মধ্যপ্রাচ্য

দুই দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খোলার বার্তা: শর্ত মানলে মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বরফ গলার আভাস

তেহরান, ০৩ নভেম্বর – ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রায় আট মাস ধরে চলা তীব্র সামরিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের জেরে অবরুদ্ধ হয়ে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিটি বন্ধ থাকার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা ও মারাত্মক প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও যুদ্ধবিরতির অন্যতম মূল অনুঘটক হয়ে উঠেছে এই রুটটি পুনঃউন্মুক্ত করার শর্তাবলী।

ইরানি প্রস্তাব: ৭ দিনের বদলে মাত্র ২ দিনের সময়সীমা

পূর্বে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য ইরান এক সপ্তাহের বা ছয় দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার কথা বললেও, এবার তারা তাদের অবস্থানে কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিত দিয়েছে।

গতকাল সোমবার (২ নভেম্বর) ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান যদি দেখে যুক্তরাষ্ট্র তাদের মূল দাবিগুলো মানতে সম্মত হয়েছে, তবে মাত্র দুই দিনের মধ্যেই প্রণালিটি উন্মুক্ত করতে তারা প্রস্তুত রয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেন: “আমাদের সদিচ্ছার প্রমাণ হিসেবে দুই দিনের মধ্যে হরমুজ খোলার প্রস্তাব দিচ্ছি। আমাদের দাবি মানা হলে খুব দ্রুত হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা হবে এবং আলোচনা পুনরায় শুরু হবে।”

তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে মধ্যস্থতাকারী বিভিন্ন দেশের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সাথে তেহরানের যোগাযোগ ও নিবিড় তথ্য আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে। তবে পুরো প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক সাড়ার ওপর।

যে প্রধান দাবিগুলো কেন্দ্র করে সংকট

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে চলেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। অন্য নিরপেক্ষ নৌযান চলাচলে নানা কড়াকড়ি আরোপের পাশাপাশি মার্কিন ও ইসরায়েলি জাহাজ পারাপারের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা ও হামলা চালানো হচ্ছে। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোতে কড়া নৌ অবরোধ বহাল রেখেছে।

কাতারের মাধ্যমে পাঠানো কূটনৈতিক বার্তা ও আল জাজিরায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যে শর্তগুলোর কথা তুলে ধরেছেন:

নতুন নৌ-রুট স্বীকৃতি: ওমান ও ইরানের যৌথ উদ্যোগে নির্ধারিত নৌপথকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেওয়া।

নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ প্রত্যাহার: সাম্প্রতিক সময়ে (বিশেষ করে আগস্ট থেকে) অর্থনৈতিকভাবে চাপ সৃষ্টি করতে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট যে কড়া নিষেধাজ্ঞাগুলো আরোপ করেছিলেন, তা তুলে নেওয়া এবং কড়া নৌ অবরোধ প্রত্যাহার।

আঞ্চলিক ভারসাম্য: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ বন্ধ করা, বিদেশে থাকা ইরানের জব্দকৃত রাষ্ট্রীয় সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া এবং অঞ্চলে মার্কিন সেনার উপস্থিতি কমানো।

সামরিক উত্তাপ ও নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ

এই কূটনৈতিক দড়াটানির পটভূমিতে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। ইসরায়েলের সদ্য সমাপ্ত সাধারণ নির্বাচন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।

মার্কিন অবস্থান: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন যে ওয়াশিংটন ইতিমধ্যেই ইরানের সামরিক সক্ষমতার বড় একটি অংশ নিষ্ক্রিয় করতে পেরেছে। একই সাথে তিনি পিকঅ্যাক্স পর্বতের সন্দেহভাজন পারমাণবিক স্থানে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন।

তেহরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি নতুন করে কোনো সামরিক আগ্রাসন চালায়, তবে ইরান তাৎক্ষণিক ও আরও শক্তিশালী জবাব দেবে।

দুই পক্ষের চরম উত্তেজনার মাঝে দুই দিনের এই ‘হরমুজ খোলার শর্তযুক্ত প্রস্তাব’ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতে কতটা স্বস্তি আনতে পারে, তা এখন সম্পূর্ণ নির্ভর করছে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর কূটনীতি ও ওয়াশিংটনের চূড়ান্ত পদক্ষেপের ওপর।

এনএন/ ০৩ নভেম্বর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language