
একটা সময় ছিল, স্বপ্ন বিক্রি করত কবিরা—আকাশে বাসা বাঁধার রূপক দিয়ে। এখন সেই বাসা বাঁধার স্বপ্নেই কেউ বিক্রি করে দিচ্ছে নিজের শরীরের অদৃশ্য কোষ, যেগুলো কখনো এক জীবনের সূচনা করতে পারতো। কেউ অর্থের অভাবে বিক্রি করছে নিজস্ব অস্তিত্বের বীজ, আর কেউ কিনে নিচ্ছে ‘সন্তান’ নামক এক আগন্তুককে, যার উৎসের গল্প হয়তো সে জানবেই না।
এক সময় মানুষ বংশ রক্ষা করত আত্মত্যাগ দিয়ে। এখন সেটা হয় বিজ্ঞাপন দিয়ে। কোনো এক সকালে চোখ খুলেই দেখা যায়—“আবশ্যক: বুদ্ধিমতী, সুদর্শনা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণীর ডিম্বাণু। দাতাকে অবশ্যই রোগমুক্ত, সঙ্গীতপ্রিয় এবং নীল চোখের অধিকারী হতে হবে। উপযুক্ত পারিশ্রমিক প্রদান করা হবে।”
হ্যাঁ, পৃথিবী বদলেছে। প্রযুক্তি দিয়েছে বুদ্ধি, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে স্নেহের শুদ্ধতা। আজকের সভ্যতায় সন্তান জন্ম দেয়ার গল্প শুরু হয় ক্লিনিক, ক্যাম্পেইন আর ক্যাশ দিয়ে। একটি শিশুর পরিচয় হয়ে যায় “আইডি নম্বর 112345, Blue Eyes, SAT 1500”। আমেরিকায় শুধু ২০২৩ সালেই ৪০,০০০+ শিশুর জন্ম হয়েছে IVF ও সারোগেসির মাধ্যমে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর আমেরিকায় ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে এক ভয়াবহ চেহারা নিয়ে। ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই বছরে প্রায় ১৫,০০০ ডিম্বাণু দান হয়, যার অনেকগুলোই সরাসরি অর্থের বিনিময়ে। গড়ে একজন ডোনার পান ৮,০০০ থেকে ১৫,০০০ ডলার, তবে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের নারীদের (উচ্চতর শিক্ষা, সৌন্দর্য, নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী) ক্ষেত্রে এই অঙ্ক ৫০,০০০ ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
এই রকমই এক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান আমেরিকার অ্যাডভান্সড ফার্টিলিটি সেন্টার অব শিকাগো। তাদের মুখপাত্র জানিয়েছেন, ডোনারদের জন্য তারা গড়ে $10,000 পর্যন্ত দিয়ে থাকেন, আর ক্লায়েন্টের একটা বড় অংশই কানাডা থেকে আসে।
ক্রেতারা হলেন- নিঃসন্তান দম্পতি, সিঙ্গেল মাদার হতে চাওয়া নারী, সমকামী যুগল, এমনকি ধনাঢ্য পরিবারও যারা নিজেদের জিনগত বৈশিষ্ট্য রাখতে চান।
আর বিক্রেতারা হলো- বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, আর্থিকভাবে সংকটে থাকা গৃহবধূ, অবিবাহিত তরুণী, এমনকি কিছু অভিবাসী নারীও এই তালিকায় রয়েছেন।
দুই দশক আগেও এসব গল্প ছিল ফিসফিসে গুঞ্জন। এখন তা গলা চড়িয়ে রাস্তায় চিৎকার করে বলার মতো ব্যাপার। যুক্তরাষ্ট্র আর কানাডার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া চলাকালীনই ডিম্বাণু বিক্রির অফার আসে মেয়েদের কাছে। কারণ স্পষ্ট—ওখানেই আছে young, smart, and beautiful শ্রেণির উৎস।
একজন বিজ্ঞাপনদাতা সরাসরি বলেই ফেলেছেন—’আমি রাস্তা থেকে একটা নেশাগ্রস্ত মেয়ের ডিম্বাণু চাই না। আমি চাই একটা শিক্ষিত, সুস্থ, ভালো মেয়ের ডিম্বাণু—যার দ্বারা ভবিষ্যতের একটি সুন্দর সন্তান পাওয়া সম্ভব।’
আজ আর কেউ পত্রিকায় ছোট বিজ্ঞাপন দেয় না। এখন ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, এমনকি রেডডিট—সবখানে রয়েছে ডিম্বাণু-শুক্রাণু দানের গোপন ও প্রকাশ্য দুনিয়া। শত শত এজেন্সি তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করছে হাজার হাজার নারীর জীবনবৃত্তান্ত—উচ্চতা, ওজন, চোখের রং, ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী, এমনকি SAT (Scholastic Assessment Test হলো যুক্তরাষ্ট্রের একটি মানদণ্ডভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা।) স্কোর পর্যন্ত!
