ইউরোপ

রেকর্ড ছাড়াবে প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা: এল নিনো’র সতর্কবার্তায় জাতিসংঘের চরম উদ্বেগ

জেনেভা, ২১ অক্টোবর – বিশ্ব জলবায়ুর ইতিহাসে তৈরি হতে যাচ্ছে এক অভূতপূর্ব ও আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি। প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলার পথে। ভয়াবহ রূপ নেওয়া প্রাকৃতিক আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতি ‘এল নিনো’র (El Niño) কারণে বিশ্বজুড়ে মারাত্মক খরা, আকস্মিক বন্যা ও তীব্র তাপপ্রবাহের চরম ঝুঁকির আশঙ্কা জানিয়ে রেড অ্যালার্ট জারি করেছে জাতিসংঘ।

বুধবার (২১ অক্টোবর ) সুইজারল্যান্ডের জেনেভা থেকে প্রকাশিত জাতিসংঘ অধিভুক্ত বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (WMO) এক সর্বশেষ পূর্বাভাসে এই মারাত্মক সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঐতিহাসিক রেকর্ড ও সময়সূচি

ডব্লিউএমওর পূর্বাভাস বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র:

তাপমাত্রার ভয়াবহ লাফ: আগামী নভেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠদেশের তাপমাত্রা স্বাভাবিক পরিমাপের চেয়ে প্রায় ৩.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি হয়ে যেতে পারে।

পিক টাইম বা শীর্ষ সময়: চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসের দিকে প্রশান্ত মহাসাগরের এই উত্তপ্ত অবস্থা সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছাবে।

ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের দীর্ঘসংগৃহীত আবহাওয়ার রেকর্ডে আগে কখনো সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই অনিয়ন্ত্রিত মাত্রা দেখা যায়নি। অতীতে শক্তিশালী এল নিনোর সময় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে সর্বোচ্চ ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো বেড়েছিল। তাতেই বিশ্বজুড়ে বিশাল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। এবার সেই বিপজ্জনক সীমানাও পার হয়ে যাওয়ার চরম আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।”

কী এই ‘এল নিনো’ এবং কেন এটি এত বিধ্বংসী?

এল নিনো মূলত জলবায়ুচক্র ‘এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন’ (ENSO)-এর একটি সাময়িক উষ্ণ পর্যায়। বিশ্বজুড়ে কৃত্রিমভাবে তৈরি মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এল নিনোর প্রাকৃতিক বিধ্বংসী ক্ষমতা এখন কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি:

১. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশসমূহ): অনাবৃষ্টি, তীব্র দাবাদাহ ও খরা পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। এতে কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং সুপেয় পানির সরবরাহে ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

২. দক্ষিণ ও পূর্ব আফ্রিকা: দক্ষিণ আফ্রিকায় আগামী নভেম্বর থেকে আশঙ্কাজনক হারে প্লাবন ও বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে।

৩. লাতিন আমেরিকা: লাতিন আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ধসের বড় ধরনের বিপদ ঘনিয়ে আসছে।

‘ধ্বংসাত্মক এক গোলা’: ৫ কোটি মানুষের তীব্র খাদ্যসংকটের হুমকি

পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত আগাম প্রস্তুতি ও উদ্ধারকাজের ফান্ড তৈরির আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।

জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ও জরুরি ত্রাণ সমন্বয়ক টম ফ্লেচার এই মানবিক বিপর্যয় নিয়ে এক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “আসন্ন এই এল নিনো সাধারণ কোনো ঘটনা নয়, এটি এক বিশাল বিধ্বংসী ক্ষমতা সম্পন্ন শক্তি—যেন ধেয়ে আসা এক ধ্বংসাত্মক গোলা। এটি এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চরম খরা, বন্যা ও তাপপ্রবাহ নিয়ে আসবে। এর প্রভাবে অন্তত পাঁচ কোটি (৫০ মিলিয়ন) মানুষ সরাসরি তীব্র খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছেন।”

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করে জানিয়েছে, এই চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার ধাক্কায় বিভিন্ন দেশের নগরাঞ্চলের আবাসন, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নজিরবিহীন চাপ তৈরি হবে।

এনএন/ ২১ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language