
যুক্তরাজ্যের উত্তর-পূর্বে ইয়র্কশায়ার অঞ্চলের বুকে দাঁড়িয়ে আছে লিডস। এ শহরে রয়েছে শিল্পবিপ্লবের উত্তরাধিকার, শিক্ষার উজ্জ্বল দ্যুতি, এবং নানা জাতি-ভাষার মানুষের সহাবস্থান। এটি এমন এক শহর, যেখানে অতীত কখনও বিলীন হয় না; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন মুখে ফিরে আসে। ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যের গাম্ভীর্য, এয়ার নদীর তীরের সবুজ আবহ, আধুনিক আকাশচুম্বী ভবন, আর বাংলাদেশি অভিবাসীদের সজীব জীবনের গল্প সব মিলিয়ে লিডস যেন এক অনন্য নগরনাট্য।
লিডসের শহরতলিতে, বিশেষত পূর্বাংশে গড়ে উঠেছে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের ঘনবসতি। এখানে বাংলাদেশি কমিউনিটি তৈরি করেছে নিজেদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক জগৎ; রেস্টুরেন্ট, গ্রোসারি, টেইলারিং, ট্যাক্সি সার্ভিস থেকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাত পর্যন্ত সর্বত্র তাদের উপস্থিতি। সত্তরের দশকে সিলেট অঞ্চল থেকে আগত অভিবাসীরাই এ সম্প্রদায়ের ভিত্তি স্থাপন করেন, যা পরে লিডস বাংলাদেশ সোসাইটি ও স্থানীয় মসজিদগুলোকে কেন্দ্র করে এক পরিপূর্ণ সমাজে পরিণত হয়।
এই প্রাণবন্ত ও ঐতিহ্যনির্ভর শহরেই, হর্টন নামক স্থানে একদিন ঘটেছিল এমন এক নৃশংস ও হৃদয়বিদারক ঘটনা, যা লিডসের প্রবাসী সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, কাঁপিয়ে দিয়েছিল গোটা যুক্তরাজ্যের বিবেক।
সামিয়া। ১৯৮৩ সালে সিলেটের জকিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। ২০০৪ সালে তার বিয়ে হয় গোলাপগঞ্জ উপজেলার মোহাম্মদ শফিক আলমগীরের সাথে, যিনি যুক্তরাজ্যের লিডসে একটি টেক-আউট রেস্টুরেন্টের (Spice Garden) মালিক ছিলেন। সামিয়ার পরিবার শফিককে “যুক্তরাজ্যের বসবাসকারী সচ্ছল প্রবাসী” বিবেচনায় পাত্র হিসেবে পছন্দ করে। এ বিয়েটি ছিল পারিবারিক পছন্দে নির্ধারিত। শফিকের পিতা মোহাম্মদ খলিল আলমগীর ১৯৮০ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। শফিক আসেন ১৯৯০ সালে। বিয়ের পর সামিয়া ইমিগ্রেশন ভিসায় ২০০৫ সালে যুক্তরাজ্যে আসেন।
যুক্তরাজ্যে আসার পর সামিয়া লিডসের স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা শেষে সমাজবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর স্থানীয় একটি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। পাশাপাশি নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করতেন স্থানীয় একটি কমিউনিটি সেন্টারে। তিনি পশ্চিমা পোশাক পরতেন, বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন, সামাজিক কর্মকান্ডে অংশ নিতেন। শফিকের পরিবার সামিয়ার স্বাধীনচেতা জীবনযাপনকে “অগ্রহণযোগ্য” হিসেবে দেখতে শুরু করে। ধীরে ধীরে তার ওপর পরিবারিক চাপ সৃষ্টি হয়। শুরু হয় সংঘাত।
শফিক তাকে শিক্ষকতার চাকরি ছাড়তে বাধ্য করেন, যদিও অনেক কষ্টে সামিয়া পরে চাকরি ফিরে পান। শফিক তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেন বলে সামিয়া ২০১৫ সালে প্রথমবার পুলিশে রিপোর্ট করেন, কিন্তু শফিকের পরিবার তাকে চাপ দিয়ে মামলা প্রত্যাহার করায়। শফিক তাকে মোবাইল ব্যবহার করতে দিতেন না, তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টও নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার জীবন যেন বন্দিত্বে পরিণত হয়।
