
শিশুদের স্কুলে আনা-নেওয়ার দায়িত্বে থাকা একজন বাসচালক কতটা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ভোগ করতে পারেন? কর্মক্ষেত্রে তাঁর পোশাক ও আচরণের সীমারেখাই বা কোথায়? কানাডার অন্টারিও প্রদেশে এক ট্রান্সজেন্ডার স্কুলবাস চালকের পোশাক এবং বাসের সামনে প্রদর্শিত একটি নাম নিয়ে ওঠা বিতর্ক নতুন করে এই প্রশ্নগুলো সামনে এনেছে।
ঘটনাটি ২০২৫ সালের জুনের। অন্টারিওর ইয়র্ক অঞ্চলের উডব্রিজে সেন্ট মাইকেল দ্য আর্কেঞ্জেল ক্যাথলিক এলিমেন্টারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের পরিবহনের দায়িত্বে ছিলেন ওই চালক। সে সময় তাঁর পোশাক ও আচরণ নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, চালক গোলাপি রঙের ছোট স্কার্ট, সাদা ঝালরযুক্ত ব্লাউজ, লম্বা মোজা এবং মাথায় ফিতা পরে স্কুলবাসের দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। পোশাকটি দেখতে অনেকটা জাপানি স্কুলছাত্রীদের বিশেষ ধরনের সাজপোশাকের মতো।
তবে অভিভাবকদের আপত্তি শুধু পোশাকেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বাসের সামনের কাচে একটি কাগজে লেখা ছিল ‘Lolita’s Line’। কয়েকজন অভিভাবক চালকের কাছে জানতে চান, শিশুদের পরিবহনের বাসে এমন নাম ব্যবহারের কারণ কী। ভিডিওতে চালককে নিজের পোশাকের পক্ষে কথা বলতে শোনা যায়। তিনি জানান, এ ধরনের পোশাক তিনি নিয়মিতই পরেন এবং এতে কোনো সমস্যা দেখেন না।
‘লোলিটা’ নামটি নিয়ে বিতর্কের বিশেষ কারণ রয়েছে। রুশ বংশোদ্ভূত মার্কিন সাহিত্যিক ভ্লাদিমির নাবোকভের ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত বিখ্যাত উপন্যাস Lolita-তে এক মধ্যবয়সী পুরুষের হাতে ১২ বছরের একটি মেয়ের যৌন নির্যাতনের কাহিনি রয়েছে। পরবর্তী সময়ে নামটি সাহিত্যের বাইরেও নানা বিতর্কিত প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে। শিশুদের স্কুলবাসে এমন নাম প্রদর্শন কেন প্রয়োজন, অভিভাবকদের সেই প্রশ্ন উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর ইয়র্ক ক্যাথলিক ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ড দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। কর্তৃপক্ষ জানায়, স্কুলবাস সেবা পরিচালনা করে বাইরের একটি পরিবহন প্রতিষ্ঠান। তাই বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তার নজরে আনা হয়। এরপর পরিবহন প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করে, ওই চালক আর সংশ্লিষ্ট স্কুলের শিক্ষার্থীদের আনা-নেওয়ার দায়িত্ব পালন করবেন না। স্কুল বোর্ড শিক্ষার্থী ও কর্মীদের নিরাপত্তা এবং কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও জানায়।
এদিকে ঘটনাটি নতুন মোড় নেয় চলতি বছরের ১৬ মার্চ। পরিচয় গোপন রাখার কারণে আদালতের নথিতে শুধু ‘এল জেড’ আদ্যক্ষরে চিহ্নিত ওই চালক অন্টারিওর মানবাধিকার ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, লিঙ্গপরিচয়, নারী হিসেবে পরিচিতি এবং জাতিগত উৎসের কারণে কর্মক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে বৈষম্য করা হয়েছে। অভিযোগে ইয়র্ক ক্যাথলিক ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ড এবং পরিবহন প্রতিষ্ঠান ল্যান্ডমার্ক বাস লাইনসকে প্রতিপক্ষ করা হয়েছে।
চালক নিজের পরিচয় প্রকাশ না করার আবেদনও জানান। তাঁর বক্তব্য, ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি হুমকি ও বিদ্বেষমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন। ট্রাইব্যুনাল গত ১৩ অক্টোবর তাঁর পরিচয় গোপন রাখার আবেদন মঞ্জুর করে। ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত সেই সিদ্ধান্তের সূত্র ধরে ঘটনাটি আবার আলোচনায় আসে।
কানাডার অন্টারিওতে ২০১২ সাল থেকে লিঙ্গপরিচয় ও লিঙ্গপ্রকাশের ভিত্তিতে বৈষম্য মানবাধিকার আইনে নিষিদ্ধ। ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিরাও অন্য সবার মতো কর্মক্ষেত্রে সম্মান, সমান সুযোগ এবং বৈষম্য থেকে সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী। কিন্তু এই অধিকার এবং কর্মক্ষেত্রের উপযোগী পোশাক ও আচরণবিধি নিয়ে প্রশ্ন দুটি এক নয়। কোনো ব্যক্তির লিঙ্গপরিচয়ের কারণে তাঁকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া যেমন আইনগত প্রশ্ন তৈরি করতে পারে, তেমনি শিশুদের পরিবহনের দায়িত্বে থাকা একজন কর্মীর পোশাক, আচরণ ও ব্যবহৃত বার্তা নিয়েও নিয়োগকর্তার যুক্তিসংগত মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন।
বিশেষ করে স্কুলবাস সাধারণ কোনো যাত্রীবাহী গাড়ি নয়। এখানে যাত্রীদের বড় অংশই শিশু। অভিভাবকেরা সন্তানদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের দায়িত্ব নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চালক এবং পরিবহন প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেন। ফলে বাসচালকের দায়িত্ব শুধু নিরাপদে গাড়ি চালানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁর আচরণ, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ, পেশাগত শৃঙ্খলা এবং বাসের পরিবেশও সেই দায়িত্বের অংশ।
ব্যক্তিগত জীবনে একজন মানুষ কী ধরনের পোশাক পরবেন, তা তাঁর নিজস্ব পছন্দের বিষয়। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে, বিশেষ করে শিশুদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সময়, সেই পছন্দের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও পেশাগত মানদণ্ডের সমন্বয় প্রয়োজন। একজন পুরুষ, নারী কিংবা ট্রান্সজেন্ডার, সবার জন্যই এই নীতি সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পাশাপাশি শিশুদের উপযোগী পরিবেশ, অভিভাবকদের আস্থা এবং পেশাগত দায়িত্বের গুরুত্বও সমানভাবে বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র: NOW Toronto, IBTimes UK







