
ইউরোপের হৃদয়ে অবস্থিত অস্ট্রিয়া—আল্পস পর্বতমালার পাদদেশে যেন এক স্বপ্নঘেরা রাজ্য। তার রাজধানী ভিয়েনা। ডানিউব নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই শহর যেন ইতিহাস আর আধুনিকতার মেলবন্ধন। সংগীত, শিল্প আর নিপুণ নান্দনিকতার এ শহরের প্রতিটি রাস্তায় যেন একেকটি সিম্ফনি বাজে। জানুয়ারি মাসে শহরটি আবৃত থাকে তুষারের আবরণে; আর পথচারীরা কোটের কলারে মুখ গুঁজে ছুটে চলে এক জীবন থেকে আরেক জীবনের দিকে।
ভিয়েনার এক প্রান্তে, ফ্লোরিডসডর্ফে গড়ে উঠেছে অভিবাসীদের একটি ছোট্ট জগৎ। বাংলাদেশিদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখানে বসবাস করে। এখানকার বাংলাদেশ কমিউনিটি সংখ্যায় ছোট, কিন্তু প্রাণবন্ত। মূলত সেবাখাত ও রেস্টুরেন্ট শিল্পে নিয়োজিত এই কমিউনিটির বেশিরভাগ সদস্য আসেন ২০০০-এর দশকে।
মেহেরুন নেসা ছিলেন তাদেরই একজন। বয়স মাত্র ২৭ বছর। ২০১৮ সালে তিনি ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে ভিয়েনায় পাড়ি জমান, কাজ নেন একটি স্থানীয় রেস্টুরেন্টে। অভিবাসী জীবনের কষ্ট তিনি মেনে নিয়েছিলেন – দীর্ঘ শিফট, ভাষার বাধা, নস্টালজিয়া। তবুও তার ফেসবুক পোস্টে ভিয়েনার প্রান্তরে সূর্যাস্তের ছবি থাকত, ক্যাপুচিনো কাপে প্রথম বরফ পড়ার ভিডিও।
ভিয়েনায় বাংলাদেশিদের গড় আয় ১,৫০০-২,০০০ ইউরো। মেহেরুনের বেতন ছিল এর চেয়ে কম – মাসিক ১,২০০ ইউরো (২০২৩ সালের হিসাবে)। তবুও তিনি প্রতি মাসে ৩০০ ইউরো সঞ্চয় করতেন পরিবারকে পাঠানোর জন্য। তার অ্যাপার্টমেন্টের আলমারিতে ছিল বাংলা কবিতার বই, রেসিপি নোটবুক – বিদেশ বিভুঁইয়ে যেসব ছিল তার শেকড়ের শেষ স্পর্শ।
২৫ জানুয়ারির বিকেল। ফ্লোরিডসডর্ফের সেই বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে হঠাৎ পুলিশ আসে। দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকে দেখে পড়ে আছে এক নারীর নিথর দেহ। গলায় দড়ি, মুখে বিষের ছায়া। এ নারীর নাম মেহেরুন নেসা। যে মেয়েটি জীবিকার টানে অনেক স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলো অস্ট্রিয়ায়। কিন্তু কেউ জানে না, এই বিকেলটি ছিল তার জীবনের শেষ গল্প। যে গল্পের শেষ লাইন কেউ পড়তে পারল না—কারণ সেটা লেখা ছিল রক্ত আর বিষে।
মেহেরুন নেসার পৈতৃক নিবাস বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলায়। তার বাবা মো. নুরুল ইসলাম একজন কৃষক এবং মা আনোয়ারা বেগম গৃহিণী ছিলেন। পরিবারে মেহেরুন ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান। তার বড় ভাই আব্দুল্লাহ আল নোমান এবং এক ছোট বোন সুমাইয়া আক্তার।
মেহেরুন নেসা কিশোরগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজে এইচএসসি (২০১১-২০১৩) সম্পন্ন করেন। সর্বশেষ বাংলা সাহিত্যে স্নাতক শেষ করেন কিশোরগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে (২০১৪-২০১৭)। পরিবারের আর্থিক সংকট ও ভাইয়ের উচ্চশিক্ষার খরচ বহন করতেই তিনি বিদেশে আসার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন।
পরিচিতদের কাছে মেহেরুন ছিলেন হাসিখুশি, পরিশ্রমী, নিরহংকারী একটি মেয়ে। স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির অনুষ্ঠানে মাঝে মাঝে দেখা যেত তাকে—মুখে আলতো হাসি, চোখে নিরব জিজ্ঞাসা। তার বিয়ে হয়েছিল মোহাম্মদ ফারুক নামে এক বাংলাদেশির সঙ্গে। তার বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলায়। তিনি মাঝেমধ্যে ভিয়েনা আসতেন। সম্পর্কে দূরত্ব ছিল, কিন্তু সে দূরত্ব কখনোই সন্দেহে রূপ নেয়নি।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল নির্মম। ভালোবাসার আবরণে লুকিয়ে ছিল লোভ। স্বামীটি কয়েক মাস আগে মেহেরুনের নামে একটি ২ লক্ষ ইউরোর জীবনবিমা পলিসি করেন। সাইন করার সময় স্ত্রী হয়তো ভেবেছিলেন—‘এটা ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।’ অথচ সেটাই হয়ে উঠল মৃত্যুর পরোয়ানা।
