সম্পাদকের পাতা

শায়লা নামের মেয়েটি!

নজরুল মিন্টো

আজ থেকে ২২ বছর আগের কথা। কানাডার নিউ ব্রান্সইউক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী শায়লা আক্তার একদিন হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়ে গেলো। বন্ধুরা খোঁজাখুঁজি শুরু করল, কিন্তু কোথাও তার কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না। দশ দিন পর, পুলিশ যখন তার অ্যাপার্টমেন্টের দরজা খুলল, তখন বিছানায় মুখ ঢেকে রাখা একটি নিথর দেহ তারা দেখতে পেল।

গল্পের শুরু যেভাবে: বাংলাদেশের পাবনা শহরের শালগাড়িয়া এলাকার হাসপাতাল রোডের রোস্তম আলী ও ইরানী বেগমের ছোট মেয়ে অপরূপা সুন্দরী শায়লা আক্তার। এডওয়ার্ড কলেজের একটি স্মার্ট মেয়ে হিসেবে ছিল তার পরিচিতি। শৈশব থেকেই ছিল মেধাবী, বইয়ের পাতায় ডুবে থাকতো, স্বপ্ন দেখতো একদিন উচ্চশিক্ষা লাভ করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে। ১৯৯৬ সালে আকস্মিকভাবে ইশ্বরদি উপজেলার পাকশী গ্রামের নিন্টু মিয়ার কানাডা প্রবাসী ছেলে আব্দুল বারীর সাথে তার বিয়ে হয়ে যায়। অভিভাবকরা ঐ সময় তাকে কানাডায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের আশ্বাস দেন।

বিয়ের পর শায়লা স্বামী বারীর সঙ্গে কানাডার নিউ ব্রান্সউইকের ফ্রেডেরিক্টন শহরে পাড়ি জমায়। প্রথম দিকে সব কিছু স্বাভাবিক মনে হলেও, শিগগিরই সে উপলব্ধি করে, তার নতুন জীবন এক ভয়ঙ্কর ছলনা ছাড়া কিছুই নয়। বারী ছিলেন কঠোর, নিয়ন্ত্রণপরায়ণ এবং সন্দেহপ্রবণ একজন ব্যক্তি। শায়লার নিজস্ব কোনো অস্তিত্ব যেন বারীর ইচ্ছার বাইরে ছিল না। কিন্তু শায়লা ছিলো স্বপ্নবাজ। তার স্বপ্ন পূরনের লক্ষ্যে সে নিউ ব্রান্সউইক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। এ সিদ্ধান্ত বারীকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। শুরু হয় অপমান, হুমকি, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।

২০০২ সালে, অনেক সাহস সঞ্চয় করে, শায়লা বারীর নিপীড়নমূলক সংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসে। নগরীর রিজেন্ট স্ট্রিটের একটি ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে নতুনভাবে জীবন শুরু করে। সে চেয়েছিলো নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে।কিন্তু বারী তাকে সহজে ছাড়তে নারাজ। সে রাতের বেলায় শায়লার জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকত, ক্যাম্পাসে গিয়ে তাকে অনুসরণ করত, ফোনে ভয়ভীতি দেখাত। এক পর্যায়ে মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে শায়লা পুলিশের কাছে অভিযোগ করে। আদালত বারীকে অপরাধমূলক হয়রানির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে।

অবশেষে এলো সেই ভয়ঙ্কর রাত। ১৫ জুলাই, ২০০৩। নিউ ব্রান্সউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে গভীর রাত পর্যন্ত পড়ছিলো শায়লা। আসন্ন পরীক্ষার জন্য সে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করেছিলো। রাত সাড়ে ন’টায় তাকে শেষবার দেখা যায়। রাত সাড়ে দশটায় সে তার এক বন্ধুর সঙ্গে ফোনে কথা বলে। তারপর? ইতিমধ্যে দশ দিন কেটে গেছে। বন্ধুরা উদ্বিগ্ন হয়ে পুলিশের দ্বারস্থ হয়। ২২ জুলাই, ২০০৩। পুলিশ যখন শায়লার রিজেন্ট স্ট্রিটের অ্যাপার্টমেন্টের দরজা ভাঙে, তখন যে দৃশ্য দেখা যায়, তা শীতল করে দেয় হৃদয়। নিথর হয়ে পড়ে আছে শায়লা। চোয়াল ভাঙা, বুকের চারটি পাঁজর ভাঙা, মাথার পেছনে গভীর আঘাত, নাক ও মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত গড়িয়ে পড়ার চিহ্ন। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট জানায়, শায়লাকে ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতনের পর মুখ বালিশ চেপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে।

শুরু হয় চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকান্ডের পুলিশি তদন্ত। একে একে সামনে আসে প্রমাণ। হত্যার অস্ত্র ছিল একটি প্রাই বার (লোহার হাতুড়ির মতো শক্ত বস্তু)। হত্যার দিনই বারীর ব্যাংক কার্ড দিয়ে স্থানীয় দোকান থেকে একটি প্রাই বার কেনা হয়েছিল। শায়লার বাসার আঙিনায় পাওয়া যায় এক জোড়া গ্লাভস্। এগুলো হোটেল শেরাটনে ব্যবহার করা হতো। সে সময় আব্দুল বারী শেরাটন হোটেলে কাজ করতেন। এছাড়া বারীর DNA শায়লার শরীরে পাওয়া যায়। অতঃপর সব প্রমাণ বলে দেয়- শায়লার খুনি তার স্বামী আব্দুল বারী।

২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, তিন সপ্তাহের শুনানি শেষে আদালত বারীকে প্রথম-ডিগ্রি হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ২৫ বছরের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।

শায়লা আক্তার, যার জীবন ছিল সম্ভাবনায় ভরা। কিন্তু এক অসহিষ্ণু, সহিংস সম্পর্কের বলি হয়ে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। শায়লার গল্প এখানেই শেষ।

শায়লা আক্তারের স্মৃতিকে জাগরুক রাখতে নিউব্রান্সউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ‘শায়লা স্মৃতি বৃত্তি’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সিঙ্গার’ হলের সামনে শায়লার নামে একটি গাছ রোপন করা হয়।


Back to top button
🌐 Read in Your Language