
ঢাকা, ০২ জানুয়ারি – বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন মোস্তফা জগলুল ওয়াহিদ মারা যান ১০ অক্টোবর। বিষয়টি গোপন করে ১১ অক্টোবর তার অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা তুলে নেন কথিত স্ত্রী ভারতীয় নাগরিক আঞ্জু কাপুর।
এদিকে প্রায় ৩ মাসেও পরিশোধ করা হয়নি জগলুল ওয়াহিদের নামে কেনা কবরের টাকা। ভারতীয় নাগরিক আঞ্জু কাপুর নিজেকে জগলুল ওয়াহিদের স্ত্রী দাবি করে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফনের আবেদন করেন। আবেদনে জগলুলের কবরকে ২৫ বছর মেয়াদে সংরক্ষণের কথা উল্লেখ করা হয়। এজন্য নিয়ম অনুযায়ী ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বিল আসে ১১ লাখ টাকা। কিন্তু এ পর্যন্ত কোনো টাকা দেয়া হয়নি।
অন্যদিকে প্রতারণার মাধ্যমে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে জগলুল ওয়াহিদের মেয়ে মুশফিকা মোস্তফা বাদী হয়ে আঞ্জু কাপুরের নামে মামলা করেছেন। ২০ ডিসেম্বর গুলশান থানায় এ মামলা হয়।
জগলুল ওয়াহিদের আরেক মেয়ে মোবাশশারা মোস্তফা বলেন, বাবাকে দেখাশোনার নাম করে ৬ বছর আগে গুলশানের একটি বাড়িতে ঢোকেন আঞ্জু কাপুর। বাসায় অন্য কেউ না থাকায় বাবার সবকিছু আঞ্জুই দেখাশোনা করতেন।বাবা মারা যাওয়ার পর নিজেকে বাবার স্ত্রী দাবি করে শত কোটি টাকার সম্পত্তি (বাবার বাড়ি) নিজের দখলে নিয়ে যান আঞ্জু কাপুর। গুলশান-২ নম্বরের ৯৫ নম্বর রোডের ৪ নম্বর রোডে ১০ কাঠা জমির ওপর নির্মিত তৃতীয়তলাবিশিষ্ট বিলাসবহুল বাড়ি এটি। আমাদের কোনো ভাই নেই। আমরা দুই বোন। বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের ওই বাড়িতে ঢুকতে দিচ্ছিল না আঞ্জু কাপুর। বোন মুশফিকা মোস্তফাকে নিয়ে বেশ কয়েকদিন বাড়ির গেটে বসে থেকেও প্রবেশ করতে পারছিলাম না। একপর্যায়ে আদালতের হস্তক্ষেপে বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি পাই।
আরও পড়ুন : বরগুনায় মেয়র পদে বাবা-মেয়ের একসঙ্গে মনোনয়নপত্র দাখিল
তিনি বলেন, এ বাড়িটি একটি মিনি জাদুঘর। বাসার ভেতর ভিক্টোরিয়া রানীর ভাস্কর্য, বঙ্গবন্ধুর পোর্ট্রেট, এসএম সুলতানের দুর্লভ চিত্রকর্ম, অ্যামেনিস পাথরের সামগ্রী, শ্বেতপাথরের টেবিল, ৩৫টি মূল্যবান ঝাড়বাতি, রানী ভবানীর খাট, ইন্দোনেশিয়া থেকে আনা ফার্নিচার, ১৫০ বছরের পুরনো ২০০ বোতল আতর, নানা-দাদার দেয়া হীরার আংটি এবং আমার জন্মদিনের উপহারসহ ৫০ কোটি টাকার বেশি জিনিসপত্র রেখেছিলেন বাবা। কিন্তু অনেক মূল্যবান জিনিস আঞ্জু কাপুর বাড়ি থেকে সরিয়ে ফেলেছেন। এ নিয়ে আঞ্জু কাপুরের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় দুটি জিডিও করেছি।
মামলার বিবরণীতে মুশফিকা মোস্তফা বলেন, ব্যাঙ্গালুরুর বাসিন্দা আঞ্জু কাপুরকে গৃহপরিচারিকা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। বাবা মারা যাওয়ার পর ১২ অক্টোবর আমি সিটি ব্যাংকের গুলশান শাখায় তার অ্যাকাউন্টের বিষয়ে খোঁজ নিতে যাই। ব্যাংক থেকে জানতে পারি, ১১ অক্টোবর আঞ্জু কাপুর ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের টাকা তুলে নিয়ে গেছেন। এ সময় ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে আমার বাবার মৃত্যুর বিষয়টি গোপন করা হয়।
