শত শত লক্ষ্যবস্তু ও ১ হাজারের বেশি ড্রোন! রাশিয়ায় ইউক্রেনের সর্বকালের অন্যতম বৃহৎ হামলা

মস্কো, ১৮ অক্টোবর – রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের রণক্ষেত্র এবার নতুন এক মাত্রা নিল। রাশিয়ার সীমান্ত পেরিয়ে দেশটির অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে একযোগে ১ হাজারের বেশি ড্রোন চালিয়ে এক নজিরবিহীন আক্রমণ শানিয়েছে ইউক্রেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কিয়েভের চালানো অন্যতম বৃহৎ এই ড্রোন হামলায় সেন্ট পিটার্সবার্গের গুরুত্বপূর্ণ তেল টার্মিনালসহ একাধিক জায়গায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
তবে এই আক্রমণের মধ্য দিয়ে কেবল যুদ্ধক্ষেত্রই উত্তপ্ত হয়নি, বরং ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্কেও তৈরি হয়েছে দৃশ্যমান চির। রাশিয়ার তেল অবকাঠামোতে ইউক্রেনের এই হামলায় প্রকাশ্যে তীব্র অসন্তোষ ও সমালোচনা প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল সেন্ট পিটার্সবার্গ: ধ্বংসের মুখে অবকাঠামো
সেন্ট পিটার্সবার্গের স্থানীয় গভর্নর আলেকজান্ডার বেগলভ নিশ্চিত করেছেন যে, ইউক্রেনীয় ড্রোনের আঘাতে অন্তত একজন নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছেন।
ভয়াবহ এই হামলায় মূলত লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল রাশিয়া তথা আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কেন্দ্রগুলোকে:
পিটার্সবার্গ তেল টার্মিনাল ও রুচি তেল ডিপো: দুটি স্থানেই বিকট বিস্ফোরণের পর আগুন ধরে যায়।
অন্যান্য স্থাপনা: রুশ খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘ওজন’-এর লজিস্টিক সেন্টার এবং স্থানীয় প্রযুক্তি সংস্থা ‘ভিক’-এর একটি ডেটা সেন্টারও এই হামলার শিকার হয়েছে।
এদিকে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তারা দেশের ১৫টি অঞ্চল, দখলকৃত ক্রিমিয়া উপদ্বীপ এবং কৃষ্ণসাগরের ওপর থেকে মোট ১ হাজার ১৫টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেশকভ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কিয়েভের এই আগ্রাসন মস্কো রুখে দিচ্ছে এবং এমন হামলায় যুদ্ধের বর্তমান গতিপথ বদলানো যাবে না।
কেন ট্রাম্পের আহ্বানে কান দিচ্ছেন না জেলেনস্কি? (গভীর বিশ্লেষণ)
ঘটনার পটভূমি কিন্তু বেশ জটিল। গত ১১ অক্টোবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, সাড়ে চার বছরের এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রাশিয়া ও ইউক্রেন একটি “জ্বালানি যুদ্ধবিরতি”-তে সম্মত হয়েছে। ট্রাম্প উভয় পক্ষকেই একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তবে শান্তির এই আশার আলোর মুখ দেখার আগেই উল্টো চিত্র দেখা গেল। জেলেনস্কি প্রশাসনের অভিযোগ, ট্রাম্পের ঘোষণার পরও রাশিয়া তাদের আগ্রাসন থামায়নি:
এক সপ্তাহে ৭৬ বার হামলা: ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এক্সে (সাবেক টুইটার) ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ট্রাম্পের ঘোষণার পর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি, তেল ও গ্যাস খাতে অন্তত ৭৬ বার হামলা চালিয়েছে।
বিদ্যুৎহীন হাজারো পরিবার: হামলার কারণে ইউক্রেনের ৪টি অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ইউক্রেনকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার এই রুশ প্রচেষ্টার জবাব হিসেবেই কিয়েভ রাশিয়ার তেলের ওপর পুনরায় শক্তিশালী হামলা শুরু করেছে।
জেলেনস্কির কড়া বার্তা: জেলেনস্কি স্পষ্টভাবে বলেছেন, “ইউক্রেন আত্মরক্ষা করছে বলেই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হচ্ছে না, যুদ্ধ চলছে রাশিয়ার একপাক্ষিক হামলার কারণে। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল না করে বরং শান্তির জন্য মস্কোকেই চরম চাপের মুখে ফেলতে হবে।”
ওয়াশিংটনের টানাপোড়েন ও রাশিয়ার পাল্টা হামলা
হামলার এই উত্তাপের মাঝেই রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় ইউক্রেনীয় শহর জাপোরিঝিয়াতেও জোড়া হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। জাপোরিঝিয়ার আঞ্চলিক সামরিক প্রশাসনের প্রধান মাইখাইলো সেমিকিন জানান, এই হামলায় এক নারী নিহত এবং ৬ বছরের এক শিশুসহ ২ জন আহত হয়েছেন। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুটি আবাসিক ভবন, ১৮টি গাড়ি ও একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যকার এই স্নায়ুযুদ্ধ নতুন মোড় নিচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা কিংবা নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি নিয়ে কৌশলী অবস্থান নিয়েছেন। ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের তিনি জানান, রাশিয়া সম্পর্কিত পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হবে তা খুব দ্রুতই জানা যাবে এবং তা “বিশ্বের জন্য শুভ” হবে।
কোন দিকে যাচ্ছে এই যুদ্ধ?
জ্বালানি যুদ্ধবিরতির কথা বলে যখন কূটনীতির টেবিলে সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছিল, তখন সেন্ট পিটার্সবার্গে সহস্রাধিক ড্রোনের এই হামলা পরিষ্কার করে দিল যে—দুই পক্ষের কেউই সহজে পিছু হঠবে না। ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা এবং ইউক্রেনের আত্মরক্ষার এই কৌশলগত জেদের মাঝে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা এখন অনেকটাই সুদূর পরাহত।
এনএন/ ১৮ অক্টোবর ২০২৬







