সম্পাদকের পাতা

বদমেজাজি কাস্টমার সাত বছর পর ওয়েট্রেসকে বকশিশ দিলেন ৫০ হাজার ডলার ও গাড়ি

নজরুল মিন্টো

রেস্টুরেন্টে এমন কিছু কাস্টমার থাকেন, যাঁদের টেবিলের দিকে খাবারের ট্রে হাতে এগিয়ে যাওয়ার আগে ওয়েটার-ওয়েট্রেসরা মনে মনে একটু প্রস্তুতি নিয়ে নেন। অর্ডারে ভুল চলবে না, খাবারের তাপমাত্রায় হেরফের চলবে না, সেবায় সামান্য দেরিও মেজাজ বিগড়ে দিতে পারে। টেক্সাসের একটি রেস্টুরেন্টে তেমনই একজন কাস্টমার ছিলেন ওয়াল্টার ‘বাক’ সোর্ডস। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে এলেও মেজাজটি ছিল বেশ টনটনে। খাবার চাইতেন এমন গরম, যেন প্লেট থেকে ধোঁয়ার বদলে আগুন বেরোলেও তাঁর আপত্তি নেই। কিছু মনমতো না হলেই অভিযোগ, কখনো রাগ, কখনো কর্মীদের উদ্দেশে কড়া কথা। অন্যরা যখন সুযোগ পেলেই তাঁর টেবিল এড়িয়ে চলতেন, তখনও একজন নারী হাসিমুখে সেখানে খাবার নিয়ে হাজির হতেন। তাঁর নাম মেলিনা সালাজার। সাত বছর ধরে একই মানুষটির রাগ, অভিযোগ আর খুঁতখুঁতে স্বভাব সামলাতে সামলাতে মেলিনা কল্পনাও করেননি, একদিন এই বদমেজাজি বৃদ্ধই তাঁকে জীবনের সবচেয়ে বড় বকশিশটি দেবেন। সেটিও রেস্টুরেন্টের টেবিলে নয়, নিজের উইলের পাতায়।

ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ব্রাউনসভিল শহরের লুবিস ক্যাফেটেরিয়ার। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ওয়াল্টার ‘বাক’ সোর্ডস। ঘটনার সময় তাঁর বয়স ছিল ৮৯ বছর। লুবিস ক্যাফেটেরিয়ার নিয়মিত কাস্টমার ছিলেন তিনি। তবে নিয়মিত আসতেন বলেই যে কর্মীদের প্রিয় মানুষ ছিলেন, মোটেও তা নয়। বরং সোর্ডস ছিলেন এমন একজন কাস্টমার, যাঁর টেবিলের দায়িত্ব নিতে অনেক কর্মীই চাইতেন না।

সোর্ডসের সবচেয়ে বড় খুঁতখুঁতে বিষয় ছিল খাবারের তাপমাত্রা। তাঁর খাবার শুধু গরম হলে চলত না, হতে হতো প্রচণ্ড গরম। এতটাই গরম যে অন্য কেউ হয়তো প্লেটে হাত দেওয়ার আগে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেন। কিন্তু সোর্ডস অপেক্ষা করার মানুষ ছিলেন না। মুখ পুড়ে যাওয়ার মতো গরম হলেও তাঁর আপত্তি ছিল না, বরং খাবার সামান্য ঠান্ডা হলেই আপত্তি উঠত। কোনো পদ পছন্দ না হলে অভিযোগ করতেন, সেবায় দেরি হলে মেজাজ চড়ত। কথাবার্তাও সব সময় মোলায়েম ছিল না। কখনো কর্মীদের সঙ্গে এমন রূঢ় আচরণ করতেন যে তাঁর টেবিলের দায়িত্ব নেওয়াই অনেকের কাছে বাড়তি ঝামেলা মনে হতো।

কিন্তু মেলিনা সালাজার তাঁকে এড়িয়ে যেতেন না। সোর্ডস যখনই আসতেন, তিনি তাঁর টেবিলে যেতেন। খাবার যথাসম্ভব তাঁর পছন্দমতো গরম করে দিতেন, অভিযোগ শুনতেন, রেগে গেলে পাল্টা রাগ দেখাতেন না। আগের দিনের খারাপ ব্যবহার পরের দিনের সেবায় এসে পড়তে দিতেন না। একজন ওয়েট্রেসের পেশাগত দায়িত্বের সঙ্গে তাঁর আচরণে মিশে ছিল অসাধারণ ধৈর্য। এভাবে একদিন, দুইদিন নয়, বছর গড়িয়ে প্রায় সাত বছর।

