
আপনি যদি কোনো এক বিকেলে বাংলা টাউনে ঘুরতে আসেন তবে ধরে নেন অন্ততঃ ১০/১৫ জন সভাপতি মহোদয়ের সাথে আপনার দেখা হবে নিশ্চিত। আর যদি সাবেকদের আপনি গণনায় ধরেন তবে এ সংখ্যা আরও বেড়ে যাবে। এ শহরে নেতা আর নেতা! অবাক হওয়ার কিছু নেই। কোনো একটি রেষ্টুরেন্টে বসুন, চা, পেঁয়াজির অর্ডার দিন। দেখতে দেখতে দেখবেন আপনার আশেপাশের চেয়ারগুলোতে নানান স্তরের নেতারা আসন গ্রহণ করেছেন।
এই বৈচিত্র্যময় শহর টরন্টোয় রয়েছে নানান রকমের, নানান আকারের, নানান ধরনের সংগঠন।একেকটা সংগঠনের পেছনে আছে একেকটা মহাকাব্যিক ইতিহাস। সে ইতিহাসের পাতা ওল্টানোর দরকার নেই। এটা একেবারেই ‘নান অব ইয়র বিজনেস’! কিন্তু যদি আপনি কমিউনিটি নিয়ে গবেষণা করতে চান, তবে সংগঠনের সংখ্যা নিয়ে আজই ভাবনা শুরু করতে পারেন।
একটি সাধারণ কালকুটের নিয়ে গণনা শুরু করুন উপজেলা থেকে। হিসেব কষার জন্য অঙ্কশাস্ত্রে যে আপনাকে বিশেষজ্ঞ হতে হবে বিষয়টি তেমন না। বাংলাদেশে মোট উপজেলার সংখ্যা ৪৯৫। এ শহরে উপজেলা ভিক্তিক কয়টি সংগঠন আছে খুঁজে বের করুন। তারপর হিসেব করুন ৬৪ জেলার ৮টি বিভাগের সংগঠনের সংখ্যা। এরপর যুক্ত করুন প্রফেশনাল সংগঠন সমূহের সংখ্যা (যেমন ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, কৃষিবিদ, একাউন্টেন্ট, রিয়েলটর…. ইত্যাদি)। হিসেবে ধরুন বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের এলামনাইদের। বাদ দেবেন না ব্যাচ ভিত্তিক সংগঠনগুলো ‘৯৬, ৯৭, ‘৯৮…।
দেশিয় রাজনৈতিক দলের লেজুড় সংগঠনের মহানগর, বন্দরনগর… প্রাদেশিক, কেন্দ্রিয়….; যুব, নারী, কৃষক, তাতী…গুণতে থাকুন। বাঙালি বিস্মৃত জাতি হিসেবে বদনাম থাকলেও নেতাদের তারা ভুলে না। মহান নেতাদের নামকে স্মরণীয় করে রাখতে এ শহরে তারা পরিষদ/ফাউন্ডেশন গঠন করে উদাহরণ স্থাপন করেছে (কী তাদের কর্মকান্ড, বা এতোদিন ধরে তারা কী করেছে এসব অবান্তর প্রশ্ন যেনো আপনার মনে উদয় না হয় এটা মনে রাখবেন)।
এবার নজর দিন কানাডার মুলধারার রাজনীতির দিকে। লিবারেল, কনজারভেটিভ; ইষ্ট, ওয়েষ্ট, প্রাদেশিক, কেন্দ্রিয় সব শাখায় আমাদের প্রতিনিধিরা স্বসম্মানে রয়েছেন। আবার বাংলাদেশিদের জন্য আলাদাভাবেও এসব দলের শাখা রয়েছে যেখানে আমরা আমরাই। তালিকায় তাদেরকে রাখুন।
এ মহানগরীতে শিল্প/সাহিত্য, নাটক, আবৃত্তি চর্চার ডজনেরও বেশি সংগঠন নতুনদের স্বাগত জানাতে সর্বদাই প্রস্তুত। সবাই যে সবকিছু জানতে হবে এর কোনো মানে নেই; আগ্রহটা হচ্ছে বড় কথা। এ নিয়ে আপনার মাথা ব্যথা বাড়াবেন না। তারা সংগঠনে আছে অতএব গণনায় তাদেরও রাখুন।
এছাড়া বাংলাদেশের নামি দামী অনেক সংগঠনের শাখা-প্রশাখা আছে; বারান্দা, ব্যালকনি, ব্যাকইয়ার্ড নামের সংগঠনগুলোও খুঁজে বের করতে হবে আপনাকে। কোনটা কয় ভাগ এ নিয়ে আপনার চিন্তা করার দরকার নেই। আপনি গুণতে থাকুন।
এবার ধর্মীয় সংগঠনগুলোর পালা। কেউ নিয়মিত নামাজ পড়ুক বা না পড়ুক, তাই বলে কি মসজিদ কমিটিতে তার স্থান হবে না? আগ্রহী ব্যক্তিদের স্থান কোনো না কোনো জায়গায় অবশ্যই হবে। নগরীতে দশ/বারোটি মসজিদ পরিচালনা কমিটি আছে; মন্দির পরিচালনা কমিটিও আছে; আছেন সভাপতি, সেক্রেটারি। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মানিত ব্যক্তিদের আপনি এড়িয়ে যেতে পারেন না। তাদের নামও আপনার তালিকায় টুকে নিন।
সামার টাইমে অর্থাৎ পিকনিক সিজনে যদি কেবল ফেসবুক স্ক্রল করেন তাহলে বুঝতে পারবেন এ নগরীতে কতরকম এসোসিয়েশন, কতরকম সোসাইটি তথা কত রকমের সংগঠন আছে। সংগঠনের সংখ্যা গণনায় এর চাইতে সহজ বুদ্ধি বা উত্তম পরামর্শ আমার পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। এবার আপনি আপনার কাজ নিজ দায়িত্বে সম্পন্ন করুন।
