সম্পাদকের পাতা

জ্ঞান ও ঐতিহ্যের অনন্ত প্রতীক অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়

নজরুল মিন্টো

ইংল্যান্ডের দক্ষিণে, টেমস নদীর শান্ত তীরে বিস্তৃত অক্সফোর্ড (Oxford)—এক শহর, যেখানে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শিক্ষার আলোকরশ্মি মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য আবহ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই শহরকে ঘিরে রয়েছে জ্ঞানের নিরন্তর অন্বেষণ, গবেষণার পরিশ্রম আর মেধার দীপ্তি।

অক্সফোর্ড শুধু একটি শহর নয়, এটি যেন এক জীবন্ত ইতিহাসগ্রন্থ, যেখানে প্রতিটি স্থাপনা, প্রতিটি রাস্তা সাক্ষী জ্ঞানের বিকাশের গল্পের। ইউরোপীয় সভ্যতার হাজার বছরের যাত্রায় অক্সফোর্ড হয়ে উঠেছে এক প্রতীক; চিন্তার স্বাধীনতা, বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ও মানবতার চর্চার নিদর্শন। আর এই শহরের হৃদয়ে অবস্থান করছে বিশ্বের প্রাচীনতম ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় (University of Oxford); যা আজও জ্ঞানের মশাল হাতে এগিয়ে নিয়ে চলছে সভ্যতার অগ্রযাত্রা। এখানে শিক্ষা কেবল পেশাগত নয়, এটি এক অন্তর্দীপ্ত সাধনা, যার আলো যুগে যুগে ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র বিশ্বে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা প্রায় ১০৯৬ খ্রিস্টাব্দে, যখন ইংল্যান্ডে সংগঠিতভাবে উচ্চশিক্ষা প্রদানের প্রথম চর্চা শুরু হয়। এটি ইউরোপের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম।

১১৬৭ সালে রাজা হেনরি দ্বিতীয় ইংরেজ ছাত্রদের প্যারিসে পাঠানো নিষিদ্ধ করলে অনেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক দেশে ফিরে এসে অক্সফোর্ডে পাঠদান শুরু করেন। এভাবেই গড়ে ওঠে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি শুধু ইংল্যান্ডই নয়, সমগ্র ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্ব তার ঐতিহাসিক গ্রন্থাগার ও জাদুঘরসমূহ। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো Bodleian Library, যা ১৬০২ সালে প্রতিষ্ঠিত। এখানে সংরক্ষিত আছে এক কোটি ত্রিশ লক্ষ বই, পাণ্ডুলিপি ও ঐতিহাসিক দলিল, যার মধ্যে রয়েছে গ্যালিলিও, শেক্সপিয়র ও নিউটনের মূল লেখাও। একইভাবে Ashmolean Museum ইউরোপের প্রথম পাবলিক জাদুঘর, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন সভ্যতার শিল্পকর্ম ও প্রত্নবস্তু প্রদর্শিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ডকে জ্ঞানের পাশাপাশি সংস্কৃতির এক জীবন্ত কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

2D90W44 Oxford city centre – Shoppers in Oxford city centre at Junction of High street Queen street St Aldates and Cornmarket street Oxford UK GB UK Europe

অক্সফোর্ডের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর কলেজভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয়টি কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হলেও শিক্ষার্থীরা যুক্ত থাকে বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত কলেজের সঙ্গে। বর্তমানে এখানে রয়েছে প্রায় ৪৫টি কলেজ ও ছয়টি স্থায়ী প্রাইভেট হল (Permanent Private Hall)। প্রতিটি কলেজের নিজস্ব ইতিহাস, স্থাপত্য, আবাসন ও পাঠদান পদ্ধতি রয়েছে। উল্লেখযোগ্য কলেজগুলোর মধ্যে আছে — Christ Church, Magdalen College, Balliol College, Trinity College, St John’s College, University College ইত্যাদি। এই কলেজ ব্যবস্থার কারণে প্রতিটি শিক্ষার্থী একটি ছোট, ঘনিষ্ঠ সমাজে শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পায়, যা অক্সফোর্ডের শিক্ষাপদ্ধতিকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বমানের শিক্ষার প্রতিমূর্তি। এখানে প্রতি বছর প্রায় ২৫,০০০ শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়ন করে, যার মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী।

শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্র বিস্তৃত—মানবিক, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি পর্যন্ত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব মেডিসিন, ম্যাথেমেটিক্যাল ইনস্টিটিউট, সাইদ বিজনেস স্কুল এবং হিউম্যানিটিজ ডিভিশন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রাক্তন ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন অসংখ্য নোবেল বিজয়ী, প্রধানমন্ত্রী, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী ও দার্শনিক, যাঁদের অবদান মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় গভীর প্রভাব ফেলেছে। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—স্যার আইজ্যাক নিউটন (পদার্থবিজ্ঞানী), স্টিফেন হকিং (পদার্থবিদ), অস্কার ওয়াইল্ড (সাহিত্যিক), জে.আর.আর. টলকিন ও সি.এস. লুইস (কল্পকাহিনির স্রষ্টা), বিল ক্লিনটন, টনি ব্লেয়ার, ডেভিড ক্যামেরন, বোরিস জনসন, মার্গারেট থ্যাচার (বিশ্বনেতা), টি. এস. এলিয়ট, গ্রাহাম গ্রিন, ডোরিস লেসিং (সাহিত্যিক), জন লক, অ্যাডাম স্মিথ, থমাস হবস (দার্শনিক), রবার্ট হুক (বিজ্ঞানী), টিম বার্নার্স-লি (World Wide Web-এর উদ্ভাবক), রিচার্ড ডকিন্স (জীববিজ্ঞানী), এবং লর্ড কিউরজন (ব্রিটিশ ভাইসরয়)।

