সম্পাদকের পাতা

বহুজাতিক জীবনের শহর ম্যানচেস্টার

নজরুল মিন্টো

ইংল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এক ঐতিহাসিক ও আধুনিক নগরী ম্যানচেস্টার। শহরটির নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে শিল্পবিপ্লবের ধোঁয়াটে আকাশ, তুলার গুদামে ব্যস্ত শ্রমিকদের মুখ, ফুটবল মাঠে গর্জে ওঠা দর্শকদের উল্লাস, আর নানা জাতি-ভাষার মানুষের রঙিন সহাবস্থান। এটি শুধু একটি শহর নয়, বরং সময়ের দীর্ঘ ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল, যেখানে প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি ভবন অতীতের প্রতিটি গল্প যেন নতুন করে শোনায়।

ম্যানচেস্টার ইংল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের হৃদয়ে অবস্থিত এবং এটি Greater Manchester নামে পরিচিত মহানগর অঞ্চলের কেন্দ্রীয় শহর। ম্যানচেস্টারের পাশেই রয়েছে ঐতিহাসিক শহর Salford, আর এই দুই শহরকে বয়ে চলা ইরওয়েল (River Irwell) নদী যেন এক অদৃশ্য বন্ধনে যুক্ত করে রেখেছে।

শিল্পবিপ্লবের সূর্যোদয় ঘটেছিল এই মাটিতেই। এখান থেকেই মানবসভ্যতা প্রথম প্রবেশ করেছিল যন্ত্রযুগে। কলকারখানার চিমনি থেকে ধোঁয়া উঠেছিল, আর সেই ধোঁয়ার ভেতর দিয়েই বিশ্ব দেখেছিল শ্রম ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ।

তবে শহরের প্রকৃত উত্থান ঘটে ১৮শ শতকের শেষভাগে, যখন ইউরোপে শুরু হয় শিল্পবিপ্লব। প্রথমে তুলা ও বস্ত্রশিল্পকে ঘিরে গড়ে ওঠে কারখানা, কলকারখানা, রেললাইন ও খালপথ। ম্যানচেস্টার তখন পরিচিতি পায় “Cottonopolis” নামে; তুলা উৎপাদনের রাজধানী হিসেবে। ইংল্যান্ডের অন্যান্য শহর তখনও ঘুমিয়ে, আর ম্যানচেস্টার তখন কারখানার বাঁশির সুরে জেগে উঠেছে নতুন দিনের প্রত্যাশায়।

সময়ের স্রোতে ম্যানচেস্টার আজ এক নতুন রূপ ধারণ করেছে। ইতিহাসের উপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে আধুনিকতা ও বৈচিত্র্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ঝলমলে ট্রামলাইন, আকাশছোঁয়া ভবন, ব্যস্ত ফুটবল স্টেডিয়াম, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, আর নদীর ধারে কফিশপ সব মিলিয়ে এটি এখন এক প্রাণবন্ত বহুজাতিক শহর, যেখানে ঐতিহ্য আর আধুনিকতা একে অপরের হাত ধরে পথ চলে।

শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান ও শিক্ষার ক্ষেত্রেও ম্যানচেস্টার হয়ে ওঠে অগ্রণী। University of Manchester আজ শুধু যুক্তরাজ্যের নয়, বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়। এখান থেকেই জন্ম নিয়েছেন বহু নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী; যেমন আর্নেস্ট রাদারফোর্ড, যিনি প্রথমবারের মতো পরমাণু বিভাজনের সফলতা দেখান, অথবা অ্যালান টুরিং, আধুনিক কম্পিউটার বিজ্ঞানের জনক।

শিক্ষার পাশাপাশি Manchester Metropolitan University ও University of Salford উচ্চশিক্ষার অগ্রভাগে অবস্থান করছে। এখানে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে ছাত্রছাত্রীরা আসে স্বপ্ন নিয়ে। বাংলাদেশ থেকেও প্রতিবছর বহু শিক্ষার্থী এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসছে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে।

ম্যানচেস্টারকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য গবেষণাগার, লাইব্রেরি ও ইনোভেশন হাব, যা তরুণ প্রজন্মকে নতুন চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতার অনুপ্রেরণা দেয়।

ম্যানচেস্টার শুধু বিজ্ঞান বা শিল্প নয়, এটি ব্রিটিশ সংস্কৃতিরও এক উজ্জ্বল কেন্দ্র। শহরটির Manchester Art Gallery, Science and Industry Museum, এবং The Lowry Theatre ইতিহাস, শিল্প ও আধুনিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন তৈরি করেছে।

সংগীতের দিক থেকে শহরটির প্রভাব বিশ্বজোড়া। ১৯৮০–৯০-এর দশকে শহরটির “Madchester” নামেই পরিচিত ছিল সংগীতপ্রেমীদের কাছে। আজও নাইটলাইফ, সংগীত উৎসব, এবং রাস্তার পারফরম্যান্স সেই ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।

