
মধ্য আমেরিকার একটি ছোট্ট দেশ বেলিজ (Belize)। আয়তনে মাত্র ২২ হাজার বর্গকিলোমিটার; জনসংখ্যা চার লাখের কাছাকাছি। অর্থনীতি নির্ভর করে কৃষি, পর্যটন ও সেবা খাতের ওপর। আফ্রিকান, মায়া, ইউরোপীয় ও ক্যারিবীয় সংস্কৃতির প্রভাবে গড়ে উঠেছে দেশটির বৈচিত্র্যময় সমাজ।
অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণে বেলিজের নাগরিকরাই যখন উন্নত জীবনের আশায় যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে পাড়ি জমান, তখন বিস্ময় জাগে—এমন এক দেশের ঝাণ্ডা উড়িয়ে ঢাকায় বাংলাদেশের এক ব্যবসায়ী কিভাবে খুলে বসলো কনস্যুলেট?
কূটনীতির শিষ্টাচার বলছে, যেখানে পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস নেই, সেখানে কোনো রাষ্ট্র স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিকে অনারারি কনস্যুলার করে। অনারারি কনস্যুলারদের হাতে থাকে কিছু প্রতীকী সুবিধা। এ পদে চাকরি হয় না, বেতন নেই; আছে কেবল মর্যাদা ও আস্থার প্রতীক।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ মর্যাদাই হয়ে ওঠে ক্ষমতার দাপট। গাড়িতে ডিপ্লোম্যাটিক নামফলক, ভিআইপি লাউঞ্জে প্রবেশাধিকার, কাস্টমস থেকে বিলাসবহুল গাড়ি ছাড় করানো, ট্যাক্স সুবিধা নেওয়া, পুলিশ-প্রশাসনের সঙ্গে ওঠাবসা, ভিআইপি প্রভাব দেখিয়ে মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা—এসবই অনেকে ব্যবহার করেন ব্যক্তিস্বার্থে। কথিত আছে, ঢাকাস্থ অনেক অনারারি কনস্যুলার হুন্ডি ব্যবসায়ী ও মানি লন্ডারিং চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশের টাকা বিদেশে পাচারে ভূমিকা রাখে।
পুরানা পল্টনের সরু রাস্তায় হেঁটে গেলে চোখে পড়ে ঝকঝকে একটি ভবন—রুহামা কমপ্লেক্স। উপরের তলায় চকচকে নামফলক: “Honorary Consulate of Belize”। ভিতরে ঢুকলেই মনে হবে এটি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের কূটনৈতিক কার্যালয়। নরম সোফা, দামি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে বাইরে, ভেতরে প্রেস সেক্রেটারি সুমন চৌধুরী অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন। দেয়ালে সাজানো ছবি—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশ প্রধান, বিদেশি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কনস্যুলারের হাত মেলানো দৃশ্য।
প্রথম দেখায় যে কেউ ভাববে, এই অফিসে প্রবেশ মানেই এক প্রভাবশালী কূটনীতিকের সান্নিধ্যে আসা। অথচ এই চাকচিক্যের ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর ফাঁদ—ভুয়া ভিসার আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট।
২০২১ সালের ৪ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হয়—বাংলাদেশে বেলিজের অনারারি কনসাল জেনারেল হচ্ছেন মো. মশিউর রহমান। কয়েক বছরের ব্যবধানে তার নাম হয়ে ওঠে ভয়ংকর প্রতারণার প্রতীক।
বেলিজের কনস্যুলেট অফিসেই তিনি সাজালেন ভুয়া ভিসার কারখানা। ইউরোপ-আমেরিকার উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে শত শত মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিলেন কোটি কোটি টাকা।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, মশিউর ইউরোপ ও আমেরিকার ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, স্টুডেন্ট ভিসা, গ্রিন কার্ড কিংবা নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নিতেন। ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, পর্তুগালের শ্রমবাজারে ওয়ার্ক ভিসা দিয়ে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিতেন। বেলিজের ভিসা তিনি নিজেই জাল সিলমোহর ও স্বাক্ষর দিয়ে ইস্যু করতেন।
