সম্পাদকের পাতা

কানাডায় ভুয়া কলেজ অফার লেটার কেলেঙ্কারি

নজরুল মিন্টো

প্রতীকী ছবি

টরন্টোর বাংলা টাউন। ডেনফোর্থ এভিনিউতে বেশ কিছুদিন ধরে কিছু নতুন মুখ দেখা যাচ্ছে। সকালে কিংবা বিকেলে, প্রায়ই দেখা মেলে কাঁধে ব্যাকপ্যাক ঝোলানো কয়েকজন তরুণকে—হালকা গোঁফ, চিন্তামগ্ন চোখ, ক্লান্ত মুখ। কেউ নিঃশব্দে একা হাঁটছে, কেউবা দল বেঁধে ঢুকে পড়ছে কোনো বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টে। মোবাইল স্ক্রিনে একটানা স্ক্রল, ঠোঁটে জমে থাকা এক অস্পষ্ট প্রশ্ন। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠলেও মুখ থেকে উঠছে না স্বস্তির কোনো নিশ্বাস।

তারা এসেছিল এক রঙিন স্বপ্ন নিয়ে—এই দেশেই উচ্চশিক্ষা, ভালো চাকরি, তারপর স্থায়ী বসবাস। কিন্তু এখন তারা জানে, সেই স্বপ্নের ভিত ছিল এক জাল কাগজ। যে অফার লেটার হাতে পেয়ে একদিন চোখে জল এসেছিল, আজ তারা জানে—সেটা আদৌ কোনো কলেজ থেকে পাঠানো হয়নি।

তাদের জীবনে আজ নেই কোনো নিশ্চয়তা। এখানে তারা আদৌ থাকতে পারবে কি না, কাজ জুটবে কি না, পেলেও তা বৈধ হবে তো? পুলিশ যদি জিজ্ঞাসা করে, কী উত্তর দেবে? তাদের চোখেমুখে জমে থাকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কুয়াশা।

এদেশে এসে তারা টের পেয়েছে—কানাডা শুধু তুষারে ঢাকা এক স্বপ্নের দেশ নয়, বরং কিছু মানুষের ঠান্ডা প্রতারণার জালে মোড়ানো এক বাস্তবতা, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে অনিশ্চয়তা।

২০১৯ সালের এই কাহিনি এখন ইমিগ্রেশন জগতের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। যার মূল চরিত্র মোহাম্মদ রহমান—একজন বাংলাদেশি ‘ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট’, যিনি বাস্তবে ছিলেন প্রতারণার কারিগর। ৮০ জন শিক্ষার্থীকে তিনি দিয়েছিলেন ভুয়া কলেজ অফার লেটার। প্রতিটি অফার লেটারের দাম ছিল $১০,০০০ কানাডিয়ান ডলার এবং ‘কনসালটেন্সি ফি’ বাবদ আরও $৫,০০০ ডলার আদায় করতেন। এটি কানাডার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা-ভিসা কেলেঙ্কারিগুলোর একটি।

মোহাম্মদ রহমানের পরিকল্পনা ছিল পেশাদার। ঢাকার মিরপুর ও উত্তরায় দুটি অফিস, সেখানে নিয়োজিত ছিল দশজন স্থানীয় এজেন্ট। বিজ্ঞাপনে ফোন নম্বর দেয়া ছিল কুড়িটিরও বেশি। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে চলে তার সেমিনার ও বিজ্ঞাপন কার্যক্রম।

এই চক্রের প্রধান লক্ষ্য ছিল ১৮ থেকে ২৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থী, যারা এইচএসসি বা ব্যাচেলর পাস করে কানাডায় পড়াশোনার স্বপ্ন দেখছিল। তাদের বেশিরভাগই ছিলেন ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের।

তার মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ভাষা ছিল চমকপ্রদ: “১০০% ভিসা গ্যারান্টি!”, “কোনো IELTS দরকার নেই!”, “পার্টটাইম জব পাওয়া নিশ্চিত!”, “দ্রুত PR!”—এসব কথা শুনে অনেক শিক্ষার্থী ঘরবাড়ি বিক্রি করে কিংবা ধারদেনা করে তথাকথিত এই ‘কানাডা এক্সপার্ট’ এর হাতে তুলে দেয় লাখ লাখ টাকা।

রহমান ভুয়া অফার লেটার বানাতে ব্যবহার করতেন কানাডার নামজাদা কলেজের জাল লেটারহেড, নকল ওয়েবসাইট, জাল সই—সবই ছিল তাঁর প্রতারণার অস্ত্রভাণ্ডারে। কিছু ক্ষেত্রে কানাডার একাধিক কলেজ অফিসারের সহায়তা ছিল তার পেছনে। একজন রেজিস্ট্রার $৫০০ ডলারের বিনিময়ে লেটারে সই করতেন। এমনকি নামকরা ব্যাংকের-এর এক কর্মী ব্যাংক স্টেটমেন্টও বানিয়ে দিতেন। IELTS সার্টিফিকেট জালিয়াতিতেও জড়িত ছিল British Council-এর একটি সাবকন্ট্রাক্টর, যারা $২,০০০ ডলারে স্কোর ম্যানিপুলেট করত।

রহমানের টরন্টোয় ছিল একটি ফ্রন্ট অফিস ও হোম অফিস। ৩ জন সহকর্মী জাল ডকুমেন্ট প্রস্তুতের কাজে নিযুক্ত ছিল।

