সম্পাদকের পাতা

বিশ্বের সেরা বাসযোগ্য শহরের নাম ভিয়েনা

নজরুল মিন্টো

ইউরোপের হৃদয়ে এক অনিন্দ্যসুন্দর নগরী ভিয়েনা। সংগীত, শিল্প, স্থাপত্য আর রাজকীয় ঐতিহ্যের মহিমায় ভিয়েনা যেন এক জীবন্ত ইতিহাসগ্রন্থ। একদিকে হ্যাবসবার্গ সাম্রাজ্যের শৌর্য-বীর্যের সাক্ষী, অন্যদিকে আধুনিক কূটনীতি ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র; এই শহরে অতীত ও বর্তমান মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য আবহ। “সংগীতের রাজধানী” হিসেবে বিশ্বজুড়ে খ্যাত ভিয়েনা শুধু মোৎসার্ট কিংবা বিটোফেনের শহরই নয়, বরং ক্যাফে-সংস্কৃতি, প্রাসাদ, গির্জা, জাদুঘর ও উদার মননের এক অসাধারণ মিলনভূমি। ভিয়েনায় পা রাখলেই অনুভব করা যায়, কীভাবে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আধুনিক জীবনযাত্রা একসাথে বোনা হয়েছে এক সুদৃশ্য নকশায়।

অস্ট্রিয়া (Austria) একটি স্থলবেষ্টিত দেশ। এর পূর্বে হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়া, দক্ষিণে ইতালি ও স্লোভেনিয়া, পশ্চিমে সুইজারল্যান্ড ও লিচেনস্টাইন এবং উত্তরে জার্মানি ও চেক প্রজাতন্ত্র অবস্থিত। দেশটির আয়তন প্রায় ৮৩,৮৭১ বর্গকিলোমিটার এবং এটি ইউরোপের অন্যতম ছোট কিন্তু উন্নত দেশগুলোর মধ্যে একটি। অস্ট্রিয়ার প্রায় ৬০% এলাকা আল্পস পর্বতমালায় আচ্ছাদিত, যা দেশটিকে করেছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। পাহাড়, নদী, উপত্যকা আর হ্রদের সমাহার অস্ট্রিয়াকে এক স্বপ্নীল আবেশে মুড়ে রাখে।

অস্ট্রিয়ার ইতিহাসে প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের প্রভাব লক্ষণীয়। মধ্যযুগে হ্যাবসবার্গ রাজবংশের শাসনে অস্ট্রিয়া হয়ে ওঠে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্যের কেন্দ্র। ষোড়শ থেকে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত হ্যাবসবার্গরা মধ্য ইউরোপের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে। ভিয়েনা তখন কেবল রাজধানীই নয়, বরং রাজনীতি, কূটনীতি ও সংস্কৃতির অন্যতম মিলনস্থল ছিল।

১৮৬৭ সালে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি দ্বৈত সাম্রাজ্য গঠিত হলে ভিয়েনা হয়ে ওঠে এক মহাশক্তির সদর দপ্তর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে সাম্রাজ্য ভেঙে গেলে আধুনিক অস্ট্রিয়ার সূচনা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটি ধীরে ধীরে পুনর্গঠিত হয়ে আজকের উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ভিয়েনা তখন থেকেই আন্তর্জাতিক সংস্থা, কূটনৈতিক আলোচনা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে জাতিসংঘ, ওপেক, ওএসসিই-সহ বহু আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধান কার্যালয় ভিয়েনায় অবস্থিত।

শিল্পকলার ক্ষেত্রেও ভিয়েনার অবদান অসাধারণ। বেলভেদেরে মিউজিয়াম, কুনস্টহিস্টোরিশেস মিউজিয়াম ও আলবার্টিনা আর্ট গ্যালারিতে বিশ্বের সেরা সব শিল্পকর্ম সংরক্ষিত আছে। স্থাপত্যে বারোক, রেনেসাঁ এবং আধুনিক নকশার মিশ্রণ ভিয়েনাকে দিয়েছে অনন্য সৌন্দর্য। ভিয়েনার অপেরা হাউস এবং ফিলহারমোনিক অর্কেস্ট্রা আজও বিশ্বের সেরা সংগীতানুষ্ঠানের প্রতীক।

অস্ট্রিয়ার সরকারি ভাষা জার্মান। তবে এখানকার উচ্চারণ ও শব্দচয়ন জার্মানির জার্মান ভাষার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন, যা “অস্ট্রিয়ান জার্মান” নামে পরিচিত। পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় উপভাষা প্রচলিত। ইংরেজিও শহুরে জনগোষ্ঠী ও পর্যটন খাতে বহুল ব্যবহৃত। অস্ট্রিয়ানদের সামাজিক জীবনযাপনে উৎসব ও ঐতিহ্যের গুরুত্ব অনেক। বলতে গেলে সামাজিক জীবনযাত্রার বৈশিষ্ট্য।

দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ৯ মিলিয়ন, যার একটি বড় অংশ ভিয়েনায় বাস করে। ভিয়েনা শুধু রাজধানী নয়, এটি অস্ট্রিয়ার সবচেয়ে জনবহুল শহর এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

