
দানিউব নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে এক রূপময় শহর বুদাপেস্ট। এটি কেবল হাঙ্গেরির রাজধানী নয়, বরং মধ্য ইউরোপের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। হাঙ্গেরি নামটি শুনলেই যে চিত্র ভেসে ওঠে তা হলো শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস, সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, অপূর্ব স্থাপত্যশিল্প, উষ্ণ প্রস্রবণ, সুস্বাদু খাবার আর অতিথিপরায়ণ মানুষ। বুদাপেস্ট তার ভৌগলিক সৌন্দর্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য বিশ্বব্যাপী খ্যাত।
হাঙ্গেরি ইউরোপের একটি স্থলবেষ্টিত দেশ, অর্থাৎ এটি কোনো সমুদ্রের সাথে সরাসরি সংযুক্ত নয়। দেশটি মধ্য ইউরোপে অবস্থিত এবং এর চারপাশে সাতটি দেশ ঘিরে রেখেছে। উত্তরে স্লোভাকিয়া, উত্তর-পূর্বে ইউক্রেন, পূর্বে রোমানিয়া, দক্ষিণে সার্বিয়া ও ক্রোয়েশিয়া, দক্ষিণ-পশ্চিমে স্লোভেনিয়া এবং পশ্চিমে অস্ট্রিয়া। রাজধানী বুদাপেস্ট দেশের উত্তর-মধ্যভাগে, দানিউব নদীর দুই তীরে গড়ে উঠেছে। শহরটি মূলত তিন ভাগে বিভক্ত: পাহাড়ি বুদা, সমতল পেস্ট এবং ঐতিহাসিক ওবুদা।

হাঙ্গেরির ইতিহাস বহু প্রাচীন ও বৈচিত্র্যময়। প্রাথমিকভাবে এটি কেল্ট, রোমান ও হুন জাতির আবাস ছিল। ৯ম শতকে মাজার জনগোষ্ঠী এখানে বসতি স্থাপন করে এবং হাঙ্গেরি রাজ্যের জন্ম হয়। মধ্যযুগে হাঙ্গেরি ছিল এক সমৃদ্ধ রাজ্য, তবে পরবর্তীতে তুর্কি আক্রমণ, হ্যাবসবার্গ শাসন এবং দুই বিশ্বযুদ্ধ দেশটিকে নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে নিয়ে গেছে।
১৯৫৬ সালে সোভিয়েত শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের বিদ্রোহ বিশ্ব রাজনীতিতে আলোড়ন তোলে। অবশেষে ১৯৮৯ সালে কমিউনিজমের পতনের পর দেশটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়। আজ হাঙ্গেরি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও শেঙ্গেন (Schengen) জোনের সদস্য। ২০০৪ সালের ১ মে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেয় এবং ২০০৭ সালের ২১ ডিসেম্বর থেকে শেঙ্গেন চুক্তির আওতায় যুক্ত হয়।

গতকাল গভীর রাতে আমরা জাগরেব থেকে দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে বুদাপেস্টে এসে পৌঁছেছি। বাসের ভেতরে আমাদের সঙ্গী ছিল আরও বহু বাংলাদেশি যাত্রী। কারও চোখেমুখে অনিশ্চয়তার ছাপ, আবার কারও কথাবার্তায় ভেসে আসছিল নতুন জীবনের আশার ঝলক। কেউ কাজের খোঁজে, কেউ বা বৈধ কাগজপত্র পাওয়ার আশায় এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছুটে চলেছে। ইউরোপের মাটিতে টিকে থাকার সংগ্রাম, অবৈধ থেকে বৈধ হওয়ার চেষ্টার গল্প; প্রত্যেকটি গল্প আলাদা আলাদা একেকটি অধ্যায়। প্রতিটি জীবনকাহিনী যেন একেকটি সিনেমার মতো।

বুদাপেস্ট পৌঁছে বুকিং ডটকম থেকে বাস স্ট্যান্ডের কাছাকাছি একটি হোটেলের বুকিং দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু ইন্টারনেট জটিলতায় অর্ধেক ফরম পূরণ করেই থেমে যেতে হয়। উপায় না দেখে গভীর রাতে সরাসরি ঠিকানা ধরে হোটেলে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়ি। ভেতর থেকে এক ইউক্রেনীয় মহিলা দরজা খুলে দেন। হোটেলের মালিক ছিলেন তুর্কি বংশোদ্ভূত। প্রথমে তিনি কিছুটা রূঢ় ব্যবহার করলেও হাতে টাকা দিতেই তার আচরণ পাল্টে যায় এবং আমাদের থাকতে দেন।

