
হেলসিঙ্কিতে শীত নামলেই, উপসাগরের জলে পাতলা বরফের স্তর জমে। ট্রামের ঘণ্টা মৃদু ধাতব সুরে শহরের অবয়বকে টেনে নেয় দূরের আলোয়। শহর তখন নীরবতার অনুশীলন করে। সেনেট স্কোয়ারের সাদা সিঁড়ি তুষারে ঢেকে যায়, ভ্যান্টা নদীর হিম বাতাস জানালার কাচে হাত রাখে, আর দূরে সুমেনলিন্নার কেল্লা (Suomenlinna) রাতের কালিতে ধূসর হয়ে যায়। এই সাদা বিকেলে দূরের আলো ক্ষীণ হয়ে আসে; আর শহরজুড়ে হালকা কুয়াশার মতো ছড়িয়ে পড়ে একাকিত্ব।
সেই শহরেই ভুওসারির এক ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে বসবাস করে সালমা রব্বানি। বয়স পঁচিশের কাছাকাছি, কাঁধ অবধি কালো চুল। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার মেয়ে। ২০২৩-এর ২ এপ্রিল ইস্তানবুল হয়ে নেমেছে হেলসিঙ্কিতে। এক বছরের শিশু কোলে, চোখেমুখে তার ‘উন্নত জীবনের’ উচ্ছ্বাস।
স্বামী আহমেদ করিমের বাড়ি কুমিল্লা, এখন ফিনল্যান্ডের নাগরিক। সাইবার সিকিউরিটির চাকরি করে। রিমোট কাজের সুবিধায় বেশিরভাগ সময় থাকে ঘরেই।
শুরুটা ছিল মধুর। হাতে হাত ধরে রাস্তায় হাঁটা, শিশিরভেজা সকালে কফির কাপে উঠতো উষ্ণ ধোঁয়া, সবই ঠিক ছিল। কিছুদিন পরই, কথার ভেতর অদেখা কাঁটা গজাতে শুরু করে।
একদিন ফোনটা সালমার হাত থেকে সরে গেল স্বামীর পকেটে, আর দরজায় বসল নতুন ‘স্মার্ট লক’। সুবিধার নামে নজরদারি, যত্নের নামে নিয়ন্ত্রণ। বাজারে গেলে কথা বলা মানা, ক্যাশ কাউন্টারে হাসা মানা, আশপাশের কারও চোখের দিকে তাকানোও মানা। জানালাও হয়ে যায় নিষিদ্ধ সীমানা।
সালমার দিন বাঁধা কাজের ধারাবাহিকতায়। ভোরে শিশুকে দুধ, রান্না, ধোয়া–মোছা, আবার রান্না। দুপুরে কখনো স্বামী বাজারে নিয়ে যায়, আবার নিয়ে আসে। কোনো কোনো রাতে শিশুটি কাঁদলে জানালা সামান্য খুলে দেয়; ঠান্ডা বাতাসে শিশুর কপালে হাত রেখে শোনে দূরের ট্রামের ধাতব টিং–টিং শব্দ।
মানুষ যখন দীর্ঘদিন নীরব থাকে, দেয়ালেরও তখন কান গজায়। উপরের ফ্ল্যাটে থাকেন বৃদ্ধা মারিয়া কান্তে। এক রাতে তিনি শুনলেন নিচতলার ফ্ল্যাট থেকে শিশুর জোরে কান্না আর এক তরুণীর গোঙানির শব্দ। পরের বিকেলে আবার। তৃতীয় দিন ভোরে করিডোরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন দরজার বাইরে কেউ আসে কি না!
