সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেমে মহাদুরনীতি! শত কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান

ঢাকা, ১৫ অক্টোবর – জাতীয় সংসদ ভবনের প্লেনারি হলে সাউন্ড সিস্টেম (এসআইএস) স্থাপন, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের এক নতুন ও চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই কেলেঙ্কারির মূল অভিযুক্ত হিসেবে ‘কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জাহিদুর রহিম জোয়ারদার এবং গণপূর্ত বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জোর তদন্ত চালানো হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিকেলে দুদকের মহাপরিচালক (ডিজি) মোহাম্মদ নাজমুল হাসান এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এই অনুসন্ধানের অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করেন।
সংসদ ভবন থেকে স্বাস্থ্য খাত: জাহিদুর রহিমের শত কোটির ফাঁদ
দুদক মহাপরিচালক জানান, কেবল সংসদ ভবনই নয়, সিইও জাহিদুর রহিম জোয়ারদারের বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে স্বাস্থ্য খাতেও ব্যাপক দুর্নীতি চালানোর অভিযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে নিম্নমানের মেডিকেল ইকুইপমেন্ট সরবরাহ, ওভার ইনভয়েসিং এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করে তা বিদেশে পাচার করার অভিযোগেও তার বিরুদ্ধে পৃথক অনুসন্ধান চলছে।
“সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম সংস্কার ও মেরামতের কাজে পরস্পর যোগসাজশে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগে তদন্ত চলছে। একই সাথে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় ওভার ইনভয়েসিং করে শত কোটি টাকা পাচারের তথ্যও আমরা খতিয়ে দেখছি।” — মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, মহাপরিচালক (দুদক)।
যেভাবে শুরু সংসদ ভবনের ‘শব্দ’ কেলেঙ্কারি
দুদক সূত্রের তথ্যানুযায়ী, ঘটনার সূত্রপাত ২০১৮ সালে। তৎকালীন গণপূর্ত বিভাগের জাতীয় সংসদ ভবন কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম) মো. আস্রাফুল হকের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে জাহিদুর রহিমের প্রতিষ্ঠান ‘কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড’ সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম স্থাপনের কাজ পায়।
ত্রুটিপূর্ণ সিস্টেম ও নতুন বাজেট: চালুর পর থেকেই সংসদ অধিবেশন চলাকালে বারবার সিস্টেমে প্রযুক্তিগত বিভ্রাট দেখা দেয়।
গণঅভ্যুত্থান ও সংস্কারের নামে নতুন খেলা: গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন বিক্ষুব্ধ জনতা সংসদ ভবনে প্রবেশ করলে সাউন্ড সিস্টেমটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদেও রহস্যজনকভাবে একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় মেরামতের কাজ দেওয়া হয়।
বরাদ্দ ও আত্মসাৎ: সাউন্ড সিস্টেমটি সংস্কার ও মেরামতের জন্য মোট ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ইতোমধ্যেই ৫ কোটি টাকা উত্তোলন ও ব্যয় করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদার মিলে কৌশলে এই বিশাল অংকের সরকারি টাকা পকেটে পুরেছেন বলে অভিযোগ।
অভিযোগের সত্যতা পেয়ে চলতি বছরের ৯ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দুদকের অনুসন্ধান টিম মাঠে নামে।
খুলনা-৬ আসনের সাবেক এমপির বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন
এদিকে, দুর্নীতির পৃথক আরেকটি অভিযানে খুলনার রাজনীতিতেও বড় ঝাকুনি দিয়েছে দুদক। ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ উপায়ে বিপুল পরিমাণ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে খুলনা-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. রশীদুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারায় তার বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়েরের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে কমিশন।
ক্ষমতার অপব্যবহার ও সিস্টেমের গলদ
দেশের সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক কেন্দ্রবিন্দু জাতীয় সংসদ ভবন। সেখানেও যদি একটি সাধারণ সাউন্ড সিস্টেমের নামে বছর বছর কোটি কোটি টাকার নয়ছয় চলে, তবে তা রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও নজরদারি ব্যবস্থার বড় ধরনের ব্যর্থতার চিত্র ফুটিয়ে তোলে। ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের এই সিন্ডিকেট কীভাবে বারবার রাষ্ট্রীয় কোষাগার ফাঁকা করেছে, তা এখন তদন্তে উদঘাটনের অপেক্ষা।
এনএন/ ১৫ অক্টোবর ২০২৬







