সম্পাদকের পাতা

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত আবদুল এল-সায়েদের অসাধারণ যাত্রা

নজরুল মিন্টো

প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত আবদুল এল-সায়েদ

ডেট্রয়েটে তখন গভীর রাত পেরিয়ে ভোর। মিশিগানের বিভিন্ন এলাকা থেকে একের পর এক ভোটের ফল আসছে। পর্দায় সংখ্যাগুলো বদলাচ্ছে, সমর্থকদের অপেক্ষাও বাড়ছে। অবশেষে বুধবার, ৪ নভেম্বর ভোর ২টা ২৭ মিনিটে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়ে দিল, মিশিগানের মার্কিন সিনেট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ। রিপাবলিকান মাইক রজার্সকে হারিয়ে ৪২ বছর বয়সী এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ শুধু একটি সিনেট আসনই জেতেননি, গড়েছেন মার্কিন ইতিহাস। তিনিই যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম, যিনি মার্কিন সিনেটে নির্বাচিত হলেন। প্রাথমিক অনানুষ্ঠানিক ফলে তাঁর ভোট ছিল প্রায় ৫২ শতাংশ, রজার্সের প্রায় ৪৬ শতাংশ।

১৯৭৮ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন তাঁর বাবা মোহাম্মদ এল-সায়েদ। সাধারণ একটি পরিবার থেকে উঠে আসা এই তরুণ ভর্তি হন মিশিগানের ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। পরে পেশা বেছে নেন প্রকৌশল। তখন তিনি হয়তো কল্পনাও করেননি, যে দেশে তিনি এসেছেন একজন বিদেশি শিক্ষার্থী হিসেবে, একদিন সেই দেশের ফেডারেল আইনসভার উচ্চকক্ষ মার্কিন সিনেটের সদস্য নির্বাচিত হবেন তাঁরই সন্তান।

১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর মিশিগানের রচেস্টার হিলসে জন্ম আবদুল রহমান মোহাম্মদ এল-সায়েদের। বেড়ে ওঠেন ডেট্রয়েটের আশপাশে। বাবা মোহাম্মদ মিসরীয় অভিবাসী, আর সৎমা জ্যাকি মিশিগানেরই মানুষ। স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি ফুটবল, কুস্তি ও ল্যাক্রোস খেলতেন আবদুল। একাধিক দলের অধিনায়কও ছিলেন। অর্থাৎ শৈশব থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি নেতৃত্ব ও প্রতিযোগিতার জগতের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তাঁর।

কিশোর বয়সের একটি ঘটনা তাঁর চিন্তাভাবনায় বড় প্রভাব ফেলেছিল। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর আরব ও মুসলিম পরিচয়ের কারণে বিরূপ আচরণের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। এক খেলায় প্রতিপক্ষের কটূক্তিতে ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছিলেন আবদুল। পরে তাঁর কোচ তাঁকে বোঝান, নিজের নাম ও পরিচয় নিয়েই তাঁকে সামনে এগোতে হবে। পরিচয়কে বাধা হিসেবে দেখবেন, নাকি সামনে এগোনোর শক্তি হিসেবে ব্যবহার করবেন, সেই সিদ্ধান্ত তাঁর। কথাটি মনে রেখেছিলেন আবদুল এল-সায়েদ।

স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি হন ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানে। একই সঙ্গে জীববিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়েন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাক্রোস দলেও খেলেছেন। ২০০৭ সালে সর্বোচ্চ কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক হন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ একাডেমিক সম্মাননা সংগঠন ফাই বেটা কাপ্পার সদস্য নির্বাচিত হন। সেবারের সমাবর্তনে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বক্তৃতা দেওয়ার দায়িত্বও পেয়েছিলেন তিনি। অনুষ্ঠানের প্রধান বক্তা ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন।

