দক্ষিণ এশিয়া

ভারতে এসআইআর বাতিল ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি বিরোধী জোটের

বিরোধী জোট

দিল্লি,০১ নভেম্বর-ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোট চুরি করে বিজেপি নির্বাচনে জয়ী হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে এসআইআর বাতিল এবং ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। এ দাবিতে জোটের শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা একজোট হয়েছেন।

রবিবার দিল্লির রামলীলা ময়দানে ইন্ডিয়া জোটের আয়োজনে ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ শীর্ষক জনসভা থেকে এ দাবি জানান বিরোধী নেতারা। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস সংসদ সদস্য সোনিয়া গান্ধী, তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি ও দলটির সংসদ সদস্য অভিষেক ব্যানার্জি, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব, ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতা ফারুক আবদুল্লাহ, পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডিপি) সভাপতি মেহবুবা মুফতি, সিপিআইএমের সর্বভারতীয় সম্পাদক এম এ বেবি, আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব, শিবসেনার (উদ্ধব ঠাকরে গোষ্ঠী) সংসদ সদস্য সঞ্জয় রাউত এবং এনসিপির সংসদ সদস্য সুপ্রিয়া সুলের উপস্থিতিতে বিরোধী দলগুলোর ঐক্যের চিত্র দেখা যায়।

সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এ কর্মসূচি চলে। সকাল থেকেই বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা দলীয় পতাকা এবং ভারতের জাতীয় পতাকা হাতে সমাবেশস্থলে জড়ো হন। পরে একে একে বক্তব্য দেন বিরোধী দলগুলোর শীর্ষ নেতারা। সমাবেশে বাইরে থেকে সমর্থন জানালেও ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) কোনো নেতা মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন না।

সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে ভোটার তালিকা থেকে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগকে ‘দেশবিরোধী’ ও ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ বলে উল্লেখ করেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। ঘটনাটিকে ‘অত্যন্ত বিরল’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে এই দেশে ভোট চুরির ঘটনা ঘটে আসছে। মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন—এই সবকটি নির্বাচনেই ভোট চুরি করা হয়েছে। ইভিএমের মাধ্যমে এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া বা নতুন নাম যুক্ত করার মতো প্রক্রিয়ায় ভোট চুরি করা হয়েছে।’

সমাবেশে উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে রাহুল আরও বলেন, ‘আমি ভারতের প্রতিটি নাগরিক ও তরুণকে বলছি—জ্ঞানেশ কুমারকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। জ্ঞানেশ কুমার কারাগারে যাবেন। জ্ঞানেশ কুমার না থাকলে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না, আর অমিত শাহও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হতে পারতেন না। কৃষকেরা তাঁদের অধিকার পাচ্ছেন না। তরুণেরা কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না। শ্রমিকেরা তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দেশের সমস্ত সম্পদ দুই-তিনজন ব্যক্তির হাতে চলে গেছে। তাই আমরা এমন ভারত চাই না এবং এমন ভারতকে মেনেও নেব না। দেশকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার প্রথম পদক্ষেপ হলো জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণ করা।’

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে সতর্ক করে রাহুল বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদি কোথাও যেতে পারবেন না। আর যদি যেতেও চান, আমরা তাঁকে যেতে দেব না। নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ, আপনারা শুনে রাখুন, জ্ঞানেশ কুমারের পর এবার আমরা আপনাদের কাছে আসছি। আপনারা ভুলে যাবেন না, যেভাবে ভোট চুরি করেছেন, তাতে আপনারা কোথাও যেতে পারবেন না। নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে। দেশ সঠিক বিচার পাবে। আপনারা পালিয়ে যাওয়ার কথা একদম ভাববেন না, কোথাও পালিয়েও যেতে পারবেন না।’

সমাবেশের মঞ্চ থেকে ‘মোদি হটাও, দেশ বাঁচাও, গণতন্ত্র বাঁচাও’ স্লোগান দেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। তিনি বলেন, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তাঁদের লড়াই চলবে। নরেন্দ্র মোদিও ক্ষমতা ছেড়ে চলে যাবেন। বিহার, উত্তরপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রে ‘ভোট চুরি করা সরকার’ রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান খাড়গে। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রী মোদি ক্ষমতা ছাড়লেই কেবল দেশের গণতন্ত্র রক্ষা করা সম্ভব।

ভোট চুরির অভিযোগ তুলে সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে ভোট চুরি হয়েছে। ২০২২ সালে উত্তরপ্রদেশেও তারা ভোট চুরি করেছে। ফলে আমরা সেই নির্বাচনে জিততে পারিনি। কিন্তু আগামী বছর রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি আর ক্ষমতায় আসতে পারবে না।’

পশ্চিমবঙ্গে ভোট লুটের অভিযোগ তুলে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেন, এসআইআর প্রক্রিয়ার কারণে পশ্চিমবঙ্গ পরিস্থিতির শিকার হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ‘ওরা (বিজেপি) বাংলা লুট করেছে, আর আমরা দিল্লিতে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করব।’ এসআইআরের বিরুদ্ধে তৃণমূল কংগ্রেসের লড়াই অব্যাহত থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, রাজনীতি ও গণতন্ত্রের মাধ্যমেই এ লড়াই চালিয়ে যাবে তাঁর দল।

অন্যদিকে, দিল্লিতে বিরোধীদের সমাবেশের পাল্টা হিসেবে বিভিন্ন রাজ্যে ‘গণতন্ত্র বাঁচান, নৈরাজ্য দূর করুন’ শীর্ষক কর্মসূচি পালন করে বিজেপি। হিমাচল প্রদেশের সিমলায় আয়োজিত এক সমাবেশে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, অনুপ্রবেশের বিষয়টি অনেক রাজ্যের জন্যই গুরুতর উদ্বেগের কারণ। সুপ্রিম কোর্ট থেকে শুরু করে সংসদ—বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানই বিষয়টি স্বীকার করেছে। কিন্তু বিরোধী দলগুলো অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করা এবং ভোটার তালিকা থেকে তাঁদের নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করছে। কার্যত তারা অনুপ্রবেশকারীদের আড়াল করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

দিল্লির সমাবেশকে কটাক্ষ করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী উত্তর ২৪ পরগনা জেলার ঠাকুরনগরে মতুয়া সম্প্রদায়ের এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘দেশকে ও রাজ্যকে আবার অস্থির করার চেষ্টা হচ্ছে। এর সঙ্গে দিমাগী ন্যাশনাল, মাওবাদী, আরশোলা, ছারপোকা—সব একসঙ্গে মিলেছে। তাই যারা বাংলাদেশের মতো আমাদের দেশ ও রাজ্যকে নতুন করে অস্থির করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকব, ঐক্যবদ্ধ থাকব। আর উদ্বাস্তু হব না।’

বিজেপি বিরোধীদের এ কর্মসূচিকে ‘মেলোড্রামা’ বা অতিরিক্ত নাটকীয়তা বলে কটাক্ষ করেছে। এক ভিডিও বার্তায় কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা বলেন, বিরোধীদের এ পদযাত্রা গণতন্ত্রের প্রতি অসম্মান। এটি একটি বোকামি ও পরিকল্পিত নাটক। তিনি এটিকে নৈরাজ্য সৃষ্টির ষড়যন্ত্র বলেও মন্তব্য করেন।

এস এম/ ০১ নভেম্বর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language