
শহরের নাম মন্ট্রিয়ল—উত্তর আমেরিকার ফরাসিভাষী হৃদয়। কুইবেক প্রদেশের এই প্রধান মহানগরটি যেন একটি বহুভাষিক, বহু-সাংস্কৃতিক ক্যানভাস। সেন্ট-লরেন্স নদীর তীরঘেঁষে গড়ে ওঠা মন্ট্রিয়লের ভূপ্রকৃতি যেমন পাথুরে, তেমনি তার আবহমান ঋতুচক্রে জড়ানো থাকে বরফে মোড়া শীত, তুষারপতনে ঝিমিয়ে পড়া গাছ, বসন্তে ভেসে আসা ম্যাপল পাতা, আর শরতের আগুনরঙা পাতার আস্তরণ। শহরের কেন্দ্র জুড়ে সুউচ্চ স্কাইস্ক্র্যাপার, আধুনিক আর্ট ইনস্টলেশন, মেট্রো-সাবওয়ে লাইনের ছন্দ, আর ক্যাফের জানালা দিয়ে উঁকি দেয়া ল্যাপটপে মুখ গুঁজে বসা তরুণ-তরুণী—সব মিলে মন্ট্রিয়ল যেন সময় ও সংস্কৃতির সেতুবন্ধনে দাঁড়িয়ে থাকা এক আধুনিক মানবনগরী।
এই শহর শুধু কুইবেক রাজনীতির বা কানাডার বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়—এটি অভিবাসনের নিরব, নান্দনিক নথি। ১৯৭০-এর দশক থেকে বাংলাদেশ থেকে প্রথম অভিবাসীদের আগমন শুরু হয়। শুরুতে ছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য আগত ছাত্রছাত্রী ও পেশাজীবীরা। এরপর ধীরে ধীরে পরিবারসহ স্থায়ী বসতি গড়ে ওঠে। ৯০-এর দশকের পর থেকে মন্ট্রিয়লে বাংলাদেশিদের একটি সুনির্দিষ্ট উপস্থিতি গড়ে ওঠে—বিশেষত Parc-Extension, Côte-des-Neiges এবং Saint-Michel এলাকায়। মসজিদ, দেশি গ্রোসারি, রেস্তোরাঁ, এবং বছরজুড়ে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে এখানে গড়ে উঠেছে এক ‘মিনি বাংলাদেশ’।
এই অভিবাসী সমাজ একদিকে যেমন ধর্মীয় মূল্যবোধ ও পারিবারিক সংস্কারে বিশ্বাসী, অন্যদিকে তারা প্রতিদিন খাপ খাওয়াচ্ছে আধুনিক কানাডিয়ান বাস্তবতার সঙ্গে—বহু ভাষার ব্যবহারে, শিশুর স্কুলজীবনে, নারীর কর্মসংস্থানে। কেউ কাজ করেন ফ্যাক্টরিতে, কেউ Uber চালান, কেউ সরকারি দপ্তরে অনুবাদক, কেউবা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক।
এই শহরে জীবন মানে শুধু চাকরি নয়, শুধু বসবাস নয়—এটা একধরনের টিকে থাকার লড়াই। অভিবাসীদের হাসিতে থাকে একটা মৃদু সংকোচ, তাদের দৃষ্টিতে লুকিয়ে থাকে অচেনা বিষণ্ণতা। এই শহর তাদের জন্য ঠিক ‘নিজের’ নয়, আবার পুরোপুরি ‘পরের’ও নয়।
এই বৈচিত্র্যময় বাস্তবতার ভেতরেই জেগে ওঠে কিছু অন্ধকার গল্প—যেগুলো কেবল অপরাধের দলিল নয়, বরং অভিবাসী চেতনাজগতের গভীর সংকটের প্রতিফলন। এই শহর—যে শহর একজন শিশুর জন্য পরম আশ্রয় হতে পারত, সেই শহরেই কখনো কখনো জন্ম নেয় এক অনুচ্চারিত মৃত্যুদিনলিপি।
২০১৯ সালের মে মাস। মন্ট্রিয়লের এক হাসপাতালে নেওয়া হয় একটি অচেতন শিশুকে। তার শরীরে ছিল শতাধিক আঘাতের চিহ্ন, জিহ্বায় পোড়ার দাগ, পাঁজরের হাড় ভাঙা, পাকস্থলী ফেটে যাওয়া এবং মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ। ডাক্তাররা জানান, শিশুটি অনেক আগেই মৃত্যুবরণ করেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাসপাতালের দেয়ালে শোক ভেসে ওঠে, কারণ এই শিশুটি শুধু একটি মৃত্যুর শিকার নয়—সে ছিল দীর্ঘদিনের নির্যাতনের ফলাফল।