তরুণ আবদুলের বক্তৃতা এতটাই নজর কেড়েছিল যে অনুষ্ঠান শেষে ক্লিনটন তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। পরবর্তী সময়ে এল-সায়েদ স্মরণ করেছেন, ক্লিনটন তাঁকে রাজনীতিতে আসার কথাও বলেছিলেন। তখন তাঁর সামনে ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানের পথ। রাজনীতির কথা শুনে তিনি প্রায় হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। আবদুলের নিজের কাছেই তখন মনে হয়েছিল, তাঁর মতো নাম ও পরিচয়ের একজন তরুণের জন্য মার্কিন রাজনীতি অনেক দূরের জগৎ। প্রায় দুই দশক পর সেই তরুণই মার্কিন সিনেটে নির্বাচিত হলেন।

স্নাতকের পর চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ২০০৮ সালের শেষ দিকে তিনি রোডস স্কলারশিপের জন্য নির্বাচিত হন। এরপর যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে ডক্টরেট করেন। পরে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১২ সালে অভিবাসী ও অভিবাসী পরিবারের মেধাবী নতুন প্রজন্মের উচ্চশিক্ষাকে সহায়তাকারী পল অ্যান্ড ডেইজি সোরোস ফেলোশিপও পান তিনি।

চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়তে গিয়ে তাঁর আগ্রহ ধীরে ধীরে একজন রোগীর চিকিৎসা থেকে আরও বড় প্রশ্নের দিকে চলে যায়। কেন একই শহরে বসবাস করেও এক এলাকার মানুষের গড় আয়ু অন্য এলাকার মানুষের তুলনায় কম, দারিদ্র্য কেন রোগের ঝুঁকি বাড়ায়, পরিবেশ ও সামাজিক বৈষম্য কীভাবে মানুষের স্বাস্থ্য নির্ধারণ করে, এসব বিষয় তাঁকে আকৃষ্ট করে। জনস্বাস্থ্য ও রোগতত্ত্বই একসময় হয়ে ওঠে তাঁর গবেষণা ও কাজের প্রধান ক্ষেত্র।

কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির মেইলম্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন তিনি। দারিদ্র্য, সামাজিক প্রান্তিকতা, শিশুমৃত্যু, স্থূলতাসহ বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর শতাধিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি এল-সায়েদ। নিজের জন্মভূমি মিশিগানে ফিরে মানুষের জন্য সরাসরি কাজ করার সুযোগ খুঁজছিলেন তিনি।

সুযোগটি আসে ২০১৫ সালে। মাত্র ৩০ বছর বয়সে ডেট্রয়েটের স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব নেন আবদুল এল-সায়েদ। সে সময় বড় কোনো মার্কিন শহরের সর্বকনিষ্ঠ স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন তিনি। ডেট্রয়েট তখন অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও দেউলিয়াত্বের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। শহরের স্বাস্থ্য বিভাগকেও নতুন করে দাঁড় করানোর কাজ চলছিল।

এল-সায়েদের নেতৃত্বে শিশুদের বিনামূল্যে চোখ পরীক্ষা ও চশমা দেওয়ার কর্মসূচি চালু হয়। স্কুল, ডে-কেয়ার ও শিশুদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পানিতে সিসার উপস্থিতি পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিবেশদূষণ ও জনস্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়েও কাজ করে তাঁর বিভাগ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্লাসে যে তরুণ মানুষের অসুস্থতার কারণ খুঁজছিলেন, ডেট্রয়েটে এসে সেই ভাবনাকেই তিনি সরকারি কাজে প্রয়োগের সুযোগ পেলেন।