অবশেষে তিনি লিডস উইমেন’স এইড-এর সহায়তা নেন এবং ২০১৭ সালে শফিকের বাড়ি ছেড়ে একটি সেফ হাউসে আশ্রয় নেন। তিনি ২০১৭ সালে বিবাহবিচ্ছেদের জন্য আবেদন করেন, যা তখনও আদালতে বিচারাধীন ছিল। এরই মধ্যে সামিয়া নতুন করে জীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তার স্বামীর পরিবার এই সিদ্ধান্তকে তাদের বংশের জন্য অপমান বলে বিবেচনা করেন।
এরপর থেকেই শুরু হত্যার পরিকল্পনা। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে তারা সামিয়াকে বিষ খাওয়ানোর চেষ্টা করে, কিন্তু তাতে তিনি মারা যাননি। তখনই তারা স্থির করেন, এবার সরাসরি হত্যা করতে হবে।
১ আগস্ট ২০১৮, এক দুপুর বেলা। লিডসের হর্টন এলাকায় শফিক আলমগীরের পারিবারিক বাসায় (যেখানে শফিক, তার বাবা খলিল ও ভাই আহমেদ একসাথে থাকতেন) সামিয়াকে ডেকে নেয়া হয়। তারপর শোবার ঘরে নিয়ে একটি বালিশ চেপে ধরা হয় সামিয়ার মুখে। তিনি ছটফট করেন, তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সব নড়াচড়া থেমে যায়। নিথর দেহটিকে তারা মুড়ে ফেলে একটি প্লাস্টিকের ব্যাগে।
এরপর শুরু হয় নৃশংসতার আরেক অধ্যায়; দেহ গুমের পরিকল্পনা। এক গাড়ির বুটে (ট্রাঙ্কে) রাখা হয় সামিয়ার মৃতদেহ, প্রায় ২৪ ঘণ্টা। অবশেষে ৩ আগস্ট, ইয়র্কশায়ারের হাডার্সফিল্ডের কাছাকাছি একটি গ্রামীণ রাস্তায় ফেলে দেয়া হয় দেহটি। এক পথচারী প্রথম দেখতে পান, এরপরই খবর যায় পুলিশের কাছে।
পুলিশ তদন্ত শুরু করে। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে নিশ্চিত হয়, মৃত্যুর কারণ শ্বাসরোধ। গাড়ির জিপিএস ডেটা, সিসিটিভি ফুটেজ, ফোন রেকর্ড সব বিশ্লেষণ করে ধরা পড়ে শফিক ও তার পরিবারের কৌশল। শেষ পর্যন্ত খুনের সঙ্গে জড়িত সকলকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
২০১৯ সালের নভেম্বরে লিডস ক্রাউন কোর্টে এই মামলার রায় হয়। শফিকের বাবা খলিল আলমগীর আদালতে স্বীকার করেন যে, তিনি তার ছেলেকে “স্ত্রীকে শাস্তি দেওয়ার” জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। ফোন কলে খলিল শফিককে বলেছিলেন, “এমন নারীকে জীবিত রাখা যায় না, সে আমাদের বংশের সুনাম নষ্ট করেছে।” দেবর আহমেদ আলমগীর স্বীকার করে, তিনি হত্যার পরিকল্পনা জানতেন এবং পরে দেহ লুকাতে সাহায্য করেন।
বিচারক বলেন, “এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড।” শফিক আলমগীর ও খলিল আলমগীরকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদন্ড, দেবর আহমেদকে দেয়া হয় ১৬ বছরের সাজা।
বর্তমানে শফিক ও খলিল হাইডেন Prison-এ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন (২০৪১ সাল পর্যন্ত মুক্তির সম্ভাবনা নেই)। আহমেদ ২০৩৪ সালে মুক্তির যোগ্য হবেন।
সামিয়ার মৃত্যুর পরে তার তিন সন্তানকে ((বয়স ৮, ১০ ও ১২ বছর) রাখা হয় সামাজিক সেবা বিভাগের তত্ত্বাবধানে। পরবর্তীতে তাদের অভিভাবকত্ব পান সামিয়ার ভাই। তারা এখনো গোপন পরিচয়ে বসবাস করে, নিরাপত্তার স্বার্থে। তারা আজও জানে না, কীভাবে নিভে গিয়েছে তাদের মায়ের জীবন।
বিবিসি এবং চ্যানেল ফোর এই কেস নিয়ে “Murdered for Love?” এবং “Britain’s Honour Killings” শিরোনামে প্রতিবেদন তৈরি করে।
দ্য গার্ডিয়ান এই কেসকে “যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে ভয়াবহ অনার কিলিং” বলে উল্লেখ করে।