শিশুটির নাম গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি। তাকে ‘এ.আই.’ নামে চিহ্নিত করা হয়, যার অর্থ—অটিজম আক্রান্ত শিশু। জন্ম মন্ট্রিয়লেই, বয়স চার বছর সাত মাস। মাত্র দুই বছর বয়সেই তার মধ্যে দেখা যায় অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার—সবচেয়ে জটিল ধাপ (Level 3, non-verbal)। সে কথা বলতে পারত না, চোখে চোখ রেখে কিছু বোঝাতে পারত না, এবং অনেক সময় নিজেই আচরণগত আক্রমণ করত। এই অসহায়ত্বই হয়ে দাঁড়ায় তার মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
অভিযুক্ত ছিল তার বাবা-মা—মোহাম্মদ বিলাল ইসলাম ও মাহমুদা নাহার নাদিরা। বিলাল ইসলাম ২০১১ সালে কানাডায় আসেন। তার স্ত্রী মাহমুদা নাহার নাদিরা আসেন ২০১২ সালে। উভয়েই কানাডার স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন, তবে নাগরিকত্ব পাননি। শিশুটি জন্ম সূত্রে কানাডীয় নাগরিক। বাবার বাড়ি সিলেট এবং মায়ের বাড়ি ঢাকার মোহাম্মদপুরে। বিলাল ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রাক্তন জুনিয়র অফিসার (২০০৫–২০১০), আর নাদিরা ছিলেন ঢাকার একটি প্রাইভেট স্কুলের প্রাথমিক শ্রেণির শিক্ষিকা (২০০৮–২০১২)।
মন্ট্রিয়লে এসে বিলাল কাজ করতেন Uber ও ট্যাক্সি ড্রাইভার হিসেবে। নাদিরা হোমমেকার ছিলেন। অটিজম সম্পর্কে তাদের জ্ঞান ছিল না। বরং তাদের মনোভাবে ছিল বিভ্রান্তি ও ধর্মীয় কুসংস্কার। বাবা বিলাল ফেসবুকে লিখেছিলেন, “অটিজম আল্লাহর শাস্তি।” তিনি ছেলেকে সমাজে লজ্জার বিষয় মনে করতেন—তাকে বলতেন “পাগল” ও “অসুস্থ”। তিনি বিশ্বাস করতেন, শাস্তি ও শৃঙ্খলার মাধ্যমেই শিশুটি “সুস্থ” হয়ে উঠবে। এমনকি এক সময় স্থানীয় মসজিদের ইমামের সঙ্গে আলোচনার সময় সন্তানের মধ্যে “জিন প্রবেশ করেছে” বলে তার বিশ্বাসের কথা বলেন এবং মন্ট্রিয়লের এক বাংলাদেশি ‘পীর’-এর কাছ থেকে ঝাড়ফুঁক করান।
নির্যাতনের ধরন ছিল পৈশাচিক। সকালবেলা শিশুটিকে বাথরুমে এক ঘণ্টার বেশি সময় তালাবদ্ধ করে রাখা হতো। নাস্তা দেওয়া হতো না। দিনের বেলায় ঠান্ডায় ব্যালকনিতে বসিয়ে রাখা হতো। মারধরের জন্য ব্যবহার করা হতো ইলেকট্রিক তার, বেল্ট, কাঠের চামচ। জিহ্বায় ফুটন্ত পানি ঢেলে দেওয়া হতো—যার পোড়ার দাগ পোস্টমর্টেমে শনাক্ত হয়। শিশুটির পায়ের নখ উপড়ে ফেলা হয়, মাথায় আঘাতের ফলে সাবডুরাল হেমাটোমা সৃষ্টি হয়। কখনো তাকে অন্ধকার বাথরুমে লক করে রাখা হতো। রাতে বিছানায় ঘুমাতে দেওয়া হতো না—মেঝেতে রাখা হতো। চিৎকার করলে মুখে কাপড় ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। প্রতিবেশীরা পরে বলেন, তাঁরা এসব চিৎকার রেকর্ডও করেছিলেন কিন্তু কিছু বলেননি।
