
টরন্টো—একটি শহরের নাম নয় শুধু, বরং হাজারো স্বপ্নের ঠিকানা। কানাডার অন্যতম ব্যস্ত মহানগর, যেখানে মানুষ আসে দূর-দূরান্ত থেকে, এক নতুন জীবন গড়ার প্রত্যাশায়। বরফে মোড়া সকালে কেউ হাঁটে ইয়ং স্ট্রিট ধরে, কেউ ছুটে চলে সাবওয়ের ভিড়ে, আবার কেউ ব্যস্ত কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে।
টরন্টো শুধু কানাডার আর্থিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নয়, এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়-নগরী। এখানে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো, রায়ারসন ইউনিভার্সিটি (বর্তমানে Toronto Metropolitan University), ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি, জর্জ ব্রাউন কলেজ, সেনেকা কলেজ, সেন্টেনিয়াল কলেজ, হাম্বার কলেজ—এগুলো শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, বরং তা যেন হাজারো তরুণ-তরুণীর জীবনে আলো জ্বালিয়ে তোলার বাতিঘর।
বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা টরন্টোকে বেছে নেয়ার বড় কারণ হচ্ছে এখানকার শিক্ষার মান। উত্তর আমেরিকার অন্যতম উচ্চমানের শিক্ষা ব্যবস্থা, প্রযুক্তি ও গবেষণার আধুনিক সুবিধা, বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশ, এবং পরবর্তী সময়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ—এসব মিলে টরন্টো এক আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে ওঠেছে। ২০২৩ সালের হিসেবে, শুধু টরন্টোতেই ২ লক্ষাধিক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী রয়েছে, যাদের একটি বড় অংশ দক্ষিণ এশিয়া থেকে আগত।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে আসা শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন থাকে বড়। তারা চায়, একদিন বড় কোনো কর্পোরেট অফিসে কাজ করবে, নিজের পরিচয় গড়বে বিশ্বের মানচিত্রে। কেউ কেউ চায় মা-বাবার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা আধুনিক করে তুলতে, কেউ চায় ডাক্তার, কেউ সাংবাদিক, কেউবা প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হতে।
তাদের আসার পথ সহজ নয়। IELTS প্রস্তুতি, ভিসা ইন্টারভিউ, ভর্তি আবেদন, এজেন্টের খরচ, ব্যাংক স্টেটমেন্টের দুশ্চিন্তা, অভিভাবকদের চোখে-মুখে একসাথে আশা ও ভয়—সব মিলিয়ে প্রতিটি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পাড়ি দেয় যেন এক বিশাল সাগর।
তবে কানাডায় এসে সেই ছাত্রজীবন শুধুই ক্লাস আর পরীক্ষা ঘিরে সীমাবদ্ধ থাকে না। ক্লাসের বাইরে থাকে পার্টটাইম চাকরি—কখনও কফিশপ, কখনও গোডাউনে প্যাকেজিং, কিংবা Uber Eats-এর ডেলিভারি। সবকিছু মিলিয়ে জীবনের স্বাদ তারা খুঁজে পায় এক নতুনরূপে।
এই শহরের শিক্ষার্থীদের জীবনের সেই রঙিন অধ্যায়ে হঠাৎ করেই কালো ছায়া ফেলেছিল ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত। টরন্টোর হাইওয়ে ৪২৭-এর ডানডাস স্ট্রিট ওয়েস্ট র্যাম্পে ঘটে যায় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা। অত্যন্ত উচ্চগতির এক গাড়ি র্যাম্পের উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে খাদে পড়ে এবং এরপর কংক্রিট দেয়ালে ধাক্কা লেগে আগুন ধরে যায়।
