
১৯৯৩ সালের ১৯ এপ্রিল। টরন্টোর ক্রিস্টি সাবওয়ে স্টেশনের পাশের আবাসিক এলাকার এক বৃদ্ধা প্রতিদিনের মতো ভোরবেলায় ঘর থেকে বেরিয়ে বেলকনিতে পায়াচারি করছিলেন। হঠাৎ তার চোখ যায় অদূরে তার বাড়ির সীমানায় অবস্থিত গাছের নীচে। তিনি দেখতে পান বিশাল একটি কালো গার্বেজ ব্যাগ রাখা আছে সেখানে। তিনি রহস্যজনক এ ব্যাগটি দেখতে এগিয়ে আসেন। প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো কেউ অপ্রয়োজনীয় কিছু ফেলে গেছে। কিন্তু কৌতূহলবশত ব্যাগটি নাড়াচাড়া করতেই শিউরে ওঠেন তিনি। দেখতে পান ব্যাগের ভেতরে কম্বলে মোড়ানো এক যুবতীর নিথর দেহ! হতবাক বৃদ্ধা কোনোভাবে নিজেকে সামলে নিয়ে ৯১১ নম্বরে ফোন করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশের গাড়ি এসে যায়। শুরু হয় তদন্ত। চলে প্রতিবেশিদের জিজ্ঞাসাবাদ, পথচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ। কিন্তু মেয়েটির পরিচয় আর কেউ বলতে পারে না। পুলিশের কাছে একটাই অনুমান- সে দক্ষিণ এশীয়। ফরেনসিক রিপোর্ট বেরিয়ে এলো কিছুদিন পর। মেয়েটিকে ইনজেকশনের মাধ্যমে সাপের বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হয়েছে। মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়ার পর পুলিশ আরও তদন্ত শুরু করে এবং নিশ্চিত হয় সে বাংলাদেশের মেয়ে, তার নাম সাবিহা পারভীন। কানাডায় সে একজন নতুন অভিবাসী।
১৯৯০ সালের মার্চ মাসের কোনো এক দুপুরে টরন্টো ডাউন টাউনে ঘুরতে বেরিয়েছি। সে সময় টিটিসি’র মাসিক মেট্টোপাসের মূল্য ছিল সম্ভবতঃ ৪৯ ডলার। শিক্ষার্থীদের জন্য আরও কম। শহর দেখার জন্যে প্রায়ই ঘুরতে বেরিয়ে পড়তাম। নগরীর এ মাথা থেকে ও মাথা অর্থাৎ কিপলিং থেকে কেনেডি পর্যন্ত ঘুরে বেড়ানোটাই ছিল মহা আনন্দের বিষয়। ঐদিন ঘুরতে ঘুরতে বার্থাস্ট এন্ড ব্লোর স্ট্রিটে আসি। এ ব্যস্ত ইন্টারসেকশনের কর্ণারে Honest Ed’s নামে বিশাল একটি ডিসকাউন্ট ষ্টোর ছিল। সেসময় এটি ছিল টরন্টোর একটি অন্যতম ল্যান্ডমার্ক। দোকানটি যত না বড় ছিলো তার সাইনবোর্ড ছিল তত বড়। এতো বড় সাইনবোর্ড এর আগে কোথাও দেখিনি। ঐ সময় ডলার ষ্টোর, ওয়ালমার্টের মতো ডিপার্টমেন্টাল ষ্টোর ছিলো না। নতুন অভিবাসীদের পছন্দের দোকান ছিল এটি। সব সময় ডিসকাউন্ট লেগেই থাকতো। সস্তায় কেনাকাটা করার জন্য বক্সিং ডে’র আগের রাতে ক্রেতাদের যে বিশাল লাইন থাকতো তা উত্তর আমেরিকার অন্য কোথাও দেখা যেতো না।

ঐদিন আমি দোকানটির উল্টোদিকে দাঁড়িয়েছি এমন সময় এক তরুনী একটি কনভিনিয়েন্স ষ্টোর থেকে বেরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ‘হাই’ দিল। চেহারায় এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা! হাসিখুশি, প্রাণবন্ত একটি মেয়ে। মুখাবয়ব দেখে বাঙালি বলে মনে হলো; আবার কোরিয়ান বলেও মনে হলো (কেননা, টরন্টোর ৯৮ ভাগ কনভিনিয়ান্ট ষ্টোরের মালিক কোরিয়ান)। দেখলাম সে আমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছুক। একটু এগিয়ে গেলে আমাকে তার দোকানের ভেতরে নিয়ে গেলো। পরিচয় দিলো সে বাংলাদেশের মেয়ে। তার নাম সাবিহা। আমার নাম বলতেই সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। ‘‘আপনাকে সামনে থেকে দেখবো ভাবিনি!’’ বলে আনন্দে লাফাতে লাফাতে আপ্যায়ন করার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লো। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ঐ সময় আমি ‘বাংলার মুখ’ নামে টেলিফোন ভিত্তিক একটি সংবাদ মাধ্যম পরিচালনা করতাম (নির্দিষ্ট নম্বরে ডায়াল করলেই যে কোনো সময় বাংলা সংবাদ শোনা যেতো)। সংবাদ মাধ্যমটি কতো জনপ্রিয় ছিলো একমাত্র কমিউনিটির পুরনো লোকেরা বলতে পারবেন। ঐ সূত্রে সবাই আমার নাম জানে কিন্তু সকলের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। আমার সাথে পরিচিত হয়ে সাবিহা যেনো বিশাল কিছু একটা আবিষ্কার করে ফেলেছে! ফেরার সময় এক আবদার করে বসলো- কিভাবে টেলিজার্ণাল চলে সে দেখতে চায়। তার চোখে ছিল বিস্ময়ের আলো, জানার কৌতূহল!