যখন একজন ভুয়া শিক্ষার্থী কানাডায় পা রাখে, সে জানে না, তার কলেজে তার নামে কোনো রেকর্ডই নেই। অনেকেই বোঝে কয়েকদিন পরেই যখন কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেয়, “আপনার নাম আমাদের সিস্টেমে নেই।” অনেকের স্টাডি পারমিট বাতিল হয়, অনেকে CBSA-র হাতে গ্রেফতার হয়। কারও কারও কাছে সেই মুহূর্ত যেন দুঃস্বপ্নের সূচনা।

CBSA এবং IRCC যৌথভাবে গঠন করে টাস্কফোর্স। ৮০ জন ভুক্তভোগীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় Cognitive Interview পদ্ধতিতে। ফরেনসিক হ্যান্ডরাইটিং বিশ্লেষণ, ইমেইল থ্রেড, কল রেকর্ড, ব্যাংক ট্রেইল—সব বিশ্লেষণে উঠে আসে মোহাম্মদ রহমানের নাম। কানাডায় $১.২ মিলিয়ন ডলার এবং বাংলাদেশে ২.৭ কোটি টাকার লেনদেন শনাক্ত হয়।

বাংলাদেশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট তার ঢাকা অফিস থেকে জব্দ করে শতাধিক ভুয়া অফার লেটার, ব্যাংক লেনদেনের রেকর্ড, এবং রহমানের স্ত্রীর নামে গুলশান ও বনানীতে তিনটি অ্যাপার্টমেন্ট কেনার তথ্য।

অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় কানাডার আদালত মোহাম্মদ রহমানকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেয় এবং $২৫০,০০০ ডলার জরিমানা করে, যার একাংশ ক্ষতিগ্রস্তদের ফেরত দেওয়ার নির্দেশ হয়। তার নাম কানাডার অভিবাসন ব্ল্যাকলিস্টে যুক্ত হয় এবং কারাদণ্ড শেষে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়।

এ ঘটনার সাথে যুক্ত ৮০ জন ভুক্তভোগীর মধ্যে প্রায় ৫৫ জন শিক্ষার্থীর স্টাডি পারমিট বাতিল করা হয়। তাদের মধ্যে অন্তত ৪০ জনকে কানাডা ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয় এবং কানাডায় পুনঃপ্রবেশের ওপর ৫ বছরের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

প্রায় ২৫ জন শিক্ষার্থী ‘নির্দোষ’ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং তাদের মধ্যে ১০ জনকে হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যান্ড কমপ্যাশনেট গ্রাউন্ডে (H&C) অস্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে তাদের মধ্যে কারও স্থায়ী বসবাসের (PR) আবেদন গৃহীত হয়নি, এবং PR পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায় রয়ে গেছে।

এই কাহিনি শুধু এক প্রতারকের নয়, এটি একটি সিস্টেমিক দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশে ভুয়া ইমিগ্রেশন কনসালটেন্টদের বিরুদ্ধে কেউ কিছু করতে পারে না। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী বা প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করছে। ফেসবুক খুললেই দেখা যায় “কানাডা স্পেশালিস্ট”, “নো IELTS”, “১০০% ভিসা গ্যারান্টি”—এমন শত শত বিজ্ঞাপন। এদের বিলাসবহুল জীবনযাপন দেখে মনে হয় এরা সমাজের এক বিশেষ শ্রেণির প্রতিনিধি। অথচ এদের হাতে ধ্বংস হচ্ছে অসংখ্য তরুণের ভবিষ্যৎ। কোটি কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে বিদেশে।

রহমানের স্ক্যাম শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না। একই ধরনের প্রতারণা চালানো হতো ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায়ও। ২০২২ সালে ভারতে ২৩৭ জন শিক্ষার্থী একইভাবে প্রতারিত হয়। Interpol-এর রিপোর্ট অনুযায়ী এটি একটি Transnational Education Fraud Case.

এই ঘটনার পর IRCC অফার লেটার ভেরিফিকেশন সিস্টেম চালু করে। এখন কলেজগুলোর পক্ষ থেকে সরাসরি অফার লেটার IRCC-তে আপলোড করতে হয়।

এই কেলেঙ্কারীর পর, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়ে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা রিফিউজাল রেট ছিল ২৮%, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪২%-এ। ইন্টারভিউ প্রসেসিং টাইম বেড়ে যায় ১২ সপ্তাহ থেকে ২৮ সপ্তাহে। কানাডায় বাংলাদেশিদের শিক্ষাক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

মোহাম্মদ রহমানের “ফেক কলেজ অফার লেটার স্ক্যাম” কেসটি কানাডার ইমিগ্রেশন ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল ও সুপরিকল্পিত প্রতারণার উদাহরণ। এটি শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে আসে। Interpol-এর মানবপাচার ইউনিট এখন এই ধরনের ট্রান্সন্যাশনাল শিক্ষা-ভিত্তিক স্ক্যামগুলোর ওপর নজর রাখছে (২০২৩ রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ৫ বছরে ১,২০০+ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ৬০% দক্ষিণ এশিয়ার।)। এই কেস আমাদের শিক্ষা দেয়—বৈধ পথে না গিয়ে শর্টকাট ধরার চেষ্টা কখনও সফল হয় না। সতর্কতা, সচেতনতা, এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ—এই তিনটি উপায়েই ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সম্ভব।


Back to top button
🌐 Read in Your Language