গল্পটির মজার জায়গা হলো, মেলিনা এমন কোনো উদার কাস্টমারকে সেবা করছিলেন না, যিনি প্রতিবার খাবার শেষে টেবিলে মোটা অঙ্কের বকশিশ রেখে যেতেন। সোর্ডস বকশিশ দেওয়ার ক্ষেত্রে মোটেও উদার ছিলেন না। তবু সাত বছর ধরে মেলিনার আচরণে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। বৃদ্ধ হয়তো রাগ করে বেরিয়ে গেছেন, কয়েক দিন পর আবার ফিরে এসে বসেছেন পরিচিত টেবিলে। আর মেলিনাও আগের মতোই খাবারের প্লেট নিয়ে তাঁর সামনে হাজির হয়েছেন।

২০০৭ সালের গ্রীষ্মে হঠাৎ একদিন দেখা গেল, সোর্ডস আর আসছেন না। প্রথমে বিষয়টি হয়তো কারও বিশেষ নজরে পড়েনি। নিয়মিত কোনো কাস্টমার মাঝেমধ্যে কয়েক দিন অনুপস্থিত থাকতেই পারেন। কিন্তু দিন যেতে থাকল, পরিচিত সেই বৃদ্ধের দেখা নেই। কিছুদিন পর স্থানীয় পত্রিকায় মৃত্যুসংবাদ দেখে মেলিনা জানতে পারলেন, জুলাই মাসে মারা গেছেন তাঁর দীর্ঘদিনের সেই কাস্টমার।

সাধারণত এখানেই একটি রেস্টুরেন্টের গল্প শেষ হয়ে যায়। মানুষ আসে, খায়, বিল দেয়, দরজা ঠেলে চলে যায়। কেউ আবার ফিরে আসে, কেউ আর কোনো দিন আসে না। মেলিনার ক্ষেত্রেও হয়তো তাই হওয়ার কথা ছিল। সাত বছরের পরিচিত একজন কাস্টমার মারা গেছেন, কিছুদিন তাঁর কথা মনে থাকবে, তারপর নতুন মানুষ আসবে, নতুন টেবিলে নতুন অর্ডার উঠবে। কিন্তু সোর্ডস গল্পটি সেভাবে শেষ হতে দেননি।

মৃত্যুর কয়েক মাস পর বড়দিন এগিয়ে আসছে। ঠিক সেই সময় মেলিনার কাছে এমন একটি খবর এল, যা প্রথমে তাঁর নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। ওয়াল্টার ‘বাক’ সোর্ডস মৃত্যুর আগে একটি উইল করে গেছেন এবং সেখানে রয়েছে মেলিনা সালাজারের নাম। তাঁর জন্য রেখে গেছেন ৫০ হাজার ডলার। শুধু নগদ অর্থই নয়, নিজের ২০০০ মডেলের একটি বিউইক গাড়িও দিয়ে গেছেন সেই ওয়েট্রেসকে, যিনি সাত বছর ধরে তাঁর জন্য গরম খাবার নিয়ে গেছেন, অভিযোগ শুনেছেন আর বদমেজাজ সামলেছেন।

খবরটি শুনে মেলিনা হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। টেক্সাসের KGBT-TV-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, ঘটনাটি তাঁর বিশ্বাসই হচ্ছিল না। তবে এত বড় উপহার পাওয়ার পরও তিনি মৃত কাস্টমারকে হঠাৎ করে ফেরেশতা বানিয়ে ফেলেননি। সোর্ডস যে রূঢ় ও বদমেজাজি মানুষ ছিলেন, তা অকপটেই বলেছেন। আর এখানেই গল্পটির আসল সৌন্দর্য। এটি নিখুঁত দুই মানুষের গল্প নয়। একজন ছিলেন খুঁতখুঁতে ও রাগী, অন্যজন ধৈর্যশীল। একজন অভিযোগ করতেন, অন্যজন শুনতেন। একজন কৃতজ্ঞতা মুখে প্রকাশ করেননি, অন্যজন তবু নিজের আচরণ বদলাননি।

মেলিনার জন্য সোর্ডসের মনে আলাদা কোনো জায়গা তৈরি হয়েছিল কি না, মৃত্যুর পর তাঁর উইলই যেন তার উত্তর দিয়ে গেল। বোঝা গেল, মেলিনার সাত বছরের ধৈর্য তাঁর চোখ এড়িয়ে যায়নি। অন্য কর্মীরা যে মানুষটির টেবিল নিতে চাইতেন না, সেই মানুষটির পছন্দ-অপছন্দ মনে রেখে মেলিনা দিনের পর দিন একইভাবে সেবা দিয়ে গেছেন। মুখে কোনো স্বীকৃতি না দিলেও সোর্ডস শেষ পর্যন্ত সেই সেবার মূল্য নিজের মতো করেই দিয়ে গেলেন।

মিডিয়ায় খবরটি প্রকাশের পর মেলিনা রীতিমতো সেলিব্রেটি হয়ে উঠলেন। সাত বছর ধরে এক বদমেজাজি কাস্টমারকে হাসিমুখে সামলে