যে শহরের নাম শুনলেই সারা পৃথিবী উত্তেজনায় কেঁপে ওঠে— সেটি হলো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড (Manchester United)। ওল্ড ট্রাফোর্ড (Old Trafford) যেন শুধু একটি স্টেডিয়াম নয়, এটি ইতিহাস, গর্ব ও আবেগের প্রতীক। পাশাপাশি ম্যানচেস্টার সিটি (Manchester City) ক্লাবও আধুনিক যুগে সাফল্যের শীর্ষে। ফুটবল এখানে কেবল একটি খেলা নয়, এটি শহরের আত্মপরিচয়।

রাস্তাঘাটে, স্কুলে, এমনকি দোকানেও মানুষের আলোচনায় ফুটবল থাকে। “রেড না ব্লু?” এই এক প্রশ্নই নির্ধারণ করে দেয় কে কোন দলে!

ম্যানচেস্টারের আধুনিক রূপের অন্যতম প্রতীক হলো MediaCityUK। স্যালফোর্ড কুইজ (Salford Quays) এলাকায় ইরওয়েল নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই বিশাল মিডিয়া কমপ্লেক্সটি আজ ব্রিটেনের সৃজনশীল শিল্পের হৃদয়স্থান। এটি শুধু একটি জায়গা নয়, বরং সমগ্র ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ মিডিয়া হাব, যেখানে সম্প্রচার, প্রযুক্তি, সাংবাদিকতা, নাট্য ও ডিজিটাল কনটেন্ট প্রযোজনার সঙ্গে যুক্ত হাজারো মানুষ প্রতিদিন কাজ করছে।

২০১১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া মিডিয়া সিটি আজ BBC, ITV, Channel 4, এবং University of Salford Media Department-এর গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলোর ঠিকানা। এখানে তৈরি হয় জনপ্রিয় টেলিভিশন প্রোগ্রাম, খবরের অনুষ্ঠান, ডকুমেন্টারি, শিশুতোষ ধারাবাহিক এবং বিশ্বব্যাপী প্রচারিত বিনোদনমূলক কনটেন্ট। ডিজিটাল যুগের ম্যানচেস্টারকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে এই “সৃজনশীলতার শহর” মিডিয়া সিটি।

ম্যানচেস্টারের বর্তমান পরিচয় এক বহুজাতিক মহানগর হিসেবে। এখানে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করছে। শহরের Moss Side, Cheetham Hill, Longsight, এবং Rusholme এলাকাগুলোতে নানা জাতি-ভাষার মানুষের বসবাস, যা একে করে তুলেছে এক জীবন্ত বৈচিত্র্যের চিত্রপট।

১৯৬০–৭০-এর দশকে সিলেট অঞ্চল থেকে বহু মানুষ কাজের সন্ধানে ম্যানচেস্টারে আসেন। প্রথমে তাঁরা রেস্টুরেন্ট ও টেক্সটাইল শিল্পে কাজ শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা গড়ে তোলেন নিজস্ব ব্যবসা, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠন। পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে এ শহরে।

ম্যানচেস্টারের বাংলাদেশি কমিউনিটি শুধু ব্যবসা বা রেস্টুরেন্ট শিল্পেই নয়, স্থানীয় রাজনীতি ও সমাজসেবাতেও আজ এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। একসময় যারা অভিবাসী হিসেবে এসেছিলেন শ্রমের সন্ধানে, তাঁদের সন্তান ও উত্তরসূরিরা এখন শহরের নেতৃত্বের আসনে।