প্রথমে অগ্রিম চাইতেন দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা। পাসপোর্ট জমা দিলেই সপ্তাহখানেকের মধ্যে তাতে বসানো হতো অবিকল আসলের মতো দেখতে ভুয়া সিলমোহর। মশিউর সিন্ডিকেটের সদস্যরা ভুয়া ভিসায় ম্যানপাওয়ার করিয়ে ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট দিতেন। এরপর বুকিং দিতেন বিমানের টিকিট। এরপর আবার চাইতেন আরও টাকা।
সব মিলিয়ে একজনের কাছ থেকে হাতিয়ে নিতেন দশ থেকে বিশ লাখ পর্যন্ত। কারও স্বপ্ন ছিল ইতালির আঙুর বাগান, কারও লক্ষ্য ছিল স্পেনের রেস্তোরাঁ, কেউবা ভাবতেন কানাডায় ছেলেমেয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। বয়স ২০ থেকে ৪৫-এর মধ্যে, অধিকাংশই ছোট ব্যবসায়ী, কৃষক, প্রবাসে থাকা আত্মীয়-স্বজনের টানে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখা তরুণ কিংবা অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী।
মশিউর একা নন। তার স্ত্রী ডেন্টিস্ট রুমানা আফরোজ ছিলেন এ চক্রের প্রধান সহযোগী। একই বিল্ডিং-এ অবস্থিত রুমানা ডেন্টাল ক্লিনিক ব্যবহার হতো প্রতারণার আখড়া হিসেবে। অভিযোগ রয়েছে, বিএমইটির কিছু কর্মকর্তা এ চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন; তারাই দিতেন বহির্গমনের ছাড়পত্র।
আরও ছিলেন কথিত সাংবাদিক সুমন চৌধুরী, যিনি ‘প্রেস সেক্রেটারি’ পদে নিয়োগ পান। কাজ ছিল অনলাইন পোর্টালে ভুয়া সংবাদ ছাপানো, ফেসবুকে ভিআইপি ছবিগুলো ছড়িয়ে দেওয়া।
আজ পুরানা পল্টনের সেই অফিসে গিয়ে দেখা যায় তালা ঝুলছে। অফিস ও ক্লিনিক ছেড়ে পালিয়েছেন মশিউর ও তার স্ত্রী। মাস দুয়েক হলো গা ঢাকা দিয়েছেন। কেউ বলে কানাডায় চম্পট দিয়েছেন, কেউ বলে ভারত, কেউ বলে ঢাকাতেই কোথাও লুকিয়ে আছেন। আজ হাজারো পরিবার নিঃস্ব। কারও সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ, কারও ঘরবাড়ি বিক্রি হয়ে গেছে, কেউ দেনার দায়ে এলাকা ছাড়া। প্রতারিতরা আজ আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। শত শত মানুষের কান্নায় ভরে আছে আজ পল্টনের রাস্তাঘাট।
প্রশ্ন উঠেছে—একজন সাধারণ ব্যবসায়ী কীভাবে অনারারি কনসাল হলেন? কে তাকে সুপারিশ করেছিল? পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সংস্থার ক্লিয়ারেন্স ছাড়া কি এ নিয়োগ সম্ভব? পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলতে রাজি নন। এদিকে বেলিজের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো জবাব আসেনি।
অনারারি কনস্যুলার হওয়ার কথা ছিল বাণিজ্য ও সংস্কৃতির সেতুবন্ধন। কিন্তু বাংলাদেশে এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতারণার মুখোশ। মশিউর রহমানের সিন্ডিকেট শুধু মানুষের সর্বনাশই করেনি, আঘাত করেছে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিতেও।
ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা, নিয়োগ প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা এবং অনারারি কনস্যুলার ব্যবস্থাকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনা—এখন সময়ের অনিবার্য দাবি।
(সূত্র: কালবেলা)









