সম্পাদকের পাতা

যুক্তরাজ্যে অভিবাসীদের ভবিষ্যৎ বদলে দিচ্ছে যে ঘোষণা

নজরুল মিন্টো

বহুল প্রতীক্ষিত ঘোষণাটি অবশেষে এসেছে। যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের নিয়ম নিয়ে দীর্ঘ উদ্বেগ ও বিতর্কের পর সোমবার ২ নভেম্বর হাউস অব কমন্সে সরকারের সংশোধিত পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী বিদেশি কেয়ার কর্মীদের জন্য পাঁচ বছরে স্থায়ী বসবাসের আবেদনের সুযোগ বহাল থাকছে। কিন্তু এই স্বস্তির পাশাপাশি এসেছে কঠোর বার্তাও। অধিকাংশ অভিবাসীর জন্য সাধারণ অপেক্ষা হবে ১০ বছর, আর কিছু শরণার্থীর ক্ষেত্রে তা পৌঁছাতে পারে ৩০ বছরে। ফলে একই ঘোষণা কারও স্বস্তি আনছে, কারও ভবিষ্যৎ গড়ার হিসাব বদলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়া থেকে পড়াশোনা, চাকরি কিংবা পরিবারের সঙ্গে বসবাসের উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যে যাওয়া মানুষের জন্য ঘোষণাটির তাৎপর্য তাই এক রকম নয়। ‘আর্নড সেটেলমেন্ট’ নামের এই ব্যবস্থায় কে কত বছর ব্রিটেনে আছেন, তার পাশাপাশি দেখা হবে তাঁর আয়, কাজ ও অভিবাসনের নিয়ম মেনে চলার ইতিহাস। একই বছরে ব্রিটেনে এসেও একজন পাঁচ বছরে স্থায়ী হওয়ার আবেদন করতে পারবেন, আরেকজনকে অপেক্ষা করতে হবে দ্বিগুণ সময়।

সবচেয়ে বড় স্বস্তি কেয়ার কর্মীদের একটি অংশের। তাঁদের ১৫ বছর অপেক্ষা করানোর পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে সরকার। ২০২৫ সালের মে মাসে অভিবাসন শ্বেতপত্র প্রকাশের আগে যাঁরা কেয়ার ভিসায় এসেছেন বা অন্য ভিসা থেকে কেয়ার ভিসায় বদল করেছেন, তাঁরা শর্ত পূরণ করলে পাঁচ বছরেই স্থায়ী বসবাসের আবেদন করতে পারবেন। এ জন্য ভিসার শর্ত মেনে কাজ করা এবং বছরে অন্তত ২৫ হাজার পাউন্ড আয়ের শর্ত রয়েছে। শুধু শ্বেতপত্র প্রকাশের আগে ব্রিটেনে এলেই হবে না। তখন শিক্ষার্থী হিসেবে এসে শ্বেতপত্র প্রকাশের পরে কেয়ার ভিসায় বদল করলে এই বিশেষ ছাড় মিলবে না।

যাঁরা পাঁচ বছর শেষে শর্ত পূরণ করতে পারবেন না, তাঁদের জন্য আরও পাঁচ বছরের কেয়ার ভিসার আবেদন করার সুযোগ রাখা হচ্ছে। প্রতারক নিয়োগদাতার কারণে কাজ হারানো কর্মীদের অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেতেও সহায়তা করবে সরকার। তাঁদের ব্রিটেনে থেকে আবার চেষ্টা করার সুযোগ থাকছে, কিন্তু পাঁচ বছরে স্থায়ী হওয়ার আশা পূরণ হচ্ছে না।

