ফ্রান্সের সহিংস বিক্ষোভে নজিরবিহীন অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট: ম্যাক্রোঁর কঠোর হুশিয়ারি ও রাজনৈতিক মেরুকরণ তুঙ্গে

প্যারিস, ১৯ অক্টোবর – জ্বালানির অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সরকারি সেবার চরম অবক্ষয়ের প্রতিবাদে ফ্রান্সে শুরু হওয়া ক্ষোভ এখন এক ভয়াবহ ও সর্বগ্রাসী সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। ক্ষুব্ধ নাগরিকদের সাধারণ ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে ছাপিয়ে পুরো দেশজুড়ে এখন বইছে তাণ্ডব, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক লুটপাটের তাণ্ডবলীলা।
পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতি ঘটায় রোববার (১৮ অক্টোবর) জাতির উদ্দেশে এক জরুরি ভাষণ দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। চরম অস্থিতিশীল এই মুহূর্তে দেশবাসীকে শান্ত থাকার জোর আহ্বান জানিয়ে তিনি কঠোর কণ্ঠে হুঁশিয়ারি দিয়ে স্পষ্ট করে জানান, সরকারের নীতি নিয়ে যৌক্তিক দাবি জানানো সাধারণ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সুপরিকল্পিতভাবে ভাঙচুর চালানো অপরাধীদের গুলিয়ে ফেলা যাবে না। জাতীয় সম্পদ ধ্বংসকারী এবং হিংসাত্মক তাণ্ডবে জড়িত প্রতিটি অপরাধীকে আইনানুগভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা হবে।
লিমোজের ঐতিহাসিক ১৯ শতকের টাউন হল ভস্মীভূত, থমথমে প্যারিস-লিওঁ
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী দেশজুড়ে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মানুষ বিক্ষোভে রাজপথে নেমে আসেন। তবে এই বিশাল বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে সুযোগসন্ধানী দুর্বৃত্ত ও মুখোশধারী উপদ্রবকারীরা ফ্রান্সের ঐতিহ্যবাহী লিমোজ (Limoges) শহরের ১৯ শতকের (১৮৭৩ সালে নির্মিত) ঐতিহাসিক টাউন হলে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনে ঐতিহ্যবাহী এই ভবনটির ছাদ এবং মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ৪৩ মিটার উঁচু ঘড়ির টাওয়ারটি ভেঙে গুঁড়িয়ে পড়ে।
এছাড়াও রাজধানী প্যারিস, মার্সেই, লিল ও লিওঁ শহরের বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের দোকান ও ইলেক্ট্রনিক্স আউটলেটে ব্যাপক লুটপাট চালানো হয়। প্যারিস এবং লিওঁর রাস্তায় ব্যারিকেডে আগুন জ্বালিয়ে অবরুদ্ধ করে ফেলা হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রবিবারও টিয়ার গ্যাসে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে রাজপথ; জলকামান ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে দাঙ্গা পুলিশ।
প্রায় ২৪০০ গ্রেপ্তার, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হাজারো পুলিশ সদস্য
সহিংস আন্দোলন দমনে ফরাসি পুলিশের ধরপাকড় চরম মাত্রায় পৌঁছেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যমতে:
মোট গ্রেপ্তার: দেশজুড়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি, সরকারি ভবনে হামলা ও লুটপাটের অভিযোগে এ পর্যন্ত অন্তত ২,৩৯৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আহত পুলিশ সদস্য: শনিবারের তাণ্ডবেই কেবল ১,০০০ জনেরও বেশি পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে অন্তত ৭ জন পুলিশ কর্মকর্তার অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
যেভাবে দাবানল হলো আন্দোলন: তুঙ্গে তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন
মূলত গত মাসে স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ এবং শ্রেণীকক্ষের দৈন্যদশার প্রতিবাদে ফরাসি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। তবে অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয় দেশের মূলধারার শ্রমিক সংগঠনসমূহ, ঐতিহাসিক ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের নেতাকর্মী এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে দিশেহারা সাধারণ নাগরিকরা।
আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই নজিরবিহীন রক্তক্ষয়ী সংঘাত ফরাসি রাজনীতির অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে আরও উসকে দিয়েছে:
সরকারি বক্তব্য: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ ঐতিহাসিক স্থাপনা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিকল্পিত বর্বরোচিত হামলার পেছনে চরমপন্থা অবলম্বনকারী ‘কট্টর বামপন্থী’ দলগুলোর প্রত্যক্ষ উসকানি ও ইন্ধন রয়েছে বলে দাবি করেন।
বামপন্থী দলগুলোর পাল্টা তোপ: দেশটির শীর্ষ বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ সরকারের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করে বলেন, সরকারের অদূরদর্শিতা ও বিক্ষোভকারীদের ওপর দমনপীড়নের কড়া নীতিই সাধারণ যুবসমাজ ও শ্রমিকদের এভাবে ঐক্যবদ্ধ ও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
ডানপন্থীদের ক্ষোভ: অন্যদিকে কট্টর ডানপন্থী প্রভাবশালী নেত্রী মেরিন লে পেন অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এই ধরনের চরম বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতাকে ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়াতে দেওয়া হচ্ছে, যা ফরাসি প্রজাতন্ত্রের মৌলিক কাঠামোর জন্য এক অশনি সংকেত।
এনএন/ ১৯ অক্টোবর ২০২৬







