিন ট্রুডোর সঙ্গে।

২৫ অক্টোবর ২০২৫-এর প্যারিসের সেই রাতটি হয়তো ইতিহাসে ক্ষুদ্র এক মুহূর্ত, কিন্তু জাস্টিন ট্রুডোর জীবনে তা এক নতুন প্রভাত। একসময় যিনি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন, এখন তিনি কেবল একজন মানুষ, একজন পিতা, একজন নির্ভার প্রেমিক, একজন পথহারা নাবিক, যিনি রাজনীতির উত্তাল সাগর পেরিয়ে আবার ফিরে যাচ্ছেন জীবনের তীরে।

আর হয়তো সেই কারণেই, প্যারিসের সেন নদীর ধারে, ট্রুডোর মুখে ফুটে উঠেছিল সেই হাসি, যা কোনো প্রধানমন্ত্রীর নয়, রাষ্ট্রনেতারও নয়, বরং এক প্রেমিকের।

(তথ্যসূত্র: People Magazine, The Guardian, TMZ, Al Jazeera, Vogue, Elle, AP)


Back to top button
🌐 Read in Your Language