মুশফিকা বলেন, আমি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে বাবার ব্যাংক স্টেটমেন্ট চাইলে তারা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। পরে এ বিষয়ে ১৫ ডিসেম্বর হাইকোর্টের আদেশ নিয়ে ব্যাংকে গেলে কর্তৃপক্ষ আমাকে স্টেটমেন্ট দেয়। ব্যাংক স্টেটমেন্টে দেখতে পাই, বাবার মৃত্যুর পরদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টার মধ্যে ওই অ্যাকাউন্ট থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে এ টাকা উত্তোলনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তারা জানান, টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে আঞ্জুকে ম্যান্ডেট দিয়েছিলেন জগলুল। এ ম্যান্ডেট তার জীবদ্দশায় কার্যকর। কিন্তু মারা যাওয়ার পর ম্যান্ডেট কার্যকর নয়। টাকা তোলার সময় জগলুল ওয়াহিদের মৃত্যুর বিষয়টি গোপন করেছিল আঞ্জু কাপুর।
আরও পড়ুন : জীবন নিয়ে খেলেছেন সাবরিনারা
এ বিষয়ে মুশফিকা-মোবাশশারার আইনজীবী মঞ্জিল মোর্শেদ বলেন, প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টধারী মারা গেলে তার নমিনি বা ওয়ারিশরা সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টে থাকা টাকার মালিক হবেন। এক্ষেত্রে আঞ্জু কাপুর একজন হিন্দু নারী। জগলুলের সঙ্গে তার বিয়ের কোনো কাবিননামা নেই। দুজন দুই ধর্ম পালন করেন। তাই আইনগতভাবে আঞ্জু কাপুর ওই টাকা পেতে পারেন না। প্রতারণামূলকভাবে জগলুলের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে নিয়েছেন আঞ্জু।
মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের সিনিয়র মোহরার সানোয়ার হোসেন বলেন, ২৫ বছরের জন্য জগলুলের কবর সংরক্ষণের জন্য আঞ্জু কাপুর নিজেকে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে আবেদন করেছেন। আবেদন অনুযায়ী আমরা জগলুলকে দাফন করেছি। কিন্তু এখনও আমাদের কোনো টাকা দেয়া হয়নি। এমনকি দাফনের পর থেকে এ পর্যন্ত আঞ্জুর পক্ষ থেকে আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগও করা হয়নি। তবে তার দুই মেয়ে এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। আমরা তাদের বলেছি, টাকা না দিলেও নিয়ম অনুযায়ী ২ বছর পর্যন্ত আমরা কবরটি সংরক্ষণ করে রাখব। এরপর সেটি গুঁড়িয়ে দিয়ে অন্য কাউকে কবর দেয়ার জন্য উন্মুক্ত করে দেব।
এ বিষয়ে জানতে আঞ্জু কাপুরের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শামীম হোসেন জানান, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তাধীন বিষয়ে এখনই বিস্তারিত কিছু বলা যাবে না। এ নিয়ে এখনও আঞ্জু কাপুরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। প্রয়োজনে আঞ্জু কাপুরসহ সংশ্লিষ্ট আরও অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
সুত্র : যুগান্তর
এন এ/ ০২ জানুয়ারি









