
বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠীর জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত এক শহরের নাম টরন্টো। এই শহরের বাতাসেও যেন বহে এক আনন্দধ্বনি; আধুনিকতা এবং মানবতার সম্মিলিত সুর। টরন্টো কেবল একটি শহর নয়, যেন একটি পৃথিবী। এখানে সকালের সূর্য ওঠে শতভাষার সম্ভাষণে, আর রাত নামে রঙিন উৎসবের আলোয়। টরন্টোর কোনো একজন নাগরিককে একক রঙে আঁকা যায় না; কারণ তারা জন্মেছেন নানা ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও চিন্তার দোলায়।
একজন চিনা রেস্তোরাঁ মালিক সকালবেলা পাশের আফগান দোকানি বন্ধুর সঙ্গে হেসে কুশল বিনিময় করেন। পার্কের বেঞ্চে বসে এক তরুণ বাঙালি, নোনতা হাওয়া উপভোগ করতে করতে কাগজ মোড়ানো পিৎজা খাচ্ছে। তার পাশে বসে থাকা এক ইউক্রেনিয়ান বৃদ্ধা, ইংরেজি ঠিকঠাক উচ্চারণ করতে না পারলেও ঠোঁটের কোণে প্রশংসার হাসি ফুটিয়ে বলে ওঠেন, “গুড, গুড… টরন্টো… ভেরি নাইস!” তরুণটি মুচকি হেসে মাথা নাড়ায়। ভাষা আলাদা হতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের ভাষা তো এক।
এই শহরের মানুষদের মনমানসিকতা উঁচু। তারা অন্যকে জায়গা দিতে জানে, জানে সম্মান করতে। একে অপরের সংস্কৃতি তারা কৌতূহল আর আনন্দ নিয়ে দেখে, শেখে এবং প্রয়োজনে তা আপন করে নেয়। এখানকার জীবনচিত্র এমনই; যেখানে প্রতিবেশী মানে শুধু পাশের ফ্ল্যাটের মানুষ নয়, বরং একই ফুটপাত ভাগ করা এক সহযাত্রী। শহরের প্রতিটি অলিতে-গলিতে, ট্র্যামে-বাসে, পার্কে কিংবা অফিস বিল্ডিংয়ে আমরা দেখি বিশ্বমানবতার এক মুগ্ধকর অভিসার। এটি এমন এক শহর যেখানে মানুষ শুধু সহাবস্থান করে না; তারা একে অপরের উৎসব, ব্যথা, সাফল্য ও সংগ্রামে শরিক হয়। এই হল টরন্টো।

কানাডার সবচেয়ে জনবহুল এই শহরটি ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ২.৭৬ মিলিয়ন মানুষের আবাসস্থল। কিন্তু সংখ্যা দিয়ে টরন্টোকে বোঝা যাবে না কারণ এর প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে ভিন্ন এক কাহিনি, একেকটা দেশের ইতিহাস, একেকটা ভাষার মাধুর্য, বিশ্বাসের গল্প।
বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, টরন্টোর প্রতিটি তৃতীয় ব্যক্তি নিজের ঘরে ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বলেন। জরিপে দেখা যায়, ইংরেজির পরপরই চীনা ভাষার স্থান, এরপরই রয়েছে ইতালীয়। নগরীর ছয়টি এলাকায় চীনারা তাঁদের ব্যবসা, বাণিজ্য স্থাপন করে গড়ে তুলেছে চায়না টাউন। ভারতীয়রা কয়েকটি জায়গায় তৈরি করেছে ইণ্ডিয়া বাজার; কোরিয়ানরা কোরিয়ান টাউন, গ্রিকরা গ্রিক টাউন অর্থাৎ একেকটি এলাকা একেক জাতিগোষ্ঠী নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে তুলেছে; যেখানে তাদের ব্যবসা, বানিজ্য, ধর্ম সংস্কৃতি প্রাধান্য পেয়েছে।
বাঙালিরাও পিছিয়ে নেই; বিশেষ করে নগরীর দুটি এলাকায় এখন দুটি বাংলা টাউনের উপস্থিতি দৃশ্যমান। শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরলেই দেখা যাবে, একেকটি সাইনবোর্ডে লেখা একেক ভাষায়; এক দোকানে হিন্দি গান বাজছে, তো আরেকটিতে স্প্যানিশ পপ। যেন পৃথিবীর এক বর্ণিল ব্যাবিলন!