গ্রেস নামের এক লোকগীতি শিল্পী—৩০ বছর বয়সী, কানাডার ন্যাশভিলে বসবাসকারী। দশ বছর আগে তার সর্বশেষ অ্যালবাম বাজারে এসেছিল। তারপর চুপচাপ। অর্থের অভাবে তিনি হয়ে পড়েন ঋণে জর্জরিত। কী বিক্রি করবেন? পুরনো গিটার? নাকি স্মৃতির গান? গ্রেস সিদ্ধান্ত নেন তার ডিম্বাণু বিক্রির। তিনি ইন্টারনেটে নিজের নামসহ পার্সোনাল পেজ খুলে দেন—ছবিসহ জীবনবৃত্তান্ত, শৈশবের গল্প, পারিবারিক মেডিকেল হিস্টোরি। দাবি—মাত্র ২,৫০০ ডলার এবং আনুষঙ্গিক খরচ। এ পর্যন্ত ডজনখানেক দম্পতি আগ্রহ দেখিয়েছেন। তার মধ্যে একজন ইতিমধ্যেই ডিল পাকা করেছেন। গ্রেস জানালেন—’আমি এটা করছি আমার ক্রেডিট কার্ডের বিল মেটাতে। আমি একজন ভালো মা হবো না, কিন্তু হয়তো কারো মা হওয়ার স্বপ্নটা পূরণ করে দিতে পারি।’
মারিয়া। নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী। তার বার্ষিক টিউশন ফি প্রায় ৯ হাজার ডলার। বাবা-মায়ের পক্ষে খরচ চালানো সম্ভব নয়। বৃত্তিও পাননি। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন—ডিম্বাণু বিক্রি করবেন। এজেন্সির মাধ্যমে যোগাযোগ করলেন। চুক্তি অনুযায়ী একবারে পাঁচটি সেশনে ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হবে, প্রতিবার ১,৮০০ ডলার করে পাবেন।
এই ব্যবসায় রয়েছে তৃতীয় পক্ষ—অর্থাৎ এজেন্ট। তারা শুধু ক্লায়েন্টের দাবি-দাওয়া শুনে ডিম্বাণু জোগাড় করে দেয় না, চুলের রঙ, উচ্চতা, শরীরের গঠন থেকে শুরু করে পারিবারিক চিকিৎসা ইতিহাস পর্যন্ত সব কিছু জানিয়ে দেয়। কে বলবে এটা মানুষের বংশ নয়, যেন কোনো দামী ঘোড়ার বংশতালিকা!
সবচেয়ে বড় সংকট হলো শিশুটির পরিচয়ের। যেমন, একটি দম্পতির সন্তান গলার সংক্রমণে ভুগছিল। ডাক্তার যখন পারিবারিক মেডিকেল হিস্টোরি জানতে চাইলেন, তারা অক্ষম—কারণ ডোনারের কোনো তথ্য তাদের নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব তথ্য সংরক্ষিত থাকে না বা জানানো হয় না।
অনেকে আইন ও নৈতিকতার প্রশ্ন তুলছেন। যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি অর্থের বিনিময়ে ডোনেশন বৈধ। কানাডায় ২০০৪ সালের Assisted Human Reproduction Act অনুযায়ী, কেউ ডিম্বাণু বা শুক্রাণুর বিনিময়ে অর্থ নিতে পারেন না। তবে “আনুষঙ্গিক খরচ” দেওয়া যায়। বাস্তবে এই আইন অনেক সময় এড়িয়ে যাওয়া হয়। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও ফ্রান্সে অর্থের বিনিময়ে ডোনেশন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শুধু “ভলান্টারি” দান অনুমোদিত। ভারতে বিদেশিদের জন্য বাণিজ্যিক সারোগেসি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আজকের এই তথাকথিত সভ্য দুনিয়ায় একটি শিশু জন্মায়—তিনজন মায়ের হাত ধরে। একটি কোষ দিয়ে, একটি গর্ভ দিয়ে, একটি ভালোবাসা দিয়ে। কিন্তু জন্মের দিনই প্রশ্ন উঠে—শিশুটির প্রকৃত বাবা কে? তার প্রকৃত মা কে? একটি অদেখা শিশুর প্রশ্ন—আমি কার?









