সম্পাদকের পাতা

ফিনল্যান্ডের বরফঢাকা উত্তরে প্রবীণ মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করছেন শাহনাজ

নজরুল মিন্টো

ফিনল্যান্ডের একেবারে উত্তরে রোভানিয়েমি। শীতের দীর্ঘ মাসগুলোতে চারপাশ ঢেকে যায় বরফে। দিনের আলো কমে আসে, তাপমাত্রা নেমে যায় হিমাঙ্কের বহু নিচে। দূরের কোনো বাড়িতে হয়তো একা বসে আছেন আশি বছরের এক বৃদ্ধা। চিকিৎসাকেন্দ্র অনেক দূরে, বাসও খুব কম চলে, সন্তান কাজের প্রয়োজনে চলে গেছে দক্ষিণে। এই একাকীত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার।

এই বরফঢাকা উত্তরাঞ্চলেই বহু বছর ধরে প্রবীণ মানুষের জীবন নিয়ে কাজ করছেন বাংলাদেশের ড. শাহনাজ বেগম। তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছে আর্কটিক অঞ্চলের প্রবীণ মানুষ, আদিবাসী সামি জনগোষ্ঠীর বয়স্ক সদস্য এবং এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে ফিনল্যান্ডে আসা প্রবীণ অভিবাসীদের জীবন।

শাহনাজ বেগমের শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বাংলাদেশে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এলএলবি ও এলএলএম সম্পন্ন করেন। ১৯৯৬ সালের ৩০ অক্টোবর, ২৪ বছর বয়সে উচ্চশিক্ষার জন্য ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কিতে আসেন তিনি। পাঁচ মাস পর দেশে ফিরে গেলেও ফিনল্যান্ডের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হয়নি। ১৯৯৯ সালে আবার ফিরে আসেন। তখন তাঁর স্বামী হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছিলেন।

ফিনল্যান্ডে ফিরে শাহনাজের পড়াশোনার বিষয়ও বদলে যায়। আর্কাডা ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেসে তিনি ‘হিউম্যান এজিং অ্যান্ড এল্ডারলি সার্ভিস’ বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। আইন নিয়ে পড়াশোনা করা একজন তরুণীর আগ্রহ ধীরে ধীরে চলে যায় প্রবীণ মানুষের জীবন, সেবা ও অধিকারের দিকে। সেই পরিবর্তনই পরে তাঁর গবেষণাজীবনের পথ তৈরি করে।

আইনের শিক্ষা তাঁকে মানুষের অধিকার নিয়ে ভাবতে শিখিয়েছে। আর প্রবীণসেবা নিয়ে পড়াশোনা তাঁকে নিয়ে গেছে বার্ধক্যের বাস্তব জীবনের কাছে। মানুষ যখন বৃদ্ধ হয়, তখন তার মর্যাদা ও অধিকার কীভাবে রক্ষা করা যায়, এই প্রশ্নই একসময় তাঁর গবেষণার কেন্দ্রে চলে আসে।

ইউনিভার্সিটি অব ল্যাপল্যান্ডে তাঁর ডক্টরাল গবেষণার বিষয় ছিল নর্ডিক আর্কটিক অঞ্চলে বার্ধক্য ও লিঙ্গ। ২০১৯ সালের ১১ জানুয়ারি তিনি ডক্টরাল ডিগ্রি লাভ করেন। গবেষণার জন্য ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ফিনিশ ও সুইডিশ ল্যাপল্যান্ডের প্রবীণ মানুষের সাক্ষাৎকার নেন। জলবায়ু পরিবর্তন, জীবিকার ধরন বদলে যাওয়া, ভৌগোলিক দূরত্ব এবং প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা প্রবীণ মানুষের জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা ছিল তাঁর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বিশেষ করে আর্কটিক অঞ্চলের প্রবীণ নারীদের জীবন তাঁর গবেষণায় আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। বয়সের সঙ্গে দূরত্ব, আবহাওয়া, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক পরিবর্তন যুক্ত হলে তাঁদের দৈনন্দিন জীবন অনেক ক্ষেত্রে আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

আর্কটিকের আদিবাসী সামি জনগোষ্ঠীর জীবনও এসেছে তাঁর গবেষণায়। বহু প্রজন্ম ধরে রেইনডিয়ার পালন, মাছ ধরা, শিকার, হস্তশিল্প ও প্রকৃতিনির্ভর নানা পেশার সঙ্গে তাঁদের জীবন জড়িয়ে আছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে সেই পরিচিত জীবনও বদলাচ্ছে। এর প্রভাব প্রবীণ মানুষের চলাফেরা, জীবিকা এবং প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার সুযোগেও পড়ছে।

শাহনাজের গবেষণা অবশ্য আর্কটিকের স্থানীয় প্রবীণদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। একসময় তাঁর সামনে আসে ফিনল্যান্ডে বসবাসকারী প্রবীণ অভিবাসীদের জীবন। এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে আসা এসব মানুষের অনেকেই বয়স বাড়ার সঙ্গে নতুন ধরনের সমস্যার মুখে পড়েন।

