
যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ড শহর। ১৯৫০-এর দশক থেকে বাংলাদেশিরা এখানে আসতে শুরু করে, কেউ শ্রমিক হিসেবে, কেউ শিক্ষার্থী হিসেবে, কেউবা ব্যবসা গড়তে। এ শহরের গলি-মহল্লায় হেঁটে গেলে বোঝা যায়, এটি আর কেবল ব্রিটেনের কোনো সাধারণ শহর নয়। এটি হয়ে উঠেছে এক বহুজাতিক সংস্কৃতির মেলবন্ধন, যেখানে শেফিল্ড, লিডস কিংবা ম্যানচেস্টারের মতো ব্যস্ততা না থাকলেও, এখানকার জীবনযাত্রা অভিবাসীদের জন্য অনেক সহজ। কারখানাগুলোতে কাজের সুযোগ, বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও দোকানে কাজ পাওয়া সহজ, বাসা ভাড়াও তুলনামূলক কম- এই কারণে অনেক অভিবাসী এই শহরকে আপন করে নেয়।
বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য ব্র্যাডফোর্ড এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এখানে রয়েছে মসজিদ, বাংলা বাজার, দেশীয় খাবারের রেস্তোরাঁ, বাঙালিদের পরিচালনায় আরও অনেক ব্যবসা। এছাড়া এ শহরের পুরনো বাঙালি অভিবাসীরা নতুনদের সাহায্য করে, কাজের সুযোগ খুঁজে দেয়।
সেদিন বসন্তের শীতল বাতাসে ব্র্যাডফোর্ড শহরের আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। গোধূলির আলো ক্রমশ ম্লান হয়ে আসছিল। ভিজে রাস্তাগুলোয় মৃদু কুয়াশা ভেসে বেড়াচ্ছিল, যেন শহরটিও আজ কোনো গোপন বেদনায় নীরব হয়ে আছে। এ শহর অভিবাসীদের জন্য নতুন স্বপ্নের ঠিকানা, যেখানে হাজারো মানুষ আসে এক নতুন জীবন গড়ার প্রত্যাশায়। কিন্তু এই শহরই এক তরুণীর স্বপ্নভঙ্গের সাক্ষী হবে, এক নারীর নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার উপাখ্যান রচনা করবে কে জানতো!

কুলসুমা আক্তার। ২৭ বছরের এক তরুণী, ব্র্যাডফোর্ডে এসেছিলেন নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, স্বপ্ন দেখতেন উচ্চশিক্ষার। তার বাবা সৌদি আরবে চাকরি করতেন, মা থাকতেন সিলেটের গ্রামে। কুলসুমার বড় বোনের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর তিনি মায়ের একমাত্র সঙ্গী হয়ে ওঠেন।
একদিন এক আত্মীয়ের মাধ্যমে পরিচয় হয় হাবিবুর মাসুমের সঙ্গে। মাসুম তখন ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করছে, ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে মাস্টার্স করছে বেডফোর্ডশায়ার ইউনিভার্সিটিতে। দুজনের মধ্যে কথাবার্তা বাড়তে থাকে, সম্পর্ক গাঢ় হতে থাকে। মাসুম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ সক্রিয় ছিল, ইউটিউবে নিজের জীবনের বিশেষ বিশেষ মুহূর্তগুলো শেয়ার করত। সে জানায়, তার স্বপ্ন ইউরোপ ভ্রমণ করা, সফল এক ব্লগার হওয়া।
কিছুদিন পর দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে হয়ে যায়। বাংলাদেশে জমকালোভাবে আয়োজন করা হয় সে বিয়ের অনুষ্ঠান। বিয়ের পরই মাসুম ফিরে যায় ইংল্যান্ডে। পরে স্পাউস ভিসায় কুলসুমাকে নিজের কাছে নিয়ে আসে। নতুন দেশে এসে কুলসুমা নতুন জীবন শুরু করে। প্রতিদিন মায়ের সাথে ভিডিও কলে কথা বলত।

