কক্সবাজার

সাগরের লোনাজলে দেবী দুর্গার বিদায়: কক্সবাজার সৈকতে ২০০ প্রতিমা বিসর্জন

কক্সবাজার, ২১ অক্টোবর – ঢাকের কাঠি, শঙ্খধ্বনি আর ভক্তদের অশ্রুসজল চোখে “আসছে বছর আবার হবে”—শব্দব্রহ্ম ছড়িয়ে পড়ল বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে। ধূপের সুবাস আর ভক্তদের আবেগ-উচ্ছ্বাসে বিদায় জানানো হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পরম আরাধ্য দেবী দুর্গাকে। বিজয়া দশমীতে কক্সবাজারের ঐতিহাসিক লাবণী পয়েন্ট পরিণত হয়েছিল দেশের সর্ববৃহৎ প্রতিমা বিসর্জনের অনন্য মিলনমেলায়। ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে হিন্দু-মুসলিমসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লাখো মানুষ ও পর্যটকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সমুদ্রসৈকতে ফুটে উঠেছে আবহমান বাংলার অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অপূর্ব নিদর্শন।

বুধবার (২১ অক্টোবর) পড়ন্ত বিকেলে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্টে মহাসমারোহে দেবী প্রতিমা বিসর্জনের এই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।

২০০টির বেশি প্রতিমা বিসর্জন ও সম্প্রীতি সমাবেশ

কক্সবাজার জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর বিসর্জন মঞ্চ থেকে ২০০টিরও বেশি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। কেবল কক্সবাজারের স্থানীয় মণ্ডপগুলোই নয়, পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি জেলা বান্দরবান ও নাইক্ষ্যংছড়ি থেকেও ভক্তরা শোভাযাত্রা নিয়ে সৈকতে হাজির হন।

বিকেল ৩টায় বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ‘সম্প্রীতি সমাবেশ’-এর মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সূচনা ঘটে। সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।

প্রতিমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, “সারাদেশে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়েছে। এটি আমাদের দেশের শক্তিশালী নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিবাচক বার্তা বিশ্ব দরবারে তুলে ধরে।”

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠুর সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য শামীম আরা স্বপ্না, জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান, পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান, ট্যুরিস্ট পুলিশের পুলিশ সুপার নিশাদ এঞ্জেলা, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি দোলন ধরসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

আনন্দ ও বিদায়ের অশ্রুতে মিশে গেল সাগরের ঢেউ

বিকেল ৫টার পর শুরু হয় সমুদ্রের জলে প্রতিমা ভাসিয়ে দেওয়ার মূল পর্ব। একে একে মণ্ডপের প্রতিমা সাগরের ঢেউয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়। এ সময় দেবীকে বিদায় জানানোর ক্ষণে অনেক ভক্তকে চোখের জল ফেলতে দেখা যায়।

কক্সবাজার শহরের গোলদীঘিরপাড় এলাকার বাসিন্দা রিতা রাণী পাল আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “মা দুর্গার বিদায় আমাদের কাছে সবসময় কষ্টের। বিজয়ার আনন্দের মাঝেও এক ধরনের শূন্যতা ঘিরে ধরেছে। মা দুর্গার জন্য আবার একটি দীর্ঘ বছর অপেক্ষা করতে হবে।”

অন্যদিকে পূজার ছুটিতে পরিবার নিয়ে ঢাকা থেকে আসা পর্যটক এনামুল হক বলেন, “সৈকতে এত বিশাল বিসর্জনের আয়োজন আগে কখনো সামনাসামনি দেখিনি। ঢাকের বাদ্য আর সাগরের গর্জনের মধ্যে লাখো মানুষের এই জনসমুদ্র দেখে আমাদের ছুটির আনন্দ ষোলকলায় পূর্ণ হয়েছে।”

নিরাপত্তার বলয় ও পূজার সার্বিক চিত্র

বিশাল জনসমাগমকে কেন্দ্র করে বিসর্জনস্থল ও আশপাশের এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিসর্জন প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন রাখতে সমুদ্রে নামার ওপর ছিল কোস্টগার্ড ও লাইফগার্ডের কড়া নজরদারি।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর কক্সবাজার জেলার মোট ৩২৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৪টিতে প্রতিমা পূজা এবং ১৭০টিতে ঘট পূজার আয়োজিত হয়। গত বছরের তুলনায় এ বছর জেলাটিতে পূজামণ্ডপের সংখ্যা ৬টি বেড়েছে।

শারদীয় দুর্গাপূজার এই রঙিন সমাপ্তির মধ্য দিয়ে কক্সবাজার সৈকত আরও একবার প্রমাণ করল—উৎসবের আনন্দ সর্বজনীন এবং সম্প্রীতিই বাঙালির মূল শক্তি।

এনএন/ ২১ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language