ইসরায়েলি সংস্থার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ডিভাইসে আড়িপাতার চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস

তেল আবিব, ১৫ অক্টোবর – অনলাইন বিজ্ঞাপনের বিশাল নেটওয়ার্ক বা ‘অ্যাড-টেক’ ব্যবস্থা ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ডিভাইসে নজরদারি ও গোপনে স্পাইওয়্যার ছড়িয়ে দেওয়ার এক ভয়াবহ চক্রান্তের তথ্য উন্মোচিত হয়েছে। কানাডাভিত্তিক খ্যাতনামা সাইবার নজরদারি বিষয়ক গবেষণা সংস্থা সিটিজেন ল্যাব এবং নিউ ইয়র্কের বিজ্ঞাপন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান কনফিয়েন্টের যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য।
বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, ইসরায়েলি ডিজিটাল বিজ্ঞাপন সংস্থা ‘ডিসকভার-টেক’ (Discover-Tech) গুগল, কমকাস্ট ও রাশিয়ার ইয়ানডেক্সের মতো বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনী প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কুখ্যাত মার্কিন-কালোতালিকাভুক্ত স্পাইওয়্যার নির্মাতা ক্যান্ডিরু (Candiru) ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাকে সাধারণ মানুষের ডিভাইসে প্রবেশের পথ তৈরি করে দিয়েছে।
সাধারণ বিজ্ঞাপনের আড়ালে স্পাইওয়্যারের ফাঁদ
সিটিজেন ল্যাবের গবেষকদের মতে, এটি অনলাইন বিজ্ঞাপনের নামে একটি পরিকল্পিত ও মারাত্মক নিরাপত্তা হুমকি। ডিসকভার-টেক ফোন বা ইয়ারপডের মতো দৈনন্দিন পণ্যের নির্দোষ বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করত। তাদের তৈরি এসব বিজ্ঞাপন প্রায় ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি ওয়েবসাইট এবং ৭৫ হাজার মোবাইল অ্যাপে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
লোডিংয়েই নজরদারি: ডিভাইসে ক্যান্ডিরুর শক্তিশালী স্পাইওয়্যার ঢোকাতে ব্যবহারকারীকে বিজ্ঞাপনে ক্লিকও করতে হতো না! স্রেফ ওয়েবসাইটে বা অ্যাপে বিজ্ঞাপনটি লোড বা প্রদর্শিত হওয়াই নজরদারির জন্য যথেষ্ট ছিল।
মোবাইল নম্বর ও অবস্থান শনাক্ত: ‘কুকি ম্যাচিং’ নামক বিশেষ ডেটা ট্র্যাকিং ব্যবহার করে প্রতিদিন অন্তত ১ কোটি বিজ্ঞাপন বিতরণ করত সংস্থাটি। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীর সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান ও মোবাইল নম্বর হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হতো।
“বর্তমানে যেভাবে অনলাইন বিজ্ঞাপন পরিচালিত হয়, তা একটি পরিকল্পিত নিরাপত্তা হুমকি। এটি রাষ্ট্র, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষ—সবার জন্যই সমান বিপজ্জনক।” — উলফি ক্রিস্টল, জ্যেষ্ঠ গবেষক, সিটিজেন ল্যাব।
আল জাজিরা, পেন্টাগন ও জাতিসংঘের ডিভাইসে হানা!
গবেষণায় দেখা গেছে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের নেটওয়ার্কগুলোতে ডিসকভার-টেকের বিজ্ঞাপন ব্যাপকভাবে ছেয়ে রাখা হয়েছিল, যাতে একটি পুরো দেশের ডিজিটাল কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। এছাড়া পেন্টাগন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ক্যাটাগরির শত শত নেটওয়ার্কে এসব বিপজ্জনক বিজ্ঞাপন দেখানো হয়েছিল।
এমনকি ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কাতারি সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার ৪৫টি উইন্ডোজ ডিভাইসে অনুপ্রবেশের জন্য ডিসকভার-টেকের মাধ্যমেই ক্যান্ডিরুর স্পাইওয়্যার ছড়িয়ে দেওয়া হয় বলে সিটিজেন ল্যাব নিশ্চিত করেছে। এছাড়াও জাতিসংঘ, ন্যাটো, ইউরোপীয় কমিশন এবং এনভিডিয়া, স্যানডিস্ক ও মাইক্রনের মতো বিশ্বপ্রভাবশালী চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ওপরও একইভাবে নজরদারি চালানোর চেষ্টা চালানো হয়।
গুগল ও অন্যান্য টেক জায়ান্টদের কঠোর পদক্ষেপ
প্রতিবেদন প্রকাশের পর বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাত ও বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলোতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তথ্য ফাঁসের পরেই বিশ্বজুড়ে ডিসকভার-টেককে বয়কট করার হিড়িক পড়েছে:
গুগল (Google): বিজ্ঞাপনের নীতিমালার মারাত্মক লঙ্ঘনের দায়ে ডিসকভার-টেককে নিজেদের প্ল্যাটফর্ম থেকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে গুগল।
আইএবি ইউরোপ (IAB Europe): ইউরোপীয় বিজ্ঞাপন সংস্থাটি তাদের বৈশ্বিক অনুমোদিত বিক্রেতাদের তালিকা থেকে ডিসকভার-টেককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে।
কমকাস্ট বিজওয়াক্স (Beeswax): সন্দেহজনক কার্যক্রম ধরা পড়ার পর কমকাস্টের নিয়ন্ত্রণাধীন এই অ্যাড-টেক জায়ান্ট ডিসকভার-টেককে প্ল্যাটফর্ম থেকে হটিয়ে দিয়েছে।
তবে রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও ডিসকভার-টেক এবং ক্যান্ডিরু কর্তৃপক্ষের কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
কেন এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি?
ডিজিটাল দুনিয়ায় আমরা প্রতিদিন যে হাজারও বিজ্ঞাপন দেখি, সেটাই যে গোপনে রাষ্ট্রের বা নাগরিকের প্রধান সাইবার শত্রুতে পরিণত হতে পারে—এই ঘটনা তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কেবল ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভঙ্গ নয়, পেন্টাগনের মতো সামরিক সংস্থাগুলো এখন মনে করছে অ্যাড-টেক ডেটার মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন সেনাদের অবস্থান ট্র্যাক করা সম্ভব, যা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন আতঙ্কের নাম।
এনএন/ ১৫ অক্টোবর ২০২৬







