যুক্তরাষ্ট্রে বিড়াল নির্যাতন করে ৪ লাখ ডলারের প্রতারণা যুবকের ১৫ বছরের কারাদণ্ড
নজরুল মিন্টো

প্রাণীর প্রতি যাঁদের ভালোবাসা আছে, যাঁরা প্রাণী পোষেন, তাঁদের কাছে সেই প্রাণীটি একসময় আর কেবল প্রাণী হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে পরিবারেরই একজন। মালিক ঘরে ফিরলে ছুটে আসা, পাশে বসে থাকা, আদর চাইতে গা ঘেঁষে দাঁড়ানো কিংবা মন খারাপের দিনে চুপচাপ সঙ্গ দেওয়া, এসবের মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে তার গড়ে ওঠে এক অদ্ভুত মায়ার সম্পর্ক। সে কথা বলতে পারে না, অথচ ভালোবাসা বোঝে। সবচেয়ে বড় কথা, যে মানুষটি তাকে আশ্রয় দেয়, তার ওপর সে নিঃশর্ত বিশ্বাস রাখে। সেই বিশ্বাসের মধ্যেই থাকে খাবার, নিরাপত্তা, আদর, সোহাগ আর বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা।
এই কারণেই পোষা প্রাণী ঘরে আনা কেবল শখ নয়, একটি জীবনের দায়িত্ব নেওয়াও বটে। নিজের সন্তানের মতোই তার খাবার, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও যত্ন নিতে হয়। তার পৃথিবীটি অনেকটাই গড়ে ওঠে মানুষের ভালোবাসা আর যত্নের ওপর।
অথচ যে মানুষের কাছে তার সবচেয়ে নিরাপদ থাকার কথা, সেই মানুষই যদি তাকে আঘাত করে, এমনকি তার যন্ত্রণাকেও অর্থ উপার্জনের উপায় বানায়, তখন তা বিশ্বাস করাও কঠিন হয়ে পড়ে। মানুষ কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনা তারই এক ভয়ংকর উদাহরণ।
ভার্জিনিয়ায় অসহায় বিড়ালকে নির্যাতন করে সেই নির্যাতনকেই অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার বানিয়েছিলেন ২৭ বছর বয়সী রডনি ট্রাভিস জুনিয়র। বিড়ালকে আহত করে সেই আঘাতকে ক্যানসারের লক্ষণ বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হতো। তারপর চিকিৎসার কথা বলে মানুষের কাছে চাওয়া হতো অর্থ। অসুস্থ প্রাণীকে বাঁচানোর আকুতি দেখে মানুষও হাত বাড়িয়েছেন। সেই সহানুভূতিকে কাজে লাগিয়ে চার লাখ ডলারের বেশি সংগ্রহ করেছিলেন রডনি। শেষ পর্যন্ত তাঁর জায়গা হয়েছে কারাগারে।
২৩ সেপ্টেম্বর ভার্জিনিয়ার হেনরিকো কাউন্টি সার্কিট কোর্টে পশু নির্যাতন ও অনলাইনে প্রতারণার একাধিক গুরুতর অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন রডনি। বিচারক লিন্ডা ল্যামবার্ট তাঁকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেন। সেই সঙ্গে করা হয় ২৫ হাজার ডলার জরিমানা। হেনরিকো কাউন্টি কমনওয়েলথস অ্যাটর্নি শ্যানন টেইলরের ভাষ্য অনুযায়ী, পশু নির্যাতনের মামলায় ভার্জিনিয়ার ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে দীর্ঘ কারাদণ্ড।
ঘটনার ভয়াবহতা আরও পরিষ্কার হয় তদন্তে। প্রসিকিউটররা অন্তত ১৯টি বিড়ালকে নামসহ শনাক্ত করেছেন, যারা রডনির হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছিল বলে আদালতে জানানো হয়। এর মধ্যে অন্তত ছয়টির মৃত্যুর জন্য তাঁকে সরাসরি দায়ী করেছেন তাঁরা। তবে এখানেই শেষ নয়। তদন্তকারীদের ধারণা, নির্যাতনের শিকার বিড়ালের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
রডনি বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র ও উদ্ধারকারী সংগঠন থেকে বিড়াল সংগ্রহ করতেন। কখনো নিজের নাম, কখনো ভুয়া পরিচয়, এমনকি বাবার পরিচয়ও ব্যবহার করতেন বিড়াল সংগ্রহের কাজে। এরপর হেনরিকো কাউন্টির বিভিন্ন হোটেলকক্ষে নিয়ে বিড়ালগুলোর ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হতো।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গল্পটি অবশ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ‘Noah the Cat’, ‘Sophia Meows’ ও ‘Hayden the Cat’-এর মতো নামে অ্যাকাউন্ট খুলে অসুস্থ ও আহত বিড়ালের ভিডিও দেখানো হতো। বলা হতো, তারা ক্যানসারে আক্রান্ত। চিকিৎসার জন্য জরুরি অর্থ প্রয়োজন। কখনো এমন বার্তাও দেওয়া হতো যে প্রিয় বিড়ালটির হাতে আর মাত্র কয়েক দিন সময় আছে। সঙ্গে থাকত অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা।
মানুষ বিশ্বাস করেছিল। অসুস্থ একটি প্রাণীকে বাঁচানোর আশায় বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্থ পাঠিয়েছিল তারা। কিন্তু সেই অর্থ বিড়ালগুলোর চিকিৎসায় ব্যয় হচ্ছিল না। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষের সহানুভূতি থেকে পাওয়া অর্থ নিজের সংগীতজীবনের স্বপ্ন পূরণে ব্যবহার করছিলেন রডনি।