তবে অন্যান্য কর্মভিসাধারীদের অনেকের জন্য অপেক্ষা বাড়ছে। বিশেষ ছাড়ের বাইরে থাকা অনেক কর্মীকে সাধারণ ১০ বছরের পথেই যেতে হবে। অন্যদিকে উচ্চ আয়কারী এবং চিকিৎসক, নার্স ও শিক্ষকের মতো যোগ্য জনসেবামূলক পেশার কর্মীদের জন্য পাঁচ বছরের সুযোগ থাকছে। হোম অফিসের ঘোষণায় উচ্চ আয়ের পাঁচ বছরের পথের সীমা হিসেবে বছরে অন্তত ৫০ হাজার ২৭১ পাউন্ড আয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বৈধভাবে চাকরি করে কর দেওয়ার পরও অনেক বাংলাদেশি কর্মী পাঁচ বছরে স্থায়ী হওয়ার আবেদন করতে পারবেন না। তাঁদের আরও কয়েক বছর ভিসা নবায়নের খরচ ও চাকরি ধরে রাখার চাপ বহন করতে হতে পারে।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ধাক্কাটি রয়েছে দীর্ঘ বসবাসের ভিত্তিতে স্থায়ী হওয়ার পরিকল্পনায়। সরকারি নীতিপত্রে পৃথক ১০ বছরের ‘লং রেসিডেন্স’ পথ বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় স্টুডেন্ট ও গ্র্যাজুয়েট ভিসায় কাটানো সময় স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতার মেয়াদে গণনা করা হবে না। ফলে বিভিন্ন বৈধ ভিসায় থেকে মোট ১০ বছর পূর্ণ করার প্রত্যাশায় থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য প্রথম পার্থক্যটি হলো, আশ্রয়ের আবেদন করা আর শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এক বিষয় নয়। ঘোষিত দীর্ঘ অপেক্ষা মূলত সুরক্ষা পাওয়ার পর স্থায়ী বসবাসের পথের সঙ্গে সম্পর্কিত। সরকার অনুমোদিত নিরাপদ ও বৈধ পুনর্বাসনপথে আসা শরণার্থীদের পাঁচ বছরের সুযোগ থাকবে। অন্য পথে আসা শরণার্থীদের সাধারণ অপেক্ষা হবে ২০ বছর। নৌকা বা গোপন প্রবেশপথ ব্যবহার করলে আরও ১০ বছর যুক্ত হয়ে তা ৩০ বছরে পৌঁছাবে। কাজ বা পড়াশোনায় যুক্ত হলে সংশ্লিষ্ট মেয়াদ ১০ বছর কমানোর সুযোগ থাকবে।

অর্থাৎ বৈধ ভিসায় এসে পরে আশ্রয় চেয়ে স্বীকৃতি পাওয়া ব্যক্তি এবং নৌকায় প্রবেশ করে স্বীকৃতি পাওয়া ব্যক্তির অপেক্ষা এক হবে না। বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রেও এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে স্থায়ী বসবাসের অপেক্ষা দীর্ঘ হওয়া মানেই শরণার্থী সুরক্ষা সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। সুরক্ষার প্রয়োজন থাকা প্রকৃত শরণার্থীদের সুরক্ষা দেওয়া অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

পারিবারিক ভিসায় থাকা বাংলাদেশিদের একটি অংশের জন্য স্বস্তির খবর রয়েছে। ব্রিটিশ নাগরিকের যোগ্য পরিবারের সদস্যদের বিদ্যমান স্থায়ী বসবাসের সুযোগ বহাল থাকছে। তবে কর্মভিসাধারীর সঙ্গে নির্ভরশীল স্বামী বা স্ত্রী হিসেবে আসা ব্যক্তির হিসাব আলাদা। মূল আবেদনকারীর সঙ্গে এলে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে একসঙ্গে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ থাকবে। পরে এলে নিজেকে নির্ধারিত বসবাসের মেয়াদ পূর্ণ করতে হবে। যোগ্য দম্পতির ন্যূনতম অর্থনৈতিক শর্ত পূরণে যৌথ আয় বিবেচনার সুযোগও রাখা হয়েছে।

এসব পরিবর্তন এখনো বিস্তারিত বিধি ও প্রয়োগপদ্ধতিতে রূপ দেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। সরকার জানিয়েছে, বাস্তবায়নের আগে আরও নির্দেশনা এবং পূর্ণাঙ্গ প্রভাব মূল্যায়ন প্রকাশ করা হবে। ফলে ঘোষণার দিন থেকেই সবার বর্তমান ভিসা বা আবেদনের নিয়ম বদলে গেছে, এমন ধারণা করা ঠিক হবে না।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), স্কাই নিউজ ও দ্য গার্ডিয়ান।

Back to top button
🌐 Read in Your Language