অচেতন করে ধর্ষণ ও জন্মনিয়ন্ত্রণের ওষুধ খাওয়ানোর চাঞ্চল্যকর অভিযোগ: পাবনায় মাদরাসা পরিচালক গ্রেপ্তার

পাবনা, ২৩ অক্টোবর – পাবনা সদর উপজেলার ভাঁড়ারা ইউনিয়নে এক মাদরাসাছাত্রীকে জোরপূর্বক ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে আবু ইউসুফ প্রামাণিক (৫০) নামের এক মাদরাসাশিক্ষক ও পরিচালককে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে স্থানীয় জনতা। তবে কেবল ধর্ষণচেষ্টাই নয়, ওই ছাত্রীর বিস্ফোরক অভিযোগ—এর আগেও তাকে চেতনানাশক প্রয়োগ করে একাধিকবার অচেতন করে ধর্ষণ করা হয়েছে এবং পরে গর্ভধারণ রোধে জন্মনিয়ন্ত্রণের ওষুধ সেবন করানো হতো।
এই নৃশংস ও বর্বরোচিত ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্ত শিক্ষকের থাকার বাড়ি এবং সংশ্লিষ্ট নূরানী মহিলা মাদরাসায় ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করেন।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দিবাগত রাতে পাবনা সদর উপজেলার দড়িভাউডাঙ্গা এলাকায় পদ্মা হাসপাতালের পাশে অবস্থিত ওই মাদরাসায় এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট ও যেভাবে হাতেনাতে ধরা পড়ল
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত আবু ইউসুফ প্রামাণিক সদর উপজেলার সাদুল্লাপুর ইউনিয়নের খালিশপুর গ্রামের মৃত ইয়াকুব আলীর ছেলে। তিনি ওই নূরানী মহিলা মাদরাসার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে প্রায় দেড় শতাধিক ছাত্রী পড়াশোনা করে।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে তথা শুক্রবার ভোরের দিকে (ফজরের আজানের পূর্বে) এক ছাত্রী শৌচাগারে যাওয়ার উদ্দেশ্যে কক্ষ থেকে বের হলে পরিচালক আবু ইউসুফ তাকে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে একটি কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে তাকে ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয় বলে অভিযোগ করে ওই ছাত্রী।
মেয়েটির আত্মচিৎকার ও কান্না শুনে স্থানীয় লোকজন দ্রুত ছুটে আসেন এবং পালানোর চেষ্টাকালে অভিযুক্ত শিক্ষককে হাতেনাতে ঘিরে ধরে আটক করেন। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযুক্তকে হেফাজতে নেয়।
ভুক্তভোগী ছাত্রীর লোমহর্ষক ও বিস্ফোরক অভিযোগ
উদ্ধারের পর পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার ওই ছাত্রী গণমাধ্যম ও স্থানীয়দের কাছে যে বিবরণ দিয়েছে, তা নিছক কোনো ধর্ষণচেষ্টা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে:
চেতনানাশক প্রয়োগে ধর্ষণ: ওই ছাত্রীর স্পষ্ট দাবি, এর আগেও বিভিন্ন সময়ে তাকে চেতনানাশক পদার্থ বা মাদক জাতীয় কিছু খাইয়ে অচৈতন্য বা অবশ করে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়েছে।
জন্মনিয়ন্ত্রণের ওষুধ সেবন: লম্পট শিক্ষক প্রতিটি ঘটনার পর ওই ছাত্রীকে জোরপূর্বক জন্মনিয়ন্ত্রণের ওষুধ সেবন করাতো যাতে কোনো শারীরিক জটিলতা বা গর্ভধারণের প্রমাণ না থাকে।
অন্যান্য ছাত্রীদের ওপর হুমকি: শুধু সে একা নয়, মাদরাসার আরও বেশ কয়েকজন ছাত্রীর সঙ্গেও একই কায়দায় পৈশাচিক আচরণ করা হয়েছে বলে সে দাবি করে। ঘটনাটি কাউকে জানালে তাকে খুন ও মারাত্মক ক্ষতির ভয় দেখানো হতো।
এছাড়া অভিযুক্ত আবু ইউসুফের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে পরকীয়ার জেরে নিজের স্ত্রীকে হত্যার চাঞ্চল্যকর অভিযোগও তুলেছেন তার নিহত স্ত্রীর স্বজনেরা।
মাদরাসায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের বক্তব্য
মাদরাসাছাত্রীর ওপর এই বর্বরোচিত নির্যাতনের খবর জানাজানি হওয়ার পর এলাকার সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকেরা চরমভাবে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তাঁরা ক্ষিপ্ত হয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের থাকার ঘর এবং ওই নূরানী মহিলা মাদরাসায় হামলা চালান এবং ভাঙচুরের পাশাপাশি আগুন ধরিয়ে দেন। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) সঞ্জয় কুমার সাহা জানান, অভিযুক্ত শিক্ষক আবু ইউসুফকে ইতিমধ্যে আটক করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
পাবনার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ গণমাধ্যমকে জানান, ভুক্তভোগী ছাত্রীর অভিযোগের প্রতিটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গভীরভাবে যাচাই করা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি মাদরাসায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এনএন/ ২৩ অক্টোবর ২০২৬