২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর পদে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন চেয়ে নির্বাচনে নামেন তিনি। মনোনয়ন পাননি। জয়ী হন গ্রেচেন হুইটমার। কিন্তু সেই পরাজয় তাঁর রাজনৈতিক পথ বন্ধ করে দেয়নি। বরং মিশিগানের বাইরেও পরিচিত হয়ে ওঠেন এল-সায়েদ। জনস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নীতি নিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। চালু করেন ‘আমেরিকা ডিসেক্টেড’ পডকাস্ট। লেখেন Healing Politics এবং সহলেখক হিসেবে Medicare for All: A Citizen’s Guide। ২০২০ সালে জো বাইডেন ও বার্নি স্যান্ডার্সের মধ্যে নীতিগত সমন্বয়ের জন্য গঠিত স্বাস্থ্যবিষয়ক ইউনিটি টাস্ক ফোর্সেও কাজ করেন।

২০২৩ সালে আবার মিশিগানের সরকারি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ফিরে আসেন তিনি। এবার দায়িত্ব নেন ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য, মানবসেবা ও ভেটেরানস সার্ভিসেস বিভাগের। মিশিগানের সবচেয়ে জনবহুল ও বৈচিত্র্যময় এই কাউন্টির প্রায় ১৮ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবার সঙ্গে যুক্ত হয় তাঁর দায়িত্ব। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়, শিশুদের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা, মাদকজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি কমানোসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে যুক্ত ছিলেন তিনি।

মিশিগানের ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্স পুনর্নির্বাচনে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে ২০২৫ সালের এপ্রিলে মার্কিন সিনেটের লড়াইয়ে নামেন এল-সায়েদ। শুরুতে তিনি মিশিগানের শহর থেকে শহরে ঘুরে মানুষের কাছে যাওয়ার পথ বেছে নেন। নির্বাচনী প্রচারে প্রায় ১১০টি শহরে যান, পাঁচ শতাধিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং প্রায় ১২ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে তাঁর পক্ষে।

২০২৬ সালের ৪ আগস্ট ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্সকে ১৪ হাজার ৮৯৩ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে দলের মনোনয়ন পান তিনি। আট বছর আগে যে ব্যক্তি মিশিগানের গভর্নর হওয়ার প্রথম রাজনৈতিক লড়াইয়ে হেরে গিয়েছিলেন, তিনিই এবার দলের সিনেট প্রার্থী।

এরপর ৩ নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচন। প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক কংগ্রেস সদস্য ও এফবিআই কর্মকর্তা রিপাবলিকান মাইক রজার্স। মিশিগানের এই আসনের দিকে নজর ছিল পুরো যুক্তরাষ্ট্রের। গভীর রাত পর্যন্ত চলে ভোট গণনা। শেষ পর্যন্ত আবদুল এল-সায়েদের জয় নিশ্চিত হয়। ডেমোক্র্যাটদের হাতে আসনটি ধরে রাখার পাশাপাশি তাঁর বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করেছে।

একজন অভিবাসীর সন্তান হিসেবে তাঁর এই যাত্রা দেখিয়েছে, জন্মপরিচয় কিংবা পারিবারিক শিকড় মানুষের গন্তব্য নির্ধারণ করে দেয় না। শিক্ষা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায় মানুষকে নিয়ে যেতে পারে অনেক দূর। আবদুল এল-সায়েদের এই পথচলা তাই নতুন প্রজন্মের অভিবাসী সন্তানদের সামনে নতুন সম্ভাবনার কথাও বলে।

আজ আবদুল এল-সায়েদের বয়স ৪২ বছর। স্ত্রী সারাহ একজন মনোরোগ চিকিৎসক। তাঁদের দুই মেয়ে এমালি ও সেরেনকে নিয়ে মিশিগানেই তাঁর সংসার। প্রায় পাঁচ দশক আগে তাঁর বাবার আমেরিকায় পাড়ি দেওয়ার মধ্য দিয়ে যে অভিবাসী পরিবারের যাত্রা শুরু হয়েছিল, আবদুল এল-সায়েদের ঐতিহাসিক বিজয়ে সেই যাত্রা আজ যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অংশ হয়ে গেল।

তথ্যসূত্র: Associated Press, Bridge Michigan

Back to top button
🌐 Read in Your Language