গাড়িটিতে ছিলেন চারজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী—অ্যাঞ্জেলা শ্রেয়া বাড়ৈ, শাহরিয়ার মাহির খান, আরিয়ান আলম দীপ্ত এবং চালক নিবিড় কুমার (যিনি বিখ্যাত সংগীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিতের পুত্র)। শাহরিয়ার ও আরিয়ান ঘটনাস্থলেই মারা যান। শ্রেয়া জীবিত উদ্ধার হলেও হাসপাতালে নেয়ার পর তার মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় নিবিড়কে ভর্তি করা হয় সেন্ট মাইকেলস হাসপাতালে।
অ্যাঞ্জেলা শ্রেয়া বাড়ৈ, ২০ বছর বয়সী এক প্রাণবন্ত তরুণী। ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির দ্বিতীয় বর্ষের ব্যবসায় প্রশাসনের ছাত্রী। তাঁর স্বপ্ন ছিল একদিন হিসাবরক্ষক হয়ে বাংলাদেশে গিয়ে পরিবারের গার্মেন্টস ব্যবসা চালানো। সেই ছোটবেলায় যে মেয়েটি স্কুল ডান্সে সহপাঠীদের টেনে মঞ্চে
তুলত, সে-ই কানাডার মঞ্চে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চেয়েছিল। শ্রেয়া ছিলেন নিঃস্বার্থ, সদা হাস্যোজ্জ্বল, বন্ধুবান্ধবদের পাশে দাঁড়ানো এক আত্মপ্রত্যয়ী তরুণী।
শাহরিয়ার মাহির খান, মাত্র ১৭ বছর বয়সে টরন্টো এসেছিলেন। জর্জ ব্রাউন কলেজের শিক্ষার্থী। তিনি ছিলেন অত্যন্ত নম্র স্বভাবের, সবার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাঁর ফেসবুক বন্ধু আয়মান রশিদ লেখেন, “তিনি ছিলেন এমন একজন, যিনি কাউকে কখনো কষ্ট দিতেন না।”
আরিয়ান আলম দীপ্ত, হাসিখুশি, ভিডিও গেমস-পাগল, বন্ধুদের প্রাণ। হাম্বার কলেজের শিক্ষার্থী। তাঁর এক বন্ধু লিখেছেন, “তুমি তো এক শিশুর মতো ছিলে, আজ তুমি নেই—এই সত্যটা মেনে নেওয়া যায় না।”
নিবিড় কুমার—যিনি দুর্ঘটনার সময় গাড়ি চালাচ্ছিলেন, তিনি তখন ছিলেন মৃত্যুর সাথে লড়াইয়ে। চিকিৎসকরা তাঁর শরীরে একাধিক সার্জারি করেন। আগুনে পোড়া ক্ষতের পাশাপাশি মানসিক যন্ত্রণাও ছিল প্রবল। তাঁর বাবা কুমার বিশ্বজিত ও মা নাইমা সুলতানা দিনরাত ছেলের পাশে কাটান। বর্তমানে জানা গেছে, নিবিড়ের অবস্থা স্থিতিশীল এবং তিনি ধীরে ধীরে সেরে উঠছেন।
নিহতদের লাশ দেশে পাঠাতে এবং পরিবারের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে আসে টরন্টোর বাংলাদেশি কমিউনিটি। শ্রেয়ার মরদেহ ২০২৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দেশে পাঠানো হয়। তার বাবা, জেমস সুনাম বাড়ৈ, কানাডায় এসে মেয়ের মরদেহ গ্রহণ করেন এবং দেশে নিয়ে যান। শাহরিয়ার মাহির খান ও আরিয়ান আলম দীপ্তর মরদেহ ২০২৩ সালের ৩ মার্চ দেশে পাঠানো হয়।
একটি গাড়ি, চারটি স্বপ্ন, একটি রাত—আর পুরো একটি কমিউনিটির শোক। টরন্টোর বুকে আজও বাতাসে ভেসে বেড়ায় শ্রেয়ার হাসি, দীপ্তর প্রাণবন্ততা, শাহরিয়ারের সৌম্যতা। তারা এসেছিল জীবনের জন্য, বিদায় নিয়েছে নীরবতায়।
এই লেখাটি শুধু তাদের স্মরণে নয়, বরং প্রতিটি অভিবাসী তরুণের প্রতি এক অশ্রুসিক্ত আহ্বান—“গতি নয়, নিরাপত্তা হোক তোমার যাত্রার সঙ্গী। জীবনটাকে বাঁচাও—শুধু বেঁচে থাকার জন্য নয়, তোমার স্বপ্ন পূরণের জন্য।”









