
কানাডার গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান Royal Society of Canada বা RSC-এর College of New Scholars, Artists and Scientists-এর সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত গবেষক ড. রঞ্জন দত্ত। বর্তমানে কানাডার ক্যালগেরির Mount Royal University-তে Indigenous Studies-এর সহযোগী অধ্যাপক এবং Community Disaster Research বিষয়ে Canada Research Chair।
রঞ্জন দত্তের আজকের অবস্থানে পৌঁছানোর গল্পের শুরু বাংলাদেশে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০০০ সালে BSS Honours এবং ২০০২ সালে MSS সম্পন্ন করেন তিনি। এরপর উচ্চশিক্ষার পথ ধরে চলে আসেন উত্তর আমেরিকায়। কানাডার University of Saskatchewan-এর School of Environment and Sustainability থেকে ২০১৬ সালে পিএইচডি অর্জন করেন। পরে University of Regina-র Johnson Shoyama Graduate School of Public Policy-তে মর্যাদাপূর্ণ Banting Postdoctoral Fellow হিসেবে গবেষণা করেন। সেখান থেকে তাঁর পথ এসে মিশেছে Mount Royal University-তে।
২০২০ সালে তাঁর গবেষণাজীবনে আসে আরেকটি বড় অর্জন। তিনি Community Disaster Research বিষয়ে Tier 2 Canada Research Chair হিসেবে নিযুক্ত হন। Canada Research Chair কর্মসূচির উদ্দেশ্য কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়ার মতো গবেষকদের কাজের সুযোগ আরও বিস্তৃত করা। রঞ্জন দত্ত এখন এই দায়িত্বের দ্বিতীয় মেয়াদে রয়েছেন।
তবে তাঁর গবেষণার গল্প কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের কক্ষ, বই কিংবা গবেষণাপত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তাঁর কাজের বড় অংশই মানুষের মধ্যে, জনপদে এবং প্রকৃতির কাছে। গত ১৭ বছর ধরে তিনি আদিবাসী, স্থানীয় এবং বিভিন্ন অভিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কমিউনিটিভিত্তিক দুর্যোগ গবেষণা করছেন। তাঁর নেতৃত্ব ও যৌথ নেতৃত্বে ৩৯টি গবেষণা প্রকল্পে ১৫ মিলিয়ন কানাডীয় ডলারের বেশি প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা তহবিল এসেছে। কানাডা থেকে আর্কটিক অঞ্চল, দক্ষিণ এশিয়া থেকে আফ্রিকা ও ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে তাঁর গবেষণা ও অংশীদারত্ব।
এই গবেষণার কেন্দ্রে রয়েছে একটি সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা। কোনো এলাকার মানুষের জীবন ও প্রকৃতি নিয়ে গবেষণা করতে হলে সেই এলাকার মানুষের জ্ঞানকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশ ও নেপালে কাজ করতে গিয়ে রঞ্জন দত্ত দেখেছেন, একদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ও বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণা করছে, অন্যদিকে স্থানীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে রয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অর্জিত নিজস্ব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এই দুই জগতের মধ্যে যোগাযোগ নেই। রঞ্জন দত্ত সেই দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করছেন।
দুর্যোগ মোকাবিলা, জলবায়ু পরিবর্তন, পানি ও ভূমির অধিকার, খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশগত স্থায়িত্ব এবং একটি জনগোষ্ঠীর বিপর্যয় সামলে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তাঁর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাঁর কাজের উদ্দেশ্য স্থানীয় জ্ঞানকে সরিয়ে দিয়ে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান প্রতিষ্ঠা করা নয়। বরং দুই ধরনের জ্ঞানকে নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা বজায় রেখে মানুষের কাজে লাগানোর পথ খোঁজা। এই কাজ করতে গিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছে দুর্গম জনপদেও।
উত্তর সাসকাচোয়ানের Woodland Cree First Nation জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তিনি দাবানল ও দুর্যোগ মোকাবিলা নিয়ে কাজ করছেন। ২০২৫ সালে ভয়াবহ দাবানলের কারণে ওই অঞ্চলের মানুষকে বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিতে হয়েছিল। কিন্তু সেখানে আগুন কিংবা বন সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান নতুন নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভূমি ও প্রকৃতির সঙ্গে বসবাসের মধ্য দিয়ে স্থানীয় প্রবীণেরা যে জ্ঞান অর্জন করেছেন, সেই অভিজ্ঞতাকে আধুনিক দুর্যোগ পরিকল্পনা, বন ব্যবস্থাপনা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে তাঁর কাজে।
বাংলাদেশও তাঁর গবেষণা থেকে হারিয়ে যায়নি। দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও জনপদ নিয়ে তাঁর কাজ সরকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নীতিগত আলোচনাতেও জায়গা পেয়েছে বলে জানিয়েছে Mount Royal University। অর্থাৎ যে শিক্ষার্থীর সমাজবিজ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, তাঁর গবেষণা এখন বাংলাদেশ থেকে কানাডার আর্কটিক পর্যন্ত মানুষের জীবন, পরিবেশ ও নীতিনির্ধারণের আলোচনায় যুক্ত হয়েছে। এই দীর্ঘ কাজের স্বীকৃতিই এবার দিয়েছে Royal Society of Canada।
১৮৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত Royal Society of Canada দেশটির জাতীয় পর্যায়ের অন্যতম প্রধান একাডেমিক প্রতিষ্ঠান। গত ৯ সেপ্টেম্বর সংস্থাটি ২০২৬ সালের নতুন সদস্যদের নাম ঘোষণা করে। College of New Scholars, Artists and Scientists-এর সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন রঞ্জন দত্ত। আগামী ১৩ নভেম্বর অটোয়ায় Royal Society of Canada-এর বার্ষিক অনুষ্ঠানে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেওয়া হবে।
Mount Royal University-এর প্রভোস্ট ও একাডেমিকবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. Chad London মনে করেন, এই স্বীকৃতি রঞ্জন দত্তের গবেষণার প্রভাব এবং কমিউনিটিকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের অঙ্গীকারের স্বীকৃতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের Faculty of Arts-এর ডিন Jennifer Pettit-ও তাঁর এই অর্জনকে Indigenous Studies ও disaster studies-এ গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন।
রঞ্জন দত্তের নিজের কাছে অবশ্য পুরস্কার কিংবা স্বীকৃতিই শেষ কথা নয়। Royal Society of Canada-এর সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি বলেছেন, এই স্বীকৃতির জন্য তিনি কৃতজ্ঞ, কিন্তু এটিকে তিনি পথের শেষ মনে করেন না। যেসব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তিনি কাজ করেন, তারা যদি নিজেদের অধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে পারে, সেটিই তাঁর কাছে ব্যক্তিগত কোনো পুরস্কারের চেয়ে বড় অর্জন।
তথ্যসূত্র:
Royal Society of Canada
Mount Royal University







