
ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগরেবকে বলা যায় এমন এক শহর, যেখানে ইউরোপীয় ঐতিহ্য, প্রকৃতির রূপ আর আধুনিকতার ছোঁয়া মিলেমিশে এক অনন্য পরিচয় তৈরি করেছে। দেশটি দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বালকান উপদ্বীপে অবস্থিত। ভৌগলিকভাবে ক্রোয়েশিয়ার বৈচিত্র্য অভাবনীয়। সুদীর্ঘ উপকূল, হাজারেরও বেশি দ্বীপ, অদ্ভুত গঠনের পাহাড়ি ভূমি আর সবুজ উপত্যকার সমন্বয় যেন প্রকৃতির এক অনন্য উপহার। এর প্রতিবেশী দেশগুলো হলো স্লোভেনিয়া, হাঙ্গেরি, সার্বিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং মন্টেনেগ্রো। এসব দেশ ক্রোয়েশিয়াকে এক আন্তর্জাতিক সংযোগস্থল হিসেবে গড়ে তুলেছে।
গত রাতে স্লোভেনিয়ার রাজধানী লিউব্লিয়ানা থেকে আন্তর্জাতিক বাসে জাগরেবে এসে পৌঁছালাম। বাস স্ট্যান্ডে নামতেই চোখে পড়ল নানা দেশের অভিবাসীদের ভিড়। বিশেষ করে নেপালি অভিবাসীদের আধিক্য বেশ দৃশ্যমান। এর পাশাপাশি প্রচুর বাংলাদেশি অভিবাসীও এখানে বসবাস করছে। কেউ ছোটখাটো ব্যবসা করছে, কেউ রেস্তোরাঁ, বা কেউ দোকানে কাজ করছে। অনেকে বহু বছর ধরে এদেশে স্থায়ীভাবে বসতি গড়েছে। তাদের মুখে শুনলাম, রুজি-রোজগারের সুযোগ এখানে মোটামুটি ভালো। পরিশ্রম করলে স্বচ্ছল জীবনযাপন সম্ভব।

রাজধানী জাগরেব দেশের উত্তর-পশ্চিমাংশে সাভা নদীর তীরে অবস্থিত। এখানে মধ্যযুগীয় ঐতিহ্য আর আধুনিক নগর জীবনের রঙিন ছোঁয়া একসাথে মিলে যায়। শহরের কেন্দ্রস্থলে উনবিংশ শতাব্দীর রঙিন আভিজাত্যে ভরা বান ইয়েলাচিচ স্কোয়ার প্রমাণ করে এ শহরের দীর্ঘ ইতিহাস ও সংস্কৃতির গভীরতা। অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের প্রভাব শহরের স্থাপত্য, শিল্পকলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এখনো স্পষ্ট।

ক্রোয়েশিয়ার মানুষ ফুটবলপ্রেমী হিসেবে বিশ্বজোড়া খ্যাত। ২০১৮ সালের ফিফা বিশ্বকাপে ফাইনালে খেলে দেশটির নাম সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানী জাগরেবের রাস্তা জুড়ে এখনো সেই গৌরবগাথার গল্প শোনা যায়। খেলার দিনগুলোতে কাজ-কর্ম বন্ধ করে পুরো শহর যেন উৎসবে ভেসে যায়। শিশুরা রাস্তার মোড়ে মোড়ে বল নিয়ে খেলতে নামে। আবার ক্যাফে কিংবা বারে বসে মানুষ দল বেঁধে খেলা উপভোগ করে।

শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও জাগরেবের সুনাম রয়েছে। ইউনিভার্সিটি অফ জাগরেব বলকান অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে। ভারত, বাংলাদেশ, আফ্রিকা এমনকি পশ্চিম ইউরোপ থেকেও অনেক শিক্ষার্থী এখানে পড়তে আসে। আধুনিক ক্যাম্পাস, তুলনামূলক সাশ্রয়ী ফি এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক পরিবেশ তাদের আকর্ষণ করে।

ভাষার দিক থেকে ক্রোয়েশিয়ার সরকারি ভাষা হলো ক্রোয়েশিয়ান, যা দক্ষিণ স্লাভিক ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত। তবে শিক্ষা ও পর্যটন শিল্পের কারণে ইংরেজি, জার্মান এবং ইতালীয় ভাষাও বহুল ব্যবহৃত।
যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক থেকে ক্রোয়েশিয়া যথেষ্ট উন্নত। রাজধানী জাগরেব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং দ্রুতগামী রেল ও সড়ক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইউরোপের অন্যান্য শহরের সাথে যুক্ত। শহরের ভেতরে আধুনিক ট্রাম ব্যবস্থা ও বাস নেটওয়ার্ক সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের চলাচল সহজ করেছে।

ক্রোয়েশিয়া বিখ্যাত তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের জন্য। দেশজুড়ে আছে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান যেমন প্লিটভিসে লেকস ন্যাশনাল পার্ক। এখানে জলপ্রপাত ও নীল-সবুজ হ্রদ পর্যটকদের মুগ্ধ করে। রাজধানী জাগরেবেও রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান।
জাগরেব শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত ইয়ারুন লেক (Jarun Lake) প্রকৃতির স্নিগ্ধ ছোঁয়া অনুভব করার এক অনন্য জায়গা। স্থানীয়দের কাছে এটি কেবল একটি হ্রদ নয়, বরং বিনোদন, খেলাধুলা, সংগীত আর উৎসবের প্রাণকেন্দ্র। গ্রীষ্মকালে এখানে এমন ভিড় জমে যে অনেকে একে ভালোবেসে বলেন “জাগরেবের সমুদ্র”।

ধীরে ধীরে ইয়ারুন লেকটি শহরের মানুষের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। স্থানীয়রা যেমন অবসর কাটাতে আসে, তেমনি পর্যটকদের কাছেও এটি একটি অপরিহার্য দর্শনীয় স্থান। আজকের বিকেলটি কাটালাম এই লেকের মনোরম পরিবেশে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তরুণ সাকিব, যে এখানে একটি বারে কাজ করে, তার আমন্ত্রণেই ইয়ারুন লেক ঘুরে দেখার সুযোগ হলো।
সাকিবের সাথে অনেক আলাপ হলো। সে এখানে কাজ করে খুব খুশি। তার কাছ থেকে জানলাম, এতদিনে হাজার হাজার বাংলাদেশি ক্রোয়েশিয়ায় এসে বসতি গড়তে পারত; কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে দেশটির সরকার বাংলাদেশিদের ভিসা প্রদানে কড়াকড়ি আরোপ করায় বাংলাদেশিদের জন্য সম্ভাবনার দ্বার সেভাবে উন্মুক্ত হয়নি।

ক্রোয়েশিয়া তুলনামূলকভাবে উচ্চমানসম্পন্ন জীবনধারার প্রতীক। এখানে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিনোদনের সুযোগ সমৃদ্ধ। মানুষের জীবনযাত্রা ইউরোপীয় আধুনিকতার সাথে সাথে নিজস্ব বালকান ঐতিহ্যের রঙিন ছোঁয়া বহন করে। বিদেশি অভিবাসী ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি শহরটিকে করেছে আরও বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যময়।
পরবর্তী গন্তব্য: বুদাপেস্ট (হাঙ্গেরি)