মায়ের ফোন থেকে উদ্ধার হয় ৩২টি ভিডিও, যেখানে দেখা যায়—তিনি নিজেই শিশুটিকে মারছেন, পানি ঢালছেন, এবং ভিডিও করছেন। গুগল সার্চ হিস্ট্রিতে পাওয়া যায়: “কীভাবে শিশুর চিৎকার বন্ধ করবেন”। মনোবিদদের মতে, মা ছিলেন ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ও ইন ডিনায়াল। তিনি অটিজমকে স্বীকার করতেন না। বরং বিশ্বাস করতেন, সন্তান ইচ্ছাকৃতভাবে খারাপ আচরণ করছে। তাঁর মধ্যে ছিল পারফেকশনিজম—ফেসবুকে অন্য পরিবারের সন্তানদের ছবি শেয়ার করতেন, কিন্তু নিজের সন্তানের ছবি কখনও পোস্ট করতেন না।
শিশুটির শেষ ছয় মাস স্কুলে যায়নি। শিক্ষকরা ফোন করলেও জবাব পেতেন না। কোনও চিকিৎসা, থেরাপি বা স্পিচ থেরাপিও দেওয়া হয়নি। অথচ কানাডার স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এসব ছিল বিনামূল্যে।
২০১৯ সালের ২৭ মে সকালে শিশুটি অজ্ঞান হয়ে যায়। কিন্তু হাসপাতালে নেওয়া হয় চার ঘণ্টা পর। ডাক্তাররা জানান, সময়মতো চিকিৎসা পেলে শিশুটির প্রাণ বেঁচে যেতে পারত। পোস্টমর্টেমে দেখা যায়—৭২টি আঘাতের চিহ্ন, কলার বোন ভাঙা, লিভার ও প্লীহা ফেটে যাওয়া, পাকস্থলী ফাঁটা, মস্তিষ্কে রক্তপাত। ডাক্তাররা বলেন, এটি ছিল ধীরে ধীরে মৃত্যু—একটি “Torture Murder”।
আদালতে প্রতিবেশী বলেন, “প্রতিদিন শিশুর চিৎকার শুনতাম, কিন্তু ভয় পেতাম কিছু বলতে।” স্কুল কর্তৃপক্ষও ভাবত, এটি “পারিবারিক বিষয়”।
অবশেষে, ২০২১ সালে বিচার শুরু হয়। প্রসিকিউশনের এক্সপার্ট উইটনেস বলেন, “Level 3 অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা ব্যথা প্রকাশ করতে পারে না, তাই নির্যাতন অনেক সময় চোখ এড়িয়ে যায়। কিন্তু এটি পরিকল্পিত ছিল।” আদালত বলেন, “আপনারা পিতামাতা হওয়ার অযোগ্য। এটি শুধু হত্যা নয়, একটি অসহায় শিশুর প্রতি নির্মম অত্যাচার।”
দুজনকেই Second-Degree Murder ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়। শাস্তি হিসেবে দেওয়া হয় আজীবন কারাদণ্ড, ২৫ বছর পর্যন্ত প্যারোল ছাড়া। জেল থেকে ছাড়ার পর ডিপোর্টেশন অর্ডারও কার্যকর হবে।
শিশুটির দাফন হয় মন্ট্রিয়লের Notre-Dame-des-Neiges Cemetery-তে, গোপনে। কিন্তু তার কান্না, তার চিহ্ন, তার ক্ষত থেকে যায় সমাজের গায়ে।
এটি কেবল একটি ফৌজদারি মামলা নয়। এটি একটি শিশুর আর্তনাদ, যা সমাজ শুনেনি। একটি পরিবার, যাদের নিজেদের অজ্ঞানতা ও লজ্জার ভার শিশুটির জীবন কেড়ে নিয়েছিল। আজ সেই শিশুটি আর নেই, কিন্তু তার মৃত্যুর পর শুরু হয়েছে সচেতনতার এক নতুন অধ্যায়।