শহর যতই সুশীল হোক, ঘরের ভেতর ছোট ছোট অন্ধকার লুকিয়ে থাকে; এই বোধ থেকেই তিনি ফোন তুললেন। নম্বরটি নোল্লালিন্যা (ফিনল্যান্ডের ২৪/৭ সহায়তা লাইন)। অপর প্রান্তের শান্ত কণ্ঠ বলল, ‘আমরা শুনছি, আপনি বলুন।’ এরপর খুব বেশি সময় লাগেনি। সামাজিক কর্মী, পুলিশ, একজন অনুবাদক এসে দরজায় উপস্থিত।
দরজা খুলতেই ভিতর থেকে শিশুর কান্না আর নিঃশ্বাসরুদ্ধ পরিবেশটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। সালমার মুখে ফোলা, ঠোঁটে কাটা দাগ; দু’হাতে নীলচে চিহ্ন। পুলিশ ভেতরে ঢুকেই তার গায়ে উষ্ণ উলের শাল জড়িয়ে দিল, সামাজিক কর্মী শিশুটিকে কোলে নিলেন। স্বামী বলল, “এটা আমাদের ব্যক্তিগত বিষয়।” কিন্তু ব্যক্তিগততার আড়ালে যে শারীরিক নির্যাতন, তা অপরাধ—মানুষের মর্যাদার প্রশ্ন। অনুবাদক ধীর কণ্ঠে সালমাকে জানালেন, “আমরা এখনই আপনাকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি।”
শেল্টারে প্রথম রাত। একটি অচেনা বিছানা, পরিষ্কার চাদর, জানালা খোলা রাখার স্বাধীনতা। নার্স এসে শিশুটিকে পরীক্ষা করলেন; কাউন্সেলর সালমার হাতে উষ্ণ পানির গ্লাস দিয়ে বললেন ‘আপনি ঘুমান, আমরা আছি।’ সকালে ডাক্তার দেখলেন; যত্নের ভাষায় প্রশ্ন হলো, পুরোনো আঘাতের নথি তৈরি হলো। শরীরের নীলচে দাগগুলো ভোরের আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠল। যন্ত্রণারও তো প্রমাণ লাগে, বিস্তার লাগে, যাতে আইন তা পড়ে নিতে পারে সর্বোচ্চ মনোযোগে।
আইন তার মতো করে এগোতে লাগল। এক সকালে জানানো হলো ‘আপনাকে সাক্ষ্য দিতে হবে।’
আদালতের কক্ষে সে দাঁড়াল। সামনে বসে আছে সেই মানুষ, যাকে সে একদিন ভালোবেসেছিল। ভালোবাসার আরেক নাম যে ‘নিয়ন্ত্রণ’ হতে পারে, সেই পাঠটি এরই মধ্যে শেষ।
বিচারক ধৈর্য নিয়ে শুনলেন। অনুবাদক শব্দগুলিকে নিরাপদ সেতুর মতো সাজালেন।
—‘তিনি কি আপনার ফোন নিয়ন্ত্রণ করতেন?’
—‘হ্যাঁ।’
—‘আপনাকে কি বাইরে যেতে দিতেন না?’
—‘হ্যাঁ।’
বিশেষজ্ঞ সাক্ষ্য বলল, ‘এটি বিচ্ছিন্নতা; অর্থনৈতিক ও মানসিক নিয়ন্ত্রণ; জবরদস্তি শ্রমের মতো গৃহদাসত্ব।’
আহমেদ করিমকে দোষী সাব্যস্ত করে ৪ বছর ৬ মাসের কারাদণ্ড দিলেন বিচারক। সালমার অনুকূলে ৫০,০০০ ইউরো ক্ষতিপূরণ এবং সন্তানের হেফাজত তার হাতে অর্পণের নির্দেশও দেয়া হলো।
এতোদিনে সালমার ছোট বৃত্তটিও প্রসারিত হয়ে গেছে। শেল্টারে সে বিভিন্ন দেশের নারীদের দেখলো। রুশ, সোমালি, ইউক্রেনীয়, পার্সিয়ান, আর বাংলা উচ্চারণে কথা বলা কয়েকজনের সাথে তার পরিচয় হলো।
তাদের সবারই গল্প আলাদা, তবু একটিই সুর; অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরা।
