
আজকাল প্রেম পাওয়া যায় ইনবক্সে, ভিডিও কলে, মুহূর্তে শুরু হয় গল্প, আর শেষটা গিয়ে ঠেকে থানার ডায়েরিতে বা সাইবার ক্রাইম ইউনিটের কনফারেন্স রুমে। সংক্ষেপে ভালোবাসার নামে ছলনার এই অভিনব কৌশলের নাম-হানি ট্র্যাপ।
সঞ্জয় রায় (ছদ্মনাম)। টরন্টোর পরিচিত এক উঠতি ব্যাবসায়ী। ছলচাতুরিতে তার জুড়ি মেলা ভার। কাঁচা টাকা হাতে এলে যেমনটা হয়, সঞ্জয়ের জীবনও সেই দিকেই মোড় নেয়। মদ, জুয়া, নারীসঙ্গ-এইসব অনৈতিক আনন্দেই সে নিজেকে নিমগ্ন রাখে।
সঞ্জয়ের অতীত? সেখানে নেই কোনো প্রেম, নেই কোনো ভালোবাসা, নেই এমনকি কোনো স্মরণযোগ্য মুহূর্ত। খর্বাকৃতি, চেহারায় জৌলুসের অভাব, কথাবার্তায় শিক্ষার আলোর ছিটেফোঁটাও নেই। তার উপর বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে সময় কাটানোর মতো অর্থসামর্থ্যও ছিলনা তার। একেবারে বিবর্ণ, নিরামিষ এক জীবন।
তবু একদিন ভাগ্যের কপাট খুলে যায়। এক আদমব্যাপারির হাত ধরে পাড়ি জমায় কানাডায়। তারপর শুরু হয় নানান রকম ধান্দাবাজি-চটজলদি বড়লোক হওয়ার খেলা। ভগবান না হয় ভাগ্যবান-কিছু একটা তো সহায় ছিল! কয়েক বছরের মধ্যেই সে হয়ে ওঠে বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক। তবে জীবনের স্বাদ তখনও তার কাছে অধরা।
এদিকে নতুন টাকায় তৈরি হয় নতুন এক পরিবেশ, আর সেই পরিবেশেই ঘুরঘুর করতে থাকে কিছু একই ধাঁচের সাঙ্গপাঙ্গ-যারা মাটি থেকে উঠে এসে আকাশ ছোঁয়ার গল্প করে। দেশে থাকা অবস্থায় তাদের অপকীর্তিগুলো রসিয়ে রসিয়ে বলে।
কেউ বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়ের সঙ্গে রাতভর গল্পের কথা, কেউ বলে পাঁচতারা হোটেলে অপরিচিত হাসির মুখে হারিয়ে যাওয়ার কাহিনি। সবই বাহাদুরির গল্প। তামার গলায় সোনার আওয়াজ।
এসব গল্প শুনতে সঞ্জয়ের খুব ভালো লাগে। মনযোগ দিয়ে সে এসব গল্প শুনে। শুনতে শুনতে ভাবে এবার যদি দেশে যায় তাহলে জীবনের সকল আশা পূর্ণ করেই তবে ফিরবে। ভাবতে ভাবতে পরিকল্পনা করে সে। কিন্তু কোথায় কী পাওয়া যায়, কীভাবে পাওয়া যায়, এসব লাইনঘাট তো তার জানা নেই। তবে তার অটুট বিশ্বাস, ভগবান সহায় থাকলে সব সম্ভব। তিনি তো স্বপ্নপূরণের সর্বময় অধিপতি। এসব চিন্তা করতে করতে যখন কুল পাচ্ছিলো না, ঠিক তখনই অন্ধকারে আলোর রেখার মতো এগিয়ে আসে একজন-তারই এক সুহৃদ, যে এই লাইনে পাক্কা ওস্তাদ!
এবারকার বাংলাদেশ সফর সঞ্জয়ের জন্য অন্যরকম। সে এসেছে নতুন কিছু আবিষ্কার করতে, নতুন কিছু অনুভব করতে। রোমাঞ্চকর এক নেশা তার মধ্যে কাজ করছে। ঢাকায় নেমেই এয়ারপোর্টের ডিউটি ফ্রি শপ থেকে দুই বোতল ব্ল্যাক লেবেল কিনলো। তারপর ওস্তাদের পরামর্শে এয়ারপোর্ট থেকে সোজা নির্দিষ্ট ঐ হোটেলটিতে গিয়ে উঠল। রুম নম্বর ৪০৪।
সন্ধ্যার পর ওস্তাদের এক ভাগিনা সঞ্জয়ের সাথে দেখা করতে আসে। গল্পের ফাঁকে জানতে চায় মামার কিছু লাগবে কি না! সঞ্জয় খুশিতে-আনন্দে ব্ল্যাক লেবেলের মুখ খুলে। নিজে খায়, ভাগিনাকে খাওয়ায় তারপর তার খায়েশের কথা ব্যক্ত করে। অত্যন্ত বিনয়ের সূরে বলে- গল্প করার জন্য যদি কাউকে পাওয়া যেত…!