পরদিন সকালে শহর ঘুরে দেখার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি। একে একে স্ট্রিটকার, মেট্রো, ট্যুরিস্ট বাস আর হাঁটা পথে ঘুরে যেন ইতিহাসের একের পর এক অধ্যায় উল্টে দেখছিলাম। কত অজানা তথ্য জানলাম, কত ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখলাম আর নদীর তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে বুদাপেস্টের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। তবে একটি সমস্যার মুখোমুখি হতে হলো—এখানে ইউরো বা ডলার গ্রহণ করা হয় না। কেবল স্থানীয় মুদ্রা ফরিন্ট বা ক্রেডিট কার্ড চলে। কিন্তু কানাডিয়ানদের জন্য কার্ড ব্যবহারেও ঝামেলা রয়েছে, কারণ লেনদেনের সময় প্রথমে স্থানীয় মুদ্রা থেকে মার্কিন ডলারে রূপান্তর হয়, তারপর ডলার থেকে কানাডিয়ান ডলারে। এতে অতিরিক্ত চার্জ যোগ হয়ে খরচ বেড়ে যায়।

ইউরো না চলার পেছনে যে ব্যাখ্যা জানা গেল তা হলো—হাঙ্গেরি যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য, তবুও দেশটির সরকার এখনো পর্যন্ত ইউরোকে সরকারি মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করেনি। এর পরিবর্তে তারা নিজেদের জাতীয় মুদ্রা হাঙ্গেরিয়ান ফরিন্ট (Hungarian Forint, সংক্ষেপে HUF) ব্যবহার করছে।
এছাড়া ইউরো চালু করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক মানদণ্ড পূরণ করা জরুরি। হাঙ্গেরি এখনো সেই মানদণ্ড পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি বলেই ইউরো প্রবর্তন করা হয়নি।

হাঙ্গেরির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ইউরোপীয় ও পূর্ব ইউরেশীয় প্রভাবের মিশেলে গড়ে উঠেছে। হাঙ্গেরিয়ান ভাষা (Magyar) দেশের সরকারি ভাষা। এটি ইউরোপের অন্যতম জটিল ভাষা। সংগীতে হাঙ্গেরির অবদান অনন্য। বিশ্বখ্যাত সুরকার ফ্রাঞ্জ লিস্ট ও বেলা বার্তক এখানকার সন্তান। লোকসংগীত, নাচ এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাক আজও গ্রামীণ উৎসব ও অনুষ্ঠানে জীবন্ত।
বুদাপেস্টকে প্রায়ই “দানিউবের মুক্তা” বলা হয়। শহরের অন্যতম আকর্ষণ হলো এর স্থাপত্য। গোথিক, বারোক, আর্ট নুভো এবং আধুনিক নকশার সমন্বয় শহরটিকে এক অনন্য চরিত্র দিয়েছে। শহরের বিশেষ পরিচিতি হলো এর উষ্ণ প্রস্রবণ ও স্পা সংস্কৃতি যা পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

হাঙ্গেরির প্রাণ হলো দানিউব নদী, যা দেশটিকে উত্তর থেকে দক্ষিণে বিভক্ত করেছে এবং বুদাপেস্টকে বুদা ও পেস্ট অংশে আলাদা করেছে। এছাড়া টিসা নদীও দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদী। হাঙ্গেরিতে রয়েছে মধ্য ইউরোপের বৃহত্তম হ্রদ বালাটন। গ্রীষ্মে এটি সমুদ্রসৈকতের মতোই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
হাঙ্গেরিতে জীবনযাত্রার মান ক্রমশ উন্নত হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অবকাঠামো ব্যবস্থা বেশ উন্নত। বুদাপেস্টে আধুনিক ইউরোপীয় জীবনধারা ও ঐতিহ্যের এক অনন্য সমন্বয় পাওয়া যায়। ইউরোপীয় মান অনুযায়ী ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় পর্যটক ও শিক্ষার্থীদের কাছে এটি আকর্ষণীয় গন্তব্য।

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে হাঙ্গেরি, বিশেষ করে রাজধানী বুদাপেস্টে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, কর্মজীবী ও অভিবাসীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশি, ভারতীয়, চীনা, ইউক্রেনীয়, সিরীয়, তুর্কি এবং আফ্রিকানসহ নানা দেশের মানুষ এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা শিক্ষাঙ্গন ও শহরের সামগ্রিক পরিবেশকে করেছে আরও বৈচিত্র্যময়। ফলে বুদাপেস্ট আজ এক বহুসাংস্কৃতিক নগরী হিসেবে গড়ে উঠেছে।

পরবর্তী গন্তব্য: ভিয়েনা (অষ্ট্রিয়া)