ভাষা না জানলে চিকিৎসকের কাছে নিজের সমস্যার কথা বলা কঠিন। সরকারি সেবা ক্রমেই অনলাইনে চলে যাওয়ায় অনেক প্রবীণ সমস্যায় পড়তে পারেন। বৃদ্ধসেবা ব্যবস্থায় তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাস, খাবারের অভ্যাস ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজন কতটা গুরুত্ব পায়, সেটিও বড় প্রশ্ন। পরিচিত ভাষা, সমাজ ও আত্মীয়স্বজন থেকে বহু দূরে বার্ধক্যের জীবন তাঁদের জন্য আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

এই বিষয়গুলো নিয়েই শাহনাজ বেগম শুরু করেন ‘ফিনল্যান্ডে প্রবীণ অভিবাসীদের জন্য উপযোগী পরিবেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রকল্প। দেশটির সরকারি গবেষণা অর্থায়ন সংস্থা তাঁকে এই কাজের জন্য তিন বছরের পোস্টডক্টরাল অর্থায়ন দেয়। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পরিচালিত গবেষণায় ফিনল্যান্ডের পাঁচটি শহরে বসবাসকারী এশীয় ও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত প্রবীণ অভিবাসীদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ধক্য ও সেবাবিষয়ক গবেষণা কেন্দ্রও এতে সহযোগিতা করে।

শাহনাজের কাছে প্রবীণ মানুষের জন্য উপযোগী পরিবেশ মানে শুধু রাস্তায় র‌্যাম্প কিংবা বাসে আলাদা আসন নয়। একজন বয়স্ক মানুষ যেন প্রয়োজনীয় সেবা পান, নিজের কথা বলতে পারেন, সমাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন এবং নিজের সংস্কৃতি ও পরিচয় নিয়ে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারেন, সেটিই মূল কথা।

ফিনল্যান্ডের বৃদ্ধসেবায় কর্মরত অভিবাসী নারীদের অভিজ্ঞতা নিয়েও কাজ করেছেন শাহনাজ। বিশেষ করে মুসলিম নারী কেয়ারগিভারদের ধর্মীয় মূল্যবোধ, পোশাক, সংস্কৃতি এবং কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছে। অর্থাৎ তিনি শুধু সেবা গ্রহণকারী প্রবীণদের নয়, তাঁদের সেবা দেওয়া মানুষের জীবনও দেখেছেন কাছ থেকে।

তাঁর গবেষণার স্বীকৃতি এসেছে আন্তর্জাতিক প্রকাশনার মাধ্যমেও। নর্ডিক অঞ্চলের প্রবীণ মানুষের জীবন, দূরত্ব ও বৈষম্য নিয়ে Routledge থেকে ২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ের চার সম্পাদকের একজন শাহনাজ বেগম। বইটির মূল বক্তব্যও তাঁর দীর্ঘদিনের গবেষণার সঙ্গে মিলে যায়। একজন প্রবীণ মানুষের জীবনে দূরত্ব শুধু কিলোমিটারে মাপা যায় না। হাসপাতাল দূরে হতে পারে, সন্তান দূরে থাকতে পারে, প্রযুক্তি নাগালের বাইরে থাকতে পারে, আবার একই শহরে থেকেও একজন মানুষ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও তাঁর কাজ চলছে। চরম আবহাওয়া, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং উত্তরাঞ্চল থেকে তরুণদের অন্যত্র চলে যাওয়ার ফলে প্রবীণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব পড়ছে, সেটিও তাঁর গবেষণার বিষয়।

ঢাকা থেকে হেলসিঙ্কি, তারপর রোভানিয়েমির বরফঢাকা উত্তরাঞ্চল। শাহনাজ বেগমের পথটি শুধু একটি শিক্ষাজীবনের গল্প নয়। বিষয় বদলেছেন, নতুন করে পড়াশোনা করেছেন, তারপর এমন একটি ক্ষেত্র বেছে নিয়েছেন যেখানে মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মর্যাদা ও অধিকার কীভাবে রক্ষা করা যায়, সেই প্রশ্নটিকেই গবেষণার কেন্দ্রে এনেছেন।

কারণ শেষ বয়সে একজন মানুষের প্রয়োজন শুধু ওষুধ নয়। প্রয়োজন কাছের মানুষ, চলাচলের সুযোগ, নিজের ভাষায় কথা বলার অধিকার, প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা, পরিচিত সংস্কৃতির প্রতি সম্মান এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাঁর কথাটিও শোনা। রোভানিয়েমির বরফের ভেতর বসে বাংলাদেশের শাহনাজ বেগম মূলত সেই কথাটিই গবেষণার ভাষায় বলে চলেছেন।

তথ্যসূত্র:
University of Lapland
University of Helsinki

Back to top button
🌐 Read in Your Language