Monika-Naiset–এর একজন সমাজকর্মী এসে একদিন বললেন ‘তুমি চাইলে আমাদের কোর্সে আসতে পারো, ধীরে ধীরে কাজের দক্ষতা তৈরি করো।
শহরের মানচিত্র নতুন করে সাজল। যে রাস্তা একসময় ছিল নজরদারির, তা হয়ে উঠল হাঁটার উল্লাস; যে ট্রামের ঘণ্টা একসময় দূরের অভিমান, তা হলো নিজস্বতার সুর। শিশুকে নিয়ে সালমা যায় এসপ্লানাড পার্কে। শহর যে কেবল ঠান্ডা নয়; মানুষে মানুষে উষ্ণতার মিশেল এ কথা বুঝতে বুঝতেই তার ভিতরেও জন্ম নিল এক নতুন জীবন: নিঃশ্বাস নেওয়ার প্রশস্ততা, ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা।
তারপর শুরু হলো তার পুনর্গঠনের জীবন। ভাষা ক্লাস, কাজের প্রশিক্ষণ। শিশুটি ডে-কেয়ারে নতুন বন্ধু পেল। বাচ্চার আঁকা ছবিতে নীল সূর্য, সবুজ সাগর, একখানি বাড়ি; যার জানালায় কেউ দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে হাসছে। এই জানালা আমন্ত্রণের।
জীবনের গাছটা আবার পাতায় ভরে উঠল। সে ছোটখাটো কাজ শুরু করল। একটি লাইব্রেরিতে পার্ট-টাইম সহকারী। বইয়ের অক্ষরগুলো তার কাছে শান্ত জলের মতো; লাইনের পর লাইন, ভাষার পর ভাষা। একদিন একজন ফিনিশ বৃদ্ধা এসে বললেন, ‘তুমি খুব সুন্দরভাবে সাহায্য করো।’ ধন্যবাদ বলে সালমা খানিকটা হাসলো; তার হাসির ভিতরে লুকিয়ে ছিল অনেকদিনের ধৈর্য, অনেকদিনের লড়াই। বাইরে তখন বৃষ্টি নামছে, পাতলা, ধৈর্যশীল বৃষ্টি; পৃথিবীর সব ধুলা ধুয়ে দিচ্ছে।
সন্ধ্যায় নিজের ছোট্ট রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে সে শিশুর জন্য স্যুপ তৈরি করে। কিচেনের জানালা খুলে দেয়। নিজের ভেতরে সে উচ্চারণ করে ‘আমি বেঁচে আছি, আমি স্বাধীন।’ তার চোখের কোল উষ্ণ হয়ে ওঠে, কিন্তু সে জানে এই উষ্ণতা দুর্বলতার নয়, পুনরুত্থানের।
একসময় সে লিখতে বসে। লেখার শুরুতে রাখে কয়েকটি বাক্য ‘নীরবতা কখনো কখনো মৃত্যুর সমান; কিন্তু কণ্ঠেরও তো জন্ম আছে। যে দিন আপনি কথা বলবেন, সে দিন পাহাড় সরবে।’ তারপর সে ধীরে ধীরে বলে যেতে থাকে নিজের গল্প। কিভাবে একটি শহর তাকে গিলে নিয়েছিল, আবার সেই শহরই তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। কিভাবে একজন বৃদ্ধা প্রতিবেশীর ফোন তাঁকে বাঁচিয়েছে। কিভাবে রাষ্ট্রের আইন, শেল্টারের দরজা, Monika-Naiset–এর কক্ষে বসে শোনা কথাগুলো তাকে নতুন করে গড়ে দিয়েছে।
শেষে সে লেখে ‘প্রিয় পাঠক, আপনার পাশের জানালাটিতে হয়তো আজও একটি ছোট্ট চাপা কান্না আটকে আছে। আপনি চাইলে খুলে দিতে পারেন আপনার কান, আপনার হৃদয়। যে সমাজ প্রতিবেশীর কান্না শুনে দরজায় কড়া নাড়ে, সে সমাজই নিরাপদ। যে বাড়ির জানালা খোলা হয়, সে বাড়িতেই শিশুরা শিখে আলোর ভাষা।’