ইতিহাস অনুযায়ী ১৭৯৩ সালে টরন্টো নগরীর পত্তন ঘটে। এ সময় নায়াগ্রা থেকে অন্টারিও প্রদেশের রাজধানী টরন্টোয় স্থানান্তরিত হয়। তখন থেকেই কানাডার অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, বাণিজ্য এবং সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে টরন্টো স্থান করে নেয়।
অন্যতম বহুজাতিক মানুষের শহর হিসেবে টরন্টো আজ বিশ্ব স্বীকৃত। কানাডার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ টরন্টোর মাত্র ১৬০ বর্গকিমি এলাকায় বসবাস করে। শতাধিক ভাষাভাষীর শহর টরন্টোয় প্রতি বছর ৭০ থেকে ৮০ হাজার নতুন অভিবাসী বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এসে বসতি স্থাপন করছে।
উল্লেখ্য, ২০০০ সালে পাঁচটি সিটি যথাক্রমে-স্কারবোরো, ইয়র্ক, নর্থ ইয়র্ক, ইটোবিকো এবং টরন্টো-একত্রিত হয়ে মেগাসিটি টরন্টো নাম ধারণ করে।

টরন্টো হচ্ছে কানাডার ব্যবসায়িক রাজধানী। কানাডাসহ বিশ্বের বড় বড় কোম্পানির অফিসগুলো এ নগরীতেই। পর্যটকদের শহরও বলা চলে টরন্টো। ১৬.১ মিলিয়ন পর্যটক প্রতি বছর টরন্টো ভ্রমণে আসেন এবং এ শিল্পে প্রায় ৮৮ হাজার লোক জীবিকা নির্বাহ করে চলেছে। এছাড়া টরন্টো হচ্ছে উত্তর আমেরিকার দ্বিতীয় মোটর সিটি, ডেট্রয়েটের পরপরই যার স্থান।
অন্টারিও লেকের উত্তর কূল ঘেঁষে দন্ডায়মান সিএন টাওয়ার বিশ্বের অন্যতম উচ্চতম টাওয়ার হিসেবে স্বীকৃত। টরন্টোর অদূরে নায়াগ্রা ফলস ছাড়াও পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো অনেক কিছু রয়েছে এ শহরে। থিয়েটার সিটি হিসেবেও টরন্টোর নাম আছে লন্ডন এবং নিউ ইয়র্কের পরেই।
উত্তর হলিউড হিসেবে খ্যাত টরন্টো নগরী টিভি এবং ফিল্ম প্রোডাকশন্স-এর দিক থেকে তৃতীয় এবং টিভি প্রোগ্রামিং এর দিক থেকে উত্তর আমেরিকায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে আছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফিল্ম ফ্যাস্টিভ্যালের শহর হিসেবে ক্যানের পরপরই এখন টরন্টোর স্থান। এই হলো মোটামুটি টরন্টোর চিত্র।

সর্বশেষ আদম শুমারি অনুযায়ী, এ নগরীতে বসবাসরত ৪৬.৬ শতাংশ নাগরিক জন্মেছেন কানাডার বাইরে। টরন্টোর দৃশ্যমান সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী শহরের মোট জনসংখ্যার ৫৫.৭%। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে দক্ষিণ এশীয় (১,১৮২,৪৮৫ জন), চীনা (৬৭৯,৭৩০ জন), এবং কৃষ্ণাঙ্গ (৪৮৮,১৫৫ জন) সম্প্রদায় উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও দক্ষিণ এশীয়, চীনা, আফ্রিকান, ক্যারিবিয়ান, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপীয়, লাতিন ও পূর্ব এশিয়ার মানুষ একসঙ্গে এই শহরের ছায়ায় বসবাস করেন। এই পরিসংখ্যানগুলো শহরের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে স্পষ্ট করে তুলে ধরে।
অভিবাসীরা টরন্টোর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। তারা নতুন ব্যবসা স্থাপন, চাকরির সুযোগ সৃষ্টি এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখে। তাদের মাধ্যমে শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে বহু পরিত্যক্ত দোকান ও সেবা খাত। টরন্টোর অর্থনীতি আজ যে স্ফীত, তার পেছনে অভিবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য।
আপনি যদি শহরের কোনো মোড়ে গিয়ে কফি খেতে চান, তা হতে পারে ইথিওপিয়ান কফি শপে, কিংবা যদি চান ভাত-মাছ—আপনাকে যেতে হবে বাংলাদেশি দোকানে। একটু সামনে হাঁটলেই দেখা যাবে লেবানিজ শর্মার ঝাঁঝালো ঘ্রাণ ভেসে আসছে, পাশেই কেউ কোরিয়ান কিমচি নুডলস খাচ্ছে কাঠি দিয়ে। আরেক কোণে এক ভিয়েতনামি তরুণী হাতে ধরে রেখেছে বাবল টি’র কাপ, তার পাশেই এক রেস্তোরাঁয় আপনি পাবেন তাজা গ্রীক সালাদ, আবার স্প্যাদাইনা দিয়ে হেঁটে গেলে চিনা ডাম্পলিং আর পেকিং ডাকের গন্ধে মন লোভাবে। টরন্টোর বৈচিত্র্য তাই শুধু চোখে দেখার নয়, স্বাদে অনুভব করারও।