প্রতারণাকে বিশ্বাসযোগ্য করতে তৈরি করা হয়েছিল ভুয়া পশু চিকিৎসার বিল। তদন্তের প্রাথমিক নথিতে এমন দুটি বিল পাওয়া যায়, যার মোট পরিমাণ ছিল ৩৫ হাজার ৮৯২ ডলারের বেশি। বিড়ালের পেটের লোম কামিয়ে দেওয়া, পায়ে ব্যান্ডেজ লাগানো এবং চিকিৎসা চলছে এমন দৃশ্য তৈরির অভিযোগও আদালতে তুলে ধরেন প্রসিকিউটররা।
সবচেয়ে নির্মম তথ্য আসে পশু চিকিৎসকদের পরীক্ষা থেকে। ভিডিওতে বিড়ালগুলোর যে অসুস্থতা দেখানো হয়েছিল, তার সঙ্গে ক্যানসারের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। বরং তাদের শরীরে পাওয়া আঘাতগুলো ভারী কোনো বস্তু দিয়ে আঘাত করার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মত দেন পশু চিকিৎসকেরা। কিছু বিড়ালকে বিশেষ ধরনের ওষুধ দেওয়ার প্রমাণও পাওয়া যায়, যা তাদের ঝিমিয়ে পড়া ও ভারসাম্য হারানোর কারণ হতে পারে।
‘Hayden’ নামের একটি ধূসর ডোরাকাটা বিড়ালের ঘটনা তদন্তকারীদের সামনে নির্যাতনের মাত্রা আরও পরিষ্কার করে দেয়। ভিডিওতে তার মুখ ও নাক দিয়ে রক্ত পড়তে দেখা যায়। পরে পশু চিকিৎসকের পরীক্ষায় তার মাথার খুলি, একাধিক পাঁজর ও মেরুদণ্ডে ভাঙা অংশ পাওয়া যায় বলে আদালতের নথির ভিত্তিতে জানিয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম।
ঘটনাটি পুলিশের নজরে আসে গত ১২ ফেব্রুয়ারি। ভার্জিনিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর এবং চেস্টারফিল্ড কাউন্টি অ্যানিমেল কন্ট্রোল কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর তদন্ত শুরু করে হেনরিকো পুলিশ। স্থানীয় পশু উদ্ধারকর্মীদের কয়েকজন আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো নিয়ে সন্দেহ করেছিলেন এবং তথ্য সংগ্রহ করছিলেন। সেই তথ্য তদন্তকারীদের হাতে পৌঁছানোর পর দ্রুত রডনিকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
পরদিন চেস্টারফিল্ড কাউন্টিতে তাঁর বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ কয়েকটি বিড়াল উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। একটি বিড়াল হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যায়।
ভার্জিনিয়ার আইনে কোনো প্রাণীকে ইচ্ছাকৃতভাবে নির্যাতন, অমানবিক যন্ত্রণা দেওয়া, মারধর, অঙ্গহানি বা হত্যা করা অপরাধ। পরিস্থিতি ও ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী তা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধেও পরিণত হতে পারে।
পোষা প্রাণী ঘরে আনার অর্থ তাই শুধু একটি বিড়াল বা কুকুরের মালিক হওয়া নয়। American Veterinary Medical Association বা AVMA পোষা প্রাণী রাখাকে দায়িত্বের সম্পর্ক হিসেবে দেখে। তাদের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সামর্থ্য অনুযায়ী প্রাণী গ্রহণ করতে হবে এবং খাবার, বিশুদ্ধ পানি, নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা, সঙ্গ ও প্রয়োজনীয় যত্ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রাণীটির পুরো জীবনের দায়িত্ব নেওয়ার মানসিক ও আর্থিক প্রস্তুতিও থাকতে হবে।
রডনি ট্রাভিসের এই ঘটনা পশুপ্রেমীদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তাও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহত বা অসুস্থ প্রাণীর ছবি দেখে মায়া হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আবেগে অর্থ পাঠানোর আগে কে অর্থ চাইছে, কোন প্রাণীর চিকিৎসার জন্য চাইছে এবং সত্যিই কোনো পশু হাসপাতাল বা উদ্ধারকারী সংস্থা এর সঙ্গে যুক্ত কি না, তা যাচাই করা জরুরি। আবার কোনো ছবি বা ভিডিও দেখে প্রাণী নির্যাতনের সন্দেহ হলে শুধু শেয়ার করে থেমে না থেকে পুলিশ, অ্যানিমেল কন্ট্রোল বা পশু কল্যাণ সংস্থাকে জানানো যেতে পারে। রডনির ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষ ও পশু উদ্ধারকর্মীদের হাতে আসা তথ্য শেষ পর্যন্ত তদন্তকারীদের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিয়েছিল।
একটি প্রাণী মানুষের ঘরে আসে বিশ্বাস নিয়ে। তার খাবার কে দেবে, অসুস্থ হলে কে চিকিৎসা করাবে, ভয় পেলে কার কাছে আশ্রয় নেবে, সে সিদ্ধান্ত তার নিজের হাতে থাকে না। দায়িত্বটি মানুষের। সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে কোনো প্রাণীকে কষ্ট দেওয়া শুধু নিষ্ঠুরতাই নয়, গুরুতর অপরাধও। তার পরিণতি কতটা কঠিন হতে পারে, ভার্জিনিয়ার আদালতে রডনি ট্রাভিস জুনিয়রের ১৫ বছরের কারাদণ্ড সেই কথাটিই নতুন করে মনে করিয়ে দিল।
তথ্যসূত্র:
Henrico Citizen, Sept. 23, 2026
American Veterinary Medical Association
The Washington Post