অস্ট্রিয়া ও ভিয়েনা দুটোই পর্যটকদের কাছে অমোঘ আকর্ষণ। ভিয়েনার শোনব্রুন প্রাসাদ (Schönbrunn Palace) এবং হফবুর্গ (Hofburg) প্রাসাদ দেশের রাজকীয় ইতিহাসের সাক্ষী। সেন্ট স্টিফেন’স ক্যাথেড্রাল, বেলভেদেরে প্যালেস, মিউজিয়াম কোয়ার্টার এবং ভিয়েনা স্টেট অপেরা শহরটির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

অস্ট্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী হলো দানিউব। এটি ইউরোপের দীর্ঘতম নদীগুলোর একটি। নদীটি কেবল পরিবহন ও বাণিজ্যের জন্য নয়, বরং সংস্কৃতি ও ইতিহাসেরও এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই দানিউব নদী ঘিরে তৈরি হয়েছে অসংখ্য বিনোদন ও নৌভ্রমণের সুযোগ। দানিউব ভ্রমণ অস্ট্রিয়ার পর্যটনে অন্যতম আকর্ষণ।

শহরের ক্যাফে সংস্কৃতি বিশ্বখ্যাত; ভিয়েনার ঐতিহ্যবাহী কফিহাউস শুধু খাবার বা পানীয়ের জন্য নয়, বরং এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনস্থল হিসেবে সমাদৃত।

অস্ট্রিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা ইউরোপের অন্যতম উন্নত। ভিয়েনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইউরোপ মহাদেশের ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলোর একটি। রেলপথে দেশটি ইউরোপের প্রায় সব বড় শহরের সঙ্গে যুক্ত। ভিয়েনা থেকে বুদাপেস্ট, প্রাগ, মিউনিখ বা জুরিখ সব জায়গায় সহজেই যাওয়া যায়।

শহরের ভেতরে ট্রাম, বাস, সাবওয়ে এবং ট্রেনের সমন্বিত নেটওয়ার্ক ভ্রমণকে করেছে অত্যন্ত সহজ। ফলে স্থানীয়রা যেমন, পর্যটকরাও সহজেই শহর ঘুরে দেখতে পারেন। সাইকেল চালানোও এখানে জনপ্রিয়, কারণ শহরজুড়ে রয়েছে বিস্তৃত সাইকেলপথ।

ভিয়েনা নগরী ইউরোপের অন্যতম ব্যয়বহুল শহর হিসেবে পরিচিত। এখানে বাসস্থান, খাদ্য, যাতায়াত এবং বিনোদনের খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। রেস্তোরাঁয় একটি সাধারণ খাবারের দামও অন্যান্য ইউরোপীয় শহরের তুলনায় বেশি।

তবে শুধু খরচের দিক থেকেই নয়, ভিয়েনার উচ্চ জীবনযাত্রার মানও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। শহরটি পরপর কয়েক বছর আন্তর্জাতিক জরিপে “বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহর” হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। ভিয়েনায় বসবাস ব্যয়বহুল হলেও এর বিনিময়ে মানুষ পায় নিরাপত্তা, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক আবহের নিশ্চয়তা।

ভিয়েনা শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের অধিকারী। ইউরোপের অন্যতম প্রাচীন ও খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Vienna) ১৩৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আজও এটি ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রায় ৯০,০০০-এর বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী। ভিয়েনার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী, কারণ এখানে টিউশন ফি অনেক পশ্চিমা দেশের চেয়ে কম, যা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন। কেউ স্কলারশিপ নিয়ে, কেউবা স্ব-অর্থায়নে এখানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। বিশেষত সমাজবিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ব্যবসা প্রশাসন ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়তে আসছেন তারা। ভিয়েনার শিক্ষাঙ্গনে বহুজাতিক পরিবেশে পড়াশোনা করার ফলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা যেমন বৈশ্বিক মানের জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন, তেমনি বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীর সঙ্গে বন্ধুত্ব ও নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারছেন, যা তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে বড় সহায়ক হবে।

অস্ট্রিয়া একটি অভিবাসীবান্ধব দেশ। ভিয়েনায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এসে বসতি গড়ে তুলেছে। বিশেষ করে তুর্কি, সার্ব, বসনিয়ান ও পূর্ব ইউরোপীয় অভিবাসীরা এখানে বড় সম্প্রদায় গড়ে তুলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য, ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও অনেকে এখানে অভিবাসী হিসেবে বসবাস করছে।

বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যাও ধীরে ধীরে বাড়ছে। তারা ব্যবসা, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ছোটখাটো চাকরিসহ নানা খাতে কাজ করছে। ফলে ভিয়েনার বহুসাংস্কৃতিক সমাজে একে একে যুক্ত হচ্ছে বৈচিত্র্যময় খাদ্যসংস্কৃতি, পোশাক, ভাষা ও উৎসব।

পরবর্তী গন্তব্য: ব্রাতিস্লাভা (স্লোভাকিয়া)


Back to top button
🌐 Read in Your Language