২৪ জানুয়ারি রাত। প্রতিবেশীরা শুনেছিল ঝগড়ার আওয়াজ। কেউ পাত্তা দেয়নি, যেমন দেয় না ইউরোপের শহুরে নিঃসঙ্গতা। অ্যাপার্টমেন্টের প্রাচীর আর ভারী পর্দার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় সে আওয়াজ। কেউ ভাবে নি এটি হবে মেহেরুনের জীবনের শেষ রাত।
২৫ জানুয়ারি, ২০২৩। দুপুর গড়ানোর পর পুলিশ আসে। দরজা ভাঙে। তারা পায় নিথর এক দেহ—গলায় দড়ির দাগ, ঠোঁটে কালচে ছোপ। পরে ফরেনসিক টিম এসে নিশ্চিত করে—মেহেরুনের রক্তে পাওয়া গেছে সায়ানাইডের চিহ্ন। তাকে প্রথমে বিষপ্রয়োগ করে অচেতন করা হয়েছিল। তারপর গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা।
প্রথম দৃষ্টিতে মনে হয়েছিল, হয়তো এটা আত্মহননের এক মর্মান্তিক পরিণতি। কিন্তু তদন্তের পাতা উল্টোতেই একে একে উন্মোচিত হতে থাকে অজানা সত্য। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাতে একটি কালো জ্যাকেট পরিহিত পুরুষ অ্যাপার্টমেন্টে প্রবেশ করেছে। পরে বেরিয়ে গেছে ভোরের দিকে। জানা যায়—সে আর কেউ নয়, মেহেরুনের স্বামী মোহাম্মদ ফারুক (৩৫)।
হত্যার কিছুদিন পরেই ফারুক অদৃশ্য হয়ে যান। জানা যায়, তিনি ভিয়েনা থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে গেছেন। অস্ট্রিয়ান পুলিশ তখন ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করে। ঢাকায় তার অবস্থান নিশ্চিত করা হয় মিরপুরের একটি বাসায়। মার্চ ২০২৩ সালে র্যাব অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে।
গ্রেফতারের পর প্রথমে তিনি কিছুই স্বীকার করেননি। কিন্তু পরে, এক ফোনালাপে নিজের কণ্ঠে অসাবধানতাবশত স্বীকার করে বসেন—‘আমি যা করেছি, সেটা টাকা পাওয়ার জন্য…।’
তদন্তে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। সায়ানাইড যেমন হঠাৎ পাওয়া যায় না, তেমনি মৃত্যু এত সহজে ঘটে না। ফরেনসিক বিশ্লেষণে জানা যায়, ফারুক ইন্টারনেটে নিয়মিত খুঁজছিলেন বিষ প্রয়োগের পদ্ধতি, জীবনবিমা পলিসি সংক্রান্ত তথ্য এবং এমনকি “untraceable murder methods” কীভাবে কাজ করে, তাও। প্রতিটি ক্লিক যেন একেকটি ষড়যন্ত্রের ধাপ। এটা ছিল কেবল একটি খুন নয়—এটা ছিল বিশ্বাসঘাতকতা, অর্থলোভ, এবং ঠান্ডা মাথায় একজন নারীর অস্তিত্ব মুছে ফেলার নির্মম প্রক্রিয়া।
অস্ট্রিয়া এবং বাংলাদেশ—দুটি ভিন্ন ভূখণ্ড, কিন্তু একই অপরাধের দুই মুখ। একদিকে অস্ট্রিয়ায় চলছে আন্তর্জাতিক বিচার কার্যক্রম, অন্যদিকে বাংলাদেশে দায়ের করা হয়েছে ৩০২ ধারায় হত্যা মামলা। অস্ট্রিয়া চাইছে তার প্রত্যর্পণ, যাতে তারা নিজেদের মাটিতে বিচারের কাজ সম্পন্ন করতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া জটিল। এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত দেশে আটক, বিচারের জন্য হস্তান্তরের অপেক্ষায়। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে এখনও সমন্বয় করে যাচ্ছে অস্ট্রিয়ান তদন্ত দল।
ঢাকায় বসে মেহেরুনের ভাই এখনো লড়ছেন। মিডিয়ার সামনে বারবার আবেদন করছেন—“আমার বোনকে যে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, তার বিচার চাই।”
অস্ট্রিয়ান আদালতের নির্দেশে জীবনবিমার টাকা ‘ফ্রিজ’ করা হয়েছে। কোনো উত্তরাধিকারী সেটা পাবেন না, যতক্ষণ না বিচার সম্পন্ন হয়।
মেহেরুন নেসার মৃত্যু কেবল একজন নারীর মৃত্যুর গল্প নয়, বরং এটি নারীর ওপর সহিংসতা এবং অর্থলিপ্সার অন্ধকার দিকের প্রতিচ্ছবি।
মেহেরুন নেসা ভিয়েনার ফ্লোরিডসডর্ফের Tandoori Nights রেস্টুরেন্টে সিনিয়র ওয়েট্রেস হিসেবে কাজ করতেন। তার মৃত্যুর পর রেস্টুরেন্টটি কিছুদিন বন্ধ ছিল। মালিক করিমুল্লাহ রেষ্টুরেন্টের এক কর্ণারে একটি মেমোরিয়াল বোর্ড স্থাপন করেছিলেন, যেখানে লেখা: “In loving memory of Meherun – our shining star.” প্রতি বছর রেষ্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ মেহেরুনের স্মরণে দাতব্য ইভেন্ট আয়োজন করে।