রাত ন’টায় অপূর্ব এক সুন্দরীকে নিয়ে ভাগিনা হোটেলে আসে। পরিচয় দেয় তার নাম রিংকি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। সে কানাডা যেতে চায়, এজন্যে তার কিছু পরামর্শ দরকার। রিংকিকে দেখে সঞ্জয় বাবুর চোখ আর নামে না। মেঘ না- চাইতেই বৃষ্টি! সে ড্রিংক অফার করে। অল্পক্ষণের মধ্যে আসর জমে যায়।
এদিকে ভাগিনা আগে থেকেই কিছু ফলমূল, চানাচুর এনে একটি ঝুড়িতে রাখে। রিংকি একপর্যায়ে সঞ্জয়ের কাছাকাছি অর্থাৎ একেবারে গা ঘেষে বসে। খিলখিল করে হাসে, আপেল কেটে, নিজ হাতে সঞ্জয়ের মুখে তুলে দেয়। ড্রিংক-এর সাথে আপেল-এর কম্বিনেশন কী চমৎকার! একটি স্বর্গীয় আবহ তৈরি হয়। সে আবহে সঞ্জয়ের দু’চোখ বুজে আসে। সে গভীর নিদ্রায় তলিয়ে যায়।
পরদিন যখন তার ঘুম ভাঙে. তখন বেলা দুপুর। টরন্টো থেকে ওস্তাদের ফোন আসে। এটা কী করলেন? সঞ্জয় কিছু মনে করতে পারে না। কী হয়েছে সে নিজেও জানে না। সে তো কেবল আপেল খাচ্ছিল। তারপর কী হলো.. আমতা আমতা করতে থাকে।
এমন সময় ভাগিনা আসে। সে একটি প্যাকেট থেকে ১০/১২টা ছবি বের করে বিছানায় ছড়িয়ে দেয়। ছবিতে দেখা যায় নগ্নাবস্থায়, মেয়েটির খোলা বুকের ওপর সঞ্জয়ের মুখ। রাগে কাঁপতে কাঁপতে ভাগিনা বলে, আপনি বললেন গল্প করবেন, আমি তাকে নিয়ে আসলাম। আমি একটু বাইরে যেতেই আপনি এরকম কান্ড করে বসবেন ভাবতে পারছি না। খবর চাউর হয়ে গেছে। রিংকির বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ধেয়ে আসছে হোটেল ঘেরাও করতে।
সঞ্জয় বুঝে ফেলে সে হানি ট্র্যাপের শিকার! অবশেষে তাৎক্ষণিক ৮ লক্ষ টাকা দিয়ে মামলা দফারফা করে সে হোটেল থেকে সেদিন বেরিয়ে আসে।
সঞ্জয় সে যাত্রায় হোটেল থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে ঠিক কিন্তু গল্প থেমে থাকেনি। এটা তো সিকোয়েল। কথায় আছে ওস্তাদের মার শেষরাতে। মাস-তিনেক পর ওস্তাদ ওই ঘটনার আরও কিছু ছবি আর ল্যাব রিপোর্টের একটি কপি নিয়ে সঞ্জয়ের অফিসে এসে তার মুখের উপর ছুঁড়ে মেরে বললো-রিংকি প্র্যাগনেন্ট!
সঞ্জয়ের মাথা ঘুরতে থাকে। ভাষা হারিয়ে ফেলে। কী করবে, কী করা উচিত ভেবে পায় না। ঘনিষ্ঠজনদের সাথে দেখা করে, আলাপ করে, পরামর্শ চায়, সমাধান চায়, এ ট্র্যাপ থেকে মুক্তি চায়। অবশেষে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে, হাজার-দশেক ডলারের বিনিময়ে এ ঘটনা থেকে অবশেষে সঞ্জয় নিষ্কৃতি পায় বা মুক্তি লাভ করে।
নিষ্কৃতি চাইলেই কি পাওয়া যায়? মুক্তি কি এতই সহজ! না। এখনও সঞ্জয় রাতে ভালো করে ঘুমাতে পারে না; রিংকির হাসি তাকে তাড়া করে বেড়ায়। আপেলের ঝুড়ি হাতে ভাগিনার চেহারা ভেসে ওঠে। ল্যাব রিপোর্ট হাতে ওস্তাদের হুংকারে মাঝরাতে সে বিছানায় ওঠে বসে হাঁপাতে থাকে।
প্রিয় পাঠক, এই সেই আপেল-যেটা খেয়ে একদিন আদম স্বর্গ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিল। এই সেই আপেল- যেটা নিউটনের মাথায় পড়ে গোটা দুনিয়ার তত্ত্ব বদলে দিয়েছিল। এই সেই আপেল-যেটা স্টিভ জবসের হাত ধরে আধুনিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। সর্বশেষ, এই সেই আপেল-যেটা খেয়ে এ গল্পের নায়ক সঞ্জয়ের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। আশা করি, এবার থেকে আপেল খাওয়ার আগে আপনি এগারোবার চিন্তা করবেন!









