আইএমএফের নতুন ঋণে ‘শর্ত মানা ও সমঝোতার’ বার্তা দিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু

ঢাকা, ১৫ অক্টোবর – আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে করা ঋণ চুক্তির কঠোর শর্ত ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে বাতিল করেছিল বিএনপি সরকার। এমনকী ১০ দিন আগেও অর্থমন্ত্রী গর্জন তুলে বলেছিলেন— আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের সহায়তার ওপর বাংলাদেশ আর নির্ভর করবে না। তবে ব্যাংককে চলমান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বার্ষিক সভায় এসে অবস্থান পরিবর্তনের স্পষ্ট বার্তা দিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেছেন যে, নতুন ঋণের আলোচনাতেও শর্ত থাকবে এবং সেসব শর্ত পূরণও করা হবে।
শর্ত তো থাকবেই, পূরণও হবে’: অবস্থান বদলের প্রেক্ষাপট
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বহুপাক্ষিক সংস্থাসমূহের সাথে ঋণ সহায়তার ক্ষেত্রে শর্ত থাকা স্বাভাবিক। তবে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছেই বাংলাদেশ তা মোকাবিলা করবে।
“শর্ত তো থাকবে। শর্ত পূরণ হবে। আবার কিছু কিছু দুই পক্ষ থেকে আমরা সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করব। সেগুলো কোনো সমস্যা না। শুধু আইএমএফ না, বিশ্বব্যাংকসহ সব মাল্টিল্যাটারাল বডির সাথে পার্টনারশিপের মাধ্যমে আমরা একসাথে কাজ করব এবং এটি ভালোভাবে এগিয়ে যাবে।”— আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থমন্ত্রী
আইএমএফের পর্যবেক্ষণে সায় সরকারের
বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাত পুনর্গঠনে আইএমএফ যেসব পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, তার বেশির ভাগের সঙ্গেই সরকার একমত বলে জানান অর্থমন্ত্রী। বিশেষ করে:
- ব্যাংকিং খাতের নাজুক পরিস্থিতি ও সংস্কার।
- কর-জিডিপি (Tax-to-GDP) অনুপাত বৃদ্ধি ও রাজস্ব আদায় বাড়ানো।
- জ্বালানি খাতে ভর্তুকি সমন্বয় ও নীতিগত পরিবর্তন।
অর্থমন্ত্রীর দাবি, আইএমএফের তুলে ধরা বেশ কিছু পর্যবেক্ষণের সমাধান ইতোমধ্যে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের মাধ্যমে হয়ে গেছে, আর বাকি বিষয়গুলো নিয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চলমান রয়েছে।
মাত্র ১০ দিন আগের কঠোর অবস্থান ও বর্তমান বৈপরীত্য
গত ৪ অক্টোবর ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে ঠিক উল্টো সুর শোনা গিয়েছিল অর্থমন্ত্রীর মুখে। সেদিন তিনি বেশ কড়া ভাষায় বলেছিলেন, “আইএমএফ টাকা দেবে, বিশ্ব ব্যাংক টাকা দেবে–এসব ভুলে যান। তাদের শর্ত আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় বলেই আইএমএফের আগের প্রোগ্রাম ক্যানসেল করে দেওয়া হয়েছে।”
এমনকী দাতা সংস্থার কোনো শর্ত না মেনে ২০৩৪ সালের মধ্যে নিজস্ব শক্তিতে বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন।
তবে ব্যাংককের বার্ষিক সম্মেলনে আইএমএফের সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর তিনি সুর নরম করে এটিকে একটি ‘ধারাবাহিক প্রসেস’ বা প্রক্রিয়া হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা চূড়ান্ত হতে আরও কয়েক মাস সময় লাগবে।
বৈশ্বিক মন্দা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অগ্রগতিতে ‘সন্তুষ্ট’ আইএমএফ
বিশ্ব অর্থনীতির বিদ্যমান অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে আইএমএফ ইতিবাচক মূল্যায়ন করেছে বলে দাবি করেন অর্থমন্ত্রী।
বাংলাদেশ সরকারের সংস্কার কৌশলের ‘ক্রেডিবিলিটি’ বা বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ওঠানো প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন— ক্রেডিবল স্ট্র্যাটেজি বা বিশ্বাসযোগ্য কৌশল ছিল বলেই আলোচনা এত দূর এগিয়েছে। পার্টনারশিপের মাধ্যমেই আগামী দিনের বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে উভয় পক্ষ ঐকমত্যে পৌঁছেছে।
কঠোর অবস্থান থেকে কেন কৌশলগত পিছুটান?
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের বিশাল অংকের বাজেট সাপোর্ট ও ঋণ সহায়তা ছাড়া বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সামাল দেওয়া বেশ কঠিন challenge। রাজনীতির মাঠে বা নীতিগত বক্তব্যে ‘শর্ত না মানার’ বার্তা দিলেও, বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে ব্যাংককে সরকার কৌশলগত নমনীয়তার পথই বেছে নিয়েছে।
এনএন/ ১৫ অক্টোবর ২০২৬