বাংলাদেশি অভিবাসীরা এখন শহরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁরা কাজ করছেন হেলথ কেয়ার, শিক্ষা, ব্যাংকিং, প্যাকেজিং, রিয়েলটর, ব্যবসা ও প্রযুক্তি ইন্ডাষ্ট্রিতে। ড্যানফোর্থ-ভিক্টোরিয়া পার্ক, ডাউনটাউনের রিজেন্ট পার্ক, স্কারবোরো, মিসিসাগা-ব্রাম্পটন এসব এলাকাতে গড়ে উঠেছে বাংলার এক টুকরো আবহ।
টরন্টোর ধর্মীয় বৈচিত্র্য শহরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইসলাম কানাডার দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এবং মুসলিম জনসংখ্যা গত দশকে দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধির পেছনে বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের অবদান রয়েছে, যার মধ্যে বাংলাদেশিরা শীর্ষ পাঁচে অবস্থান করছে। হিন্দুধর্মও টরন্টোর ধর্মীয় মেলবন্ধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কানাডায় হিন্দু জনসংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ৪৬.২%, মুসলিম ৯.৬%, হিন্দু ৬.২%, এবং ইহুদি ৩.৬%। এছাড়াও, ৩০.৬% বাসিন্দা কোনো ধর্মের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করেন না।
টরন্টোর বহুজাতিক সমাজের কারণে এখানে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব উদযাপিত হয়, যা শহরের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরলেই দেখা যাবে মসজিদের পাশে গীর্জা, মন্দিরের পাশে সিনাগগ। এই সহাবস্থানের ছায়ায়ই গড়ে উঠেছে টরন্টোর মানবিক ভিত্তি।
টরন্টোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের বৈচিত্র্যময় শিক্ষার্থী জনসংখ্যার জন্য পরিচিত। শহরের পাবলিক স্কুলগুলোতে ১৮ বছর পর্যন্ত পড়াশোনা বিনামূল্যে প্রদান করা হয়, যা নতুন অভিবাসী পরিবারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা। টরন্টোর বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স, নাইজেরিয়া ও ব্রাজিল থেকে আসা শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বেশি দেখা যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, টরন্টোতে অভিবাসী পরিবারগুলোর শিশুরা অসাধারণ ফলাফল করছে স্কুলে। তারা শুধু ইংরেজি নয়, নিজের মাতৃভাষাতেও পারদর্শী হয়ে উঠছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণ এশীয়দের সাফল্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
টরন্টোর বহুজাতিক সমাজের প্রতিফলন হিসেবে এখানে বিভিন্ন ভাষায় মিডিয়া কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এই মিডিয়াগুলো স্থানীয় সম্প্রদায়ের খবরা খবর, সংস্কৃতি, এবং বিনোদনমূলক বিষয়বস্তু প্রচার করে। পাঞ্জাবি সম্প্রদায়ের জন্য পাঞ্জাবি টিভি চ্যানেল, রেডিও স্টেশন ও অনেকগুলো পত্রিকা রয়েছে। চীনা ভাষায় বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও স্টেশন, এবং সংবাদপত্র রয়েছে। ইতালীয় সম্প্রদায়ের জন্য রেডিও প্রোগ্রাম এবং সংবাদপত্র পাওয়া যায়। উর্দূভাষী, তামিলভাষীদের জন্য একইভাবে রয়েছে- রেডিও, টেলিভিশন ও পত্রিকা।
বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য টরন্টোতে ‘দেশে বিদেশে’ সহ বেশ কয়েকটি বাংলা সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে। বাংলাদেশ কমিউনিটি উৎসব-আনন্দে মুখর থাকে সারাবছর। বাংলা বইমেলা, বাংলা নববর্ষ, রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা, বিজয় দিবস, মাতৃভাষা দিবস সবকিছুই উদযাপিত হয় চরম উৎসাহ আর আন্তরিকতায়।
টরন্টো নিছক কোনো শহর নয়-এটি বিশ্বের সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম ও জনগণের এক সম্মিলিত আলিঙ্গন। এই শহর প্রতিদিন প্রমাণ করে চলেছে, বৈচিত্র্য শুধু শক্তি নয়, এটি উন্নয়নের অনুঘটক। অভিবাসীরা এখানে কেবল বসবাস করছে না,তারা টরন্টোর ভবিষ্যৎ গড়ছে। এই ভবিষ্যৎ শুধু ইমারত কিংবা অর্থনীতির নয়—এটি মানবিকতার, সমবেত স্বপ্নের।
একটি শহরকে সত্যিকার অর্থে গ্লোবাল সিটিতে পরিণত করতে যা প্রয়োজন- টরন্টো সেই সব বৈশিষ্ট্য ধারণ করে চলেছে। সামনের দিনে যদি বৈচিত্র্যের মাঝে একতা বজায় থাকে, তবে টরন্টো হবে উত্তর আমেরিকার সর্বোচ্চ মানবিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় নগরী।