ইদানীং নগরীতে নয়া এক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কোনো পার্টিতে গেলে অনেকেই দোয়া চাইতে এগিয়ে আসেন। এরা মূলধারার রাজনীতিতে নাম লেখাতে চান। স্যরি— নাম লেখানো নয়; তারা সরাসরি মনোনয়ন পেতে চান। এক্ষেত্রে ডাক্তার, কবিরাজ, ল’ইয়ার, রিয়েলটর, মর্টগেজ এজেন্ট, অ্যাকাউন্টেন্ট, স্বঘোষিত কমিউনিটি নেতা কেউ বাকি নেই। তাদের আগ্রহ দেখলে আপনার চোখে জল এসে যাবে। এরা যে কানাডাকে এতো ভালবাসেন, কানাডা সম্পর্কে তাদের এতো এতো জ্ঞান এতোদিন আপনার জানা ছিল না বলে আপনি লজ্জিত হয়ে পড়বেন।
আমাদের কমিউনিটির সফল নেতারা প্রায়ই তাদের জীবনের সাফল্যের বর্ণনা আমাকে শুনিয়ে থাকেন। সেসব সাফল্য অবশ্যই উৎসাহ ব্যাঞ্জক! তবে কে তাদের অনুসরণ করবেন, আর কে করবেন না– এটা যার যার বিষয়; আমি সেসব সাফল্যের ব্যাকরণ ও ধাপগুলো (টিপস) সংক্ষেপে এ লেখায় তুলে ধরছি—যদি কারো কাজে লাগে!
চলুন, শুরু করা যাক। আপনি যদি নেতা হতে চান তাহলে প্রথম ধাপ হচ্ছে– এলাকার লোক হিসেবে আপনি আপনার উপজেলার সংগঠনে নাম লেখাবেন। তারপর অল্প কিছুদিনের মধ্যে জেলা সংগঠনে আপনার ডাক পড়বে একেবারে নিশ্চিত থাকেন।
এরপর দেখবেন আপনার জন্য একের পর এক দরজা কিভাবে খুলে যায়। বিভিন্ন সংগঠনে যোগ দেয়ার জন্য আপনি আমন্ত্রণ পাবেন— রোটারি/লায়ন্স, লিবারেল/কনজারভেটিভ সব জায়গাতে আপনাকে থাকতে হবে কিন্তু!
এই নগরীর মাঠে/ময়দানে/ রাস্তা/ঘাটে আপনি সর্বত্র বিরাজমান থাকবেন। এছাড়া আপনি চাইলে পত্র/পত্রিকা/টেলিভিশন/অনলাইন/অফলাইন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবেও নাম লেখাতে পারেন।
এ নগরীতে যত বড়-ছোটাে আয়োজন হবে সব আয়োজনে আপনিই হয়ে উঠবেন প্রধান। অর্থাৎ মঞ্চ জুড়ে থাকবেন কেবল আপনি, মাইক্রোফোন থাকবে আপনার হাতে। ইচ্ছে করলে বগলেও রাখতে পারেন।
জেনে রাখুন—আপনি চাইলে একাই দশটি সংগঠনের সভাপতি হতে পারেন! যত বেশি সংগঠনে নাম লেখাবেন ততই আপনি বড় নেতা। ততই আপনার কদর! তবে কেবল একটা কাজই আপনাকে করতে হবে, সেটা হলো– চক্ষু লজ্জা খেয়ে ফেলতে হবে। মনে রাখবেন— চক্ষু লজ্জা থাকলে আপনি নেতা হতে পারবেন না।
টাকার কথা ভাবছেন? আগের দিনে নেতা হতে গেলে অনেক টাকা লাগতো। পত্রিকার বিজ্ঞাপণ, পোষ্টার-ব্যানার প্রিন্ট করা, হলভাড়া, সাউন্ড সিস্টেম, শিল্পীদের সম্মানী, আপ্যায়ন খরচ সব মিলিয়ে বেশ টাকা। এখন টাকা ছাড়াই আপনি সংগঠক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেতে পারেন।
শুরু করুন– ডেন্টোনিয়া পার্কের শহিদ মিনার থেকে অথবা দোকানের পার্কিং লট অথবা কোনো চিপা গলি থেকে। একেবারে ফ্রি! শুধু একটি স্মার্ট ফোন সাথে রাখুন, লাইভ করুন, কথা বলুন। লজ্জা কিসের? আপনি তো নেতা! অভিজ্ঞজনেরা বলেছেন–নেতাদের লজ্জা থাকতে নেই।
আসুন, সাহস করে একবার নাম লেখানো শুরু করুন, তারপর দেখবেন মজাই মজা! আপনি যখন হাঁটবেন আপনার ডানে-বামে অর্ধ ডজন লোক আপনার সাথে থাকবে। সভা-সমাবেশে আপনার উপস্থিতি আবশ্যিক হয়ে যাবে।
আপনাকে জনগণ চায়, আপনাকে কমিউনিটি চায়। আপনি সব জায়গায় সম্মানের সাথে যাবেন, মাঝখানের চেয়ারে আসন গ্রহণ করবেন। আপনাকে বাদ দিয়ে এই নগরীতে কেউ কিছু করতে পারবে না; এমনকি ড্যানফোর্থের ফুটপাতে বসে কেউ শাক-সবজি বিক্রি করতে গেলেও আপনাকে জিজ্ঞেস করবে!
(একটি রম্য রচনা)