একদিন সাবিহা অনেক গিফট নিয়ে আমার বাড়িতে আসে। সেদিন সে অনেক গল্প শোনায়। তার আচরনে ছিল ভিন্নতা। সে হাসতে হাসতে গল্প বলে। সারাক্ষণ যেনো তার মুখে হাসি লেগেই আছে। এরপর আরও কয়েকবার তার সাথে দেখা হয়। প্রতিবারই যেনো সে আমাকে কিছু বলার চেষ্টা করেছিলো। হয়তো তার জীবনের গল্প; হয়তো কিছু রহস্য; কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি। প্রত্যেকবারই নানান ছলে এড়িয়ে গেছি। তারপর অনেকদিন আর সাবিহার খবর জানি না। সেও যোগাযোগ করেনি। অতঃপর একদিন খবরে এলো তার মৃত্যু সংবাদ। এবার সে আমার টেলিজার্ণালের খবর হয়ে এলো। ‘দেশে বিদেশে’ পত্রিকার শিরোনামেও স্থান করে নিলো। সাবিহা হত্যাকাণ্ডের খবর টরন্টোর বাংলাদেশি কমিউনিটিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। গোটা কমিউনিটি শোকে স্তব্দ হয়ে যায় এ মর্মান্তিক মৃত্যু সংবাদে।
সাবিহার জন্ম বরিশালে। সহজ-সরল এই মেয়েটি ভাগ্য বদলের আশায় ঢাকায় এসেছিলো। সেখানে তার পরিচয় হয় জনৈক আব্দুল জব্বার খানের সঙ্গে, যে একজন আদম ব্যাপারী। স্বপ্ন দেখিয়ে, ভালোবাসার মোড়কে মোড়ানো এক প্রলোভনে, জব্বার তাকে কানাডায় নিয়ে আসে। নতুন দেশে নতুন জীবন শুরু করেছিলো সাবিহা। কিন্তু এই স্বপ্ন এক সময় দুঃস্বপ্ন হয়ে ওঠে।

প্রথম দিকে সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আব্দুল জব্বারের মুখোশ খুলতে থাকে। জব্বারের বাড়ি ছিল মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ায়। সে কেবলই এক দালাল, মানুষের সরলতা আর স্বপ্নকে পুঁজি করে নিজের স্বার্থ হাসিল করাই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য। সাবিহার জীবনও তার শিকার হয়। সম্পর্কের বাঁধন গলে বিষিয়ে ওঠে, নির্যাতন শুরু হয়।
টরন্টো পুলিশ জোরে-শোরে চাঞ্চল্যকর সাবিহা হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নামে। সন্দেহভাজন হিসেবে উঠে আসে তার কথিত স্বামী আব্দুল জব্বারের নাম। তবে সরাসরি প্রমাণ না থাকায় তাকে ধরা সম্ভব হয়নি। কিন্তু ঘটনার পরপরই তার ভাই মোহাম্মদ হোসেন পালিয়ে যায় বাংলাদেশে। সন্দেহের তীর তার দিকেই চলে যায়। তদন্তে দেখা যায়, সাপের বিষ সে সংগ্রহ করে এনেছিলো। অতঃপর আরও তদন্তের স্বার্থে কানাডার রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ (RCMP) এর একটি টিম ঢাকায় গিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা কামনা করে। কিন্তু বাংলাদেশি প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা তাদের সহযোগিতা করে না। বলা হয়, কানাডার সাথে বাংলাদেশের বন্দি বিনিময়ের কোনো চুক্তি নেই, তাই সহযোগিতা করা সম্ভব নয়। অনেকেই ধারণা করেন, ঘুষের বিনিময়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল। যার ফলে হত্যাকারীকে ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয় আরসিএমপি। আর তখনই নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের দরজা চিরদিনের মতো বন্ধ হয়ে যায়।
আজকের মতো আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা ছিল না সে সময়। অনেক চেষ্টা করেও সাবিহার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। আজও জানা যায়নি, তার মা-বাবা কোনোদিন জানতে পেরেছিলেন কিনা যে তাদের মেয়ে এই নির্মম পরিণতির শিকার হয়েছিল!
স্বপ্নের দেশ কানাডায় এসে অভিবাসীরা হাজারো স্বপ্ন দেখে। কারো কারো সেই স্বপ্ন পূরণ হয়, কেউ কেউ আবার হারিয়ে যায়। হতভাগী সাবিহাও হারিয়ে গেছে। তার স্বপ্নভঙ্গের আর্তনাদ আজও আমার কানে বাজে। আমি আজও ভাবি- আমাকে কী বলতে চেয়েছিল সাবিহা?









