
ফাতেমা সায়রা রহমান (সায়রা আলী আহমেদ)। বাংলাদেশের হবিগঞ্জের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে তার জন্ম। মাত্র ১৮ বছর বয়সে পারিবারিকভাবে তিনি যুক্তরাজ্যে বসবাসরত এক বৃটিশ-বাংলাদেশিকে বিয়ে করেন। স্বামীকে তিনি প্রথমবার দেখেন বিয়ের দিন।
এরপর তিনি চলে আসেন যুক্তরাজ্যে। আসার পরপরই স্বপ্ন ভঙ্গ হয় তার। অকারণে মারধর, অশ্রাব্য গালাগালি, এমনকি রান্না করতে না পারার জন্যও স্বামীর হাতে বেধড়ক মার খেতেন তিনি। সবচেয়ে ভয়ানক ছিল সেই রাত, যখন তিনি আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা, সেদিন তাঁর স্বামী তাঁকে সিঁড়ি থেকে ফেলে দেন। ব্যথায় ছটফট করতে করতে সায়রা কেবল চোখের জল মুচছিলেন। ফরিয়াদ করার জায়গা ছিলো না তার। কারো সাথে শেয়ার করতেও পারছিলেন না। ভাবছিলেন এটাই কি বিলেতের জীবন তাহলে!
১৯৯১ সাল। ৩দিন প্রসববেদনার পর, লন্ডনের গেটসহেডের কুইন এলিজাবেথ হাসপাতালে এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন সায়রা। তারপর হাসপাতালের একজন অনুবাদকের সহায়তায় তিনি একটি আশ্রয়কেন্দ্রে পালিয়ে যান এবং সেখান থেকে বিবাহবিচ্ছেদের জন্য আবেদন করেন।
ব্রিটেনের কুখ্যাত এক বন্দীর নাম চার্লস ব্রনসন চার্লস ব্রনসনকে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে “ব্রিটেনের সবচেয়ে সহিংস বন্দী” এবং “ব্রিটেনের সবচেয়ে কুখ্যাত অপরাধী” বলা হয়। তাঁর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং সহিংস আচরণের কারণে তিনি ১৫০ বার বিভিন্ন কারাগারে স্থানান্তরিত হয়েছেন এবং ২৭ বছরের মধ্যে ২২ বছরই একক বন্দিত্বে কাটিয়েছেন।
১৯৭৪ সালে এক সশস্ত্র ডাকাতির অভিযোগে ব্রনসনকে প্রথমবারের মতো সাত বছরের জন্য কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে, কারাগারের ভেতরে তিনি ক্রমাগত সহিংসতা চালিয়ে যান, একাধিক বন্দীকে জিম্মি করেন, কারারক্ষীদের ওপর হামলা করেন এবং কারাগারের ছাদে উঠে বিক্ষোভ দেখান। ২০০০ সালে, তিনি কারাগারের এক প্রশিক্ষকের গলায় দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে যাওয়ার কারণে আজীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।

কীভাবে ব্রনসনের প্রেমে পড়লেন সায়রা?
১৯৯৮ সালে এক স্থানীয় সংবাদপত্রে চার্লস ব্রনসনের ছবি দেখে সায়রা আকৃষ্ট হন। “আমি প্রথমবার যখন তার ছবি দেখি, তখন আমি সেটি মন থেকে মুছতে পারিনি। এটি এমন এক অনুভূতি যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আমার অনুভূতি এতটাই তীব্র ছিল যে আমি সেটিকে অনুসরণ করতে চেয়েছিলাম,” বলেন সায়রা। তিন বছর ধরে এই অনুভূতি মনে পুষে রাখার পর, ২০০১ সালে তিনি ব্রনসনের সঙ্গে চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ শুরু করেন।
“আমি ভেবেছিলাম, সে প্রতিদিনই অসংখ্য চিঠি পায়, আমার চিঠিটি হয়তো ফেলে দেবে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর অবাক হয়ে দেখি, সে উত্তর দিয়েছে। চিঠিতে সে আমার ও আমার মেয়ের সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল।” পরবর্তী কয়েকটি চিঠির আদান-প্রদানের পর, সায়রা তার একটি ছবি পাঠান, যাতে ব্রনসন বুঝতে পারেন কে তাঁকে লিখছে।
সায়রা এবং ব্রনসন প্রথম দেখা করেন ২০০১ সালের ৪ মার্চ উডহিল কারাগারে। ৩ মাসে ৯ বার সাক্ষাতের পর, ২০০১ সালের জুন মাসে মিল্টন কেইনস কারাগারে বিয়ে করেন তারা। বিয়েতে তার ১০ বছর বয়সী মেয়ে ব্রাইডসমেইড হিসেবে উপস্থিত ছিল।
বিয়ের পর সায়রা বলেন, “চার্লস আমাকে বলেছে, আমি তাকে বদলে দিয়েছি। কারাগার যাকে ৩০ বছরে বদলাতে পারেনি, আমি তা পেরেছি।” বিয়ের পর ব্রনসন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তার নাম পরিবর্তন করে আলি চার্লস আহমেদ রাখেন। তিনি বলেন, তিনি ইসলাম সম্পর্কে আরও জানতে চান এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ছিল বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করা।
সায়রার পরিবার তাদের সম্পর্ককে সমর্থন করেছিল। তার মা ও ভাই নিয়মিত ব্রনসনের সঙ্গে চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ করতেন। সায়রা বলেন, “আমার পরিবার তার গায়ের রং নিয়ে চিন্তিত নয়, কারণ এই প্রথম তারা আমাকে সত্যিকারের সুখী দেখেছে।” সায়রার মেয়ে সামিও ব্রনসনকে ভালোবাসতে শুরু করে এবং তাকে “বাবা” বলে ডাকত। তবে, বিয়ের পর তাদের সম্পর্ক কঠিন হয়ে পড়ে। কারা কর্তৃপক্ষ বিয়ের পর থেকেই তাদের মধ্যে কাঁচের দেয়াল বসিয়ে দেয়, যাতে তারা একে অন্যকে স্পর্শও করতে না পারে। সায়রা বলেন, “আমরা বিয়ের আগে একে অপরকে স্পর্শ করতে পারতাম, কিন্তু বিয়ের পর কারাগার কর্তৃপক্ষ আমাদের আলাদা করে রেখেছে। আমি আমার সংসদ সদস্যকে চিঠি লিখেছি এবং জানতে চেয়েছি কেন আমাদের একই ঘরে দেখা করতে দেওয়া হয় না।”
এদিকে, ব্রনসনের সঙ্গে বিয়ের কারণে সায়রাকে চাকরি হারাতে হয়। তাকে নারীদের আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বরখাস্ত করা হয়, কারণ তার এ বিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নীতির বিরুদ্ধে যায়।
২০০৫ সালে প্রকাশিত হয় সায়রার আত্মজীবনীমূলক বই Breaking Free: The True Story of a Survivor। সায়রা তার জীবনের কাহিনি তুলে ধরেন আত্মজীবনীমূলক ঐ বইতে। বইটিতে তিনি বলেন, “চার্লস ব্রনসন একজন হত্যাকারী নন, শিশু হত্যাকারী নন, নারীদের নির্যাতনকারী নন। তিনি কেবল এক ভিন্নধর্মী মানুষ, যিনি তার ভালোবাসার জন্য সংগ্রাম করেছেন।”
সর্বশেষ ২০০৫ সালে হঠাৎ করেই তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। বর্তমানে সায়রা রহমান কোথায় আছেন, কি করছেন তা আর জানা যায় না।