প্রথম প্রথম সবকিছু ভালোই চলছিল। তারা ওল্ডহ্যামে একটি ছোট বাসা ভাড়া নেয়। মাসুম ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস করত, পাশাপাশি অনলাইনে কনটেন্ট তৈরি করত। কুলসুমা নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। কিছুদিন পর সে একটি স্থানীয় দোকানে পার্ট-টাইম চাকরি নেয়, পাশাপাশি বাসার কাজ সামলায়।
এদিকে মাসুমের মধ্যে এক ধরনের পরিবর্তন আসতে থাকে। সে অনলাইনে বেশি সময় দিত। কিন্তু কুলসুমা সংসারের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ছিল। সে চাইতো মাসুম স্থিতিশীল কোনো চাকরি করুক। এ নিয়ে প্রায়ই তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হতো। ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে।
একদিন কুলসুমা জানতে পারে, মাসুমের সাথে অন্য এক মেয়ের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এই নিয়ে তাদের সম্পর্ক আরও অবনতি হয়। কুলসুমা তখন অন্তঃসত্ত্বা। সে সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সবকিছু সহ্য করে যাচ্ছিলো।

সন্তান জন্ম নেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে থাকে। মাসুম কোনো দায়িত্ব নিতে চায় না। দেখা যায়, সংসারের প্রতি তার কোনো টান নেই। কুলসুমা একসময় সিদ্ধান্ত নেন, সে ব্র্যাডফোর্ডে চলে যাবে, যেখানে তার এক বান্ধবী থাকে। সে ভেবেছিল, হয়তো কিছুদিন আলাদা থাকলে সম্পর্কের অবস্থা ভালো হবে।
ব্র্যাডফোর্ডে আসার পর কুলসুমা একটি নারীদের সহযোগিতা কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ করে। সে ধীরে ধীরে নিজের জীবন গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করে।
নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন পরিকল্পনা করছিল কুলসুমা। সে চেয়েছিল, সন্তান যেন একটি নিরাপদ পরিবেশে বড় হতে পারে, যেখানে কোনো অস্থিরতা বা অনিশ্চয়তা থাকবে না। সে স্থানীয় একটি কলেজে ভর্তি হওয়ার চিন্তাভাবনাও করছিল, যেন ভবিষ্যতে ভালো কোনো চাকরি পেতে পারে এবং তার সন্তানের জন্য একটি স্থিতিশীল জীবন গড়ে তুলতে পারে।
কিন্তু মাসুম এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি। সে চাইত, কুলসুমা তার কথামতো চলুক, তার কাছে ফিরে আসুক। সে বারবার কুলসুমাকে ফোন করে ভয় দেখাতে থাকে, এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
৬ এপ্রিল ২০২৪, শনিবার। সেদিন বিকেলে কুলসুমা তার পাঁচ মাসের শিশুকে নিয়ে কেনাকাটা করতে বেরিয়েছিল। ওয়েস্টগেটের রাস্তায় হাঁটছিলো সে, এক হাতে শিশুর প্রম, অন্য হাতে ফোন। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাসুম সামনে এসে দাঁড়ায়। তার চোখ ছিল লাল, সে ছিল ক্ষুব্ধ।
কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই সে পকেট থেকে ছুরি বের করে কুলসুমার গলায় আঘাত করে। চারপাশে মানুষ আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে। দোকানদার জিও খান দৌড়ে আসেন, কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। কুলসুমা নিস্তেজ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, তার সন্তানের কান্না বাতাসে ভেসে বেড়ায়। মাসুম পালিয়ে যায়।
চারদিনের অভিযান শেষে আয়লসবেরি থেকে পুলিশ মাসুমকে গ্রেপ্তার করে। ব্র্যাডফোর্ডের মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে, শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে মাসুমের কঠিন শাস্তি দাবি করে।
মাসুমের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। আদালতের শুনানিতে তার অপরাধ প্রমাণিত হয় এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাকে আজীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যেখানে তাকে ন্যূনতম ২৫ বছর কারাভোগ করতে হবে।
বিচারক রায় দেওয়ার সময় বলেন, ‘এটি একটি নির্মম ও পরিকল্পিত হত্যা। কুলসুমা তার সন্তানের নিরাপত্তার জন্য লড়াই করছিলেন, কিন্তু তুমি তাকে সে সুযোগ দাওনি। সমাজের জন্য তুমি একটি ভয়ঙ্কর হুমকি।’
সিলেটে, যে মা প্রতিদিন তার আদরের মেয়ের ফোনের অপেক্ষা করতেন। সেই ফোন এখন আর বাজে না।