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেও অক্সফোর্ডের প্রভাব গভীর। ইন্দিরা গান্ধী, অং সান সু চি, ড. কামাল হোসেন, মনমোহন সিং, অমর্ত্য সেন, বেনজির ভুট্টো, ও ইমরান খান—প্রত্যেকে তাঁদের নিজ নিজ দেশে নেতৃত্ব ও চিন্তার জগতে অক্সফোর্ডীয় মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অক্সফোর্ডে পড়াশোনার আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। Rhodes, Commonwealth, Chevening ও বিভিন্ন রিসার্চ ফেলোশিপের মাধ্যমে বহু বাংলাদেশি শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করছেন। কেউ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করছেন, কেউ পরিবেশবিজ্ঞান, অর্থনীতি বা জনস্বাস্থ্য বিষয়ে। তাঁদের অনেকে পরবর্তীতে দেশে ফিরে নীতি-নির্ধারণ, শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। এভাবেই অক্সফোর্ডের আলো বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়ছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি এক পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীজীবনের শহর। শহরজুড়ে ছড়িয়ে আছে পাথরের রাস্তা, প্রাচীন ভবন, বইয়ের দোকান, ক্যাফে ও নদীতীরের সবুজ মাঠ। প্রতিবছর এখানে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী Oxford–Cambridge Boat Race, যেখানে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা টেমস নদীতে নৌকা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। ছাত্ররা এখানে শুধু পড়াশোনায় নয়, সাহিত্য, সংগীত, নাটক, বিতর্ক ও ক্রীড়াক্ষেত্রেও নিজেদের প্রতিভা বিকাশে ব্যস্ত থাকে।

অক্সফোর্ডের বাতাসে আছে এক ধরনের প্রশান্ত নীরবতা। সকালবেলায় কলেজের ঘণ্টাধ্বনি আর টেমস নদীর তীরে ভেসে বেড়ানো নৌকার সারি যেন সময়কে ধীরে চলতে শেখায়। শরতের বিকেলে ম্যাগডেলেন কলেজের বাগানে পা রাখলে মনে হয় ইতিহাসের পাতা ছুঁয়ে যাচ্ছি। বইয়ের দোকান, রাস্তার পাশের কফিশপ, প্রাচীন গির্জা আর ছাত্রদের হাসির শব্দ—সব মিলিয়ে অক্সফোর্ডের জীবন যেন এক সুরেলা কবিতার মতো।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার উৎকর্ষে দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। Times Higher Education World University Rankings ও QS World University Rankings-এ অক্সফোর্ড বহু বছর ধরে প্রথম বা দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। বিশ্বের প্রায় ১৬০টি দেশ থেকে শিক্ষার্থী এখানে অধ্যয়ন করে, যা এটিকে এক সত্যিকারের বৈশ্বিক শিক্ষা কেন্দ্র বানিয়েছে। গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও অক্সফোর্ড ইউরোপের শীর্ষে — ক্যান্সার গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন ও ভ্যাকসিন উন্নয়নে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অনন্য।

মুনির ভাই আমার দুই বছরের সিনিয়র হলেও অক্সফোর্ডে আমরা একসাথে।

সাম্প্রতিক সময়েও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় আলোচনায় এসেছে অ্যাস্ট্রাজেনেকা-অক্সফোর্ড কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের মাধ্যমে। বিশ্ববিদ্যালয়ের Jenner Institute ও Oxford Vaccine Group যৌথভাবে এই গবেষণা সম্পন্ন করে, যা পরবর্তীতে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচায়। এটি প্রমাণ করে, মধ্যযুগীয় একাডেমিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি অক্সফোর্ড আজও আধুনিক বিজ্ঞান ও মানবকল্যাণে সমানভাবে অবদান রাখছে।

সম্প্রতি টরন্টোর নাট্যব্যক্তিত্ব আহমেদ হোসেন ও ঈশাত আরা মেরুনা–র কন্যা অহমা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে অনন্য সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তার এ অর্জন শুধু পরিবারের নয়, আমাদের সবার গর্ব ও আনন্দের উৎস। জ্ঞানের এ নতুন অভিযাত্রায় অহমার প্রতি রইল আন্তরিক শুভকামনা ও সাফল্যের নিরন্তর প্রত্যাশা।

অক্সফোর্ডের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জ্ঞান কেবল তথ্যের সঞ্চয় নয়, এটি মনন, প্রশ্ন ও মানবতার চর্চা। এই বিশ্ববিদ্যালয় শিখিয়েছে কিভাবে চিন্তা স্বাধীন হতে পারে, যুক্তি হতে পারে মুক্ত, আর জ্ঞানের আলো কেবল এক জাতি বা দেশের মধ্যে নয়, সমগ্র মানবসমাজে ছড়িয়ে যেতে পারে। সময় বদলেছে, কিন্তু অক্সফোর্ডের মূল মন্ত্র আজও একই—“Sapientia et Doctrina Stabilitas”, অর্থাৎ “জ্ঞানে ও শিক্ষায় স্থিতিশীলতা।”


Back to top button
🌐 Read in Your Language