বাংলাদেশি কমিউনিটির সাফল্যের অন্যতম উজ্জ্বল নাম ইকবাল আহমেদ
বাংলাদেশি কমিউনিটির সাফল্যের অন্যতম উজ্জ্বল নাম ইকবাল আহমেদ। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া এক ব্রিটিশ উদ্যোক্তা, যিনি ম্যানচেস্টারভিত্তিক সীমার্ক গ্রুপ (Seamark Group)-এর চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক খাদ্য ব্যবসায় তাঁর কোম্পানি যুক্তরাজ্যের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অবদানের জন্য তিনি OBE (Order of the British Empire) খেতাব পান এবং The Sunday Times Rich List-এ অন্তর্ভুক্ত হন। তাঁর দুই ভাই বিলাল আহমেদ ও কামাল আহমেদ-ও সীমার্ক ও আইবকো (Ibco) ফুড ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থেকে ম্যানচেস্টারের খাদ্য ও শিপিং শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
রাজনীতি ও প্রশাসনিক নেতৃত্বেও বাংলাদেশিদের পদচারণা সমানভাবে গর্বের। আফজাল খান, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ, বর্তমানে ম্যানচেস্টার গর্টন (Manchester Gorton) আসনের সংসদ সদস্য (MP)। তিনি ছিলেন ম্যানচেস্টারের প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত লর্ড মেয়র, যা শহরের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক।
যুক্তরাজ্যের প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী
আনোয়ার চৌধুরী, যিনি University of Salford-এ পড়াশোনা করেছেন, যুক্তরাজ্যের প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হাইকমিশনার হিসেবে ব্রিটিশ কূটনীতির ইতিহাসে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।
শিল্প, সংস্কৃতি ও সাহিত্যক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সন্তানদের অবদান সমানভাবে উজ্জ্বল। খ্যাতনামা লেখিকা মনিকা আলি, যাঁর পিতা বাংলাদেশি এবং মা ইংরেজ, শৈশবে গ্রেটার ম্যানচেস্টারে বেড়ে উঠেছেন। তাঁর উপন্যাসগুলোতে অভিবাসন, পরিচয় ও সংস্কৃতির সংঘাতের বাস্তবতা গভীরভাবে ফুটে ওঠে।
মানবাধিকার আন্দোলনের বিশ্বনন্দিত নাম আইরিন খান, যিনি ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি পরবর্তীতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (Amnesty International)-এর মহাসচিব হিসেবে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারের পক্ষে কাজ করেছেন।
ম্যানচেস্টারের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে এমবিই (MBE) প্রাপ্ত ব্যক্তিদের সংখ্যাও ক্রমেই বাড়ছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ফুরকান নাঈম, মুজাহিদ খান, এবং মোহাম্মদ আব্দুল মুসাব্বির; যাঁরা সমাজসেবা, দাতব্য কাজ ও মানবিক উদ্যোগে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
ফুরকান নাঈম ম্যানচেস্টার সেন্ট্রাল ফুডব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং ইয়াং ম্যানচেস্টারের ট্রাস্টি হিসেবে দরিদ্র ও তরুণ সমাজের কল্যাণে নিরলস কাজ করছেন।
মুজাহিদ খান গ্রেটার ম্যানচেস্টার লাইউটেন্যান্সির ডেপুটি লাইউটেন্যান্ট এবং স্থানীয় সরকারে পুনর্গঠন প্রকল্পে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তিনি সমাজসেবামূলক গ্রন্থ The Gift of Giving-এর লেখক হিসেবেও পরিচিত।
মোহাম্মদ আব্দুল মুসাব্বির, রচডেলের সফল রেস্টুরেন্ট উদ্যোক্তা, ২০০৪ সালে এমবিই সম্মাননা পান। বাংলাদেশে স্কুল নির্মাণের জন্য তহবিল সংগ্রহ ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ম্যানচেস্টারের বিভিন্ন টাউন যেমন Oldham, Rochdale, Stockport, Bolton, এবং Tameside এসব এলাকায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মেয়র, কাউন্সিলর ও কমিউনিটি লিডারদের সক্রিয় উপস্থিতি আজ গর্বের বিষয়। তাঁরা স্থানীয় প্রশাসনে অংশ নিয়ে সমাজ উন্নয়ন, শিক্ষা, পরিবেশ, তরুণদের কল্যাণ এবং বৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাঁদের উপস্থিতি প্রমাণ করে, অভিবাসন কোনো সীমাবদ্ধতা নয়; বরং সঠিক শিক্ষা, নিষ্ঠা ও সাহস থাকলে যে কেউ সমাজের নেতৃত্বে আসতে পারে।

ম্যানচেস্টারে ধর্মীয় সহাবস্থান এক অনন্য উদাহরণ। এখানে মসজিদ, গির্জা, মন্দির ও সিনাগগ একসঙ্গে অবস্থান করছে শান্তিপূর্ণভাবে। Manchester Central Mosque, Didsbury Mosque, এবং Victoria Park Mosque এসব জায়গা শুধু উপাসনার স্থান নয়, বরং সামাজিক সংহতির কেন্দ্রও বটে।

কানাডার বিখ্যাত কফি ব্র্যান্ড টিম হর্টনের সুবাস এখন ছড়িয়ে পড়েছে ম্যানচেস্টারের বাতাসে।

ম্যানচেস্টারের পরিবহনব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত। শহরজুড়ে রয়েছে tram network, railway line, এবং double-decker bus service। Manchester Airport ইউরোপের অন্যতম ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যা বিশ্বের নানা প্রান্তের সঙ্গে এই শহরকে যুক্ত করেছে। ম্যানচেস্টার বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশ বিমানের সরাসরি ফ্লাইটে সিলেটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্রিটেনের উত্তরাঞ্চল।

এখানকার মানুষ বন্ধুবৎসল, সংস্কৃতিপ্রেমী এবং উদার। শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম একদিকে ঐতিহ্যকে সম্মান করে, অন্যদিকে নতুন প্রযুক্তি ও পরিবর্তনের স্রোতে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে।

বাংলাদেশিসহ অসংখ্য অভিবাসী আজ এই শহরের বুকে নতুন স্বপ্ন গড়ে তুলছে, নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলছে আধুনিক শিক্ষায় ও মানসে। তাই ম্যানচেস্টার শুধু ইংল্যান্ডের নয়, এটি পুরো বিশ্বের এক ক্ষুদ্র প্রতিরূপ; যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিশ্রম একসঙ্গে বুনে যাচ্ছে মানবতার নতুন গল্প।


Back to top button
🌐 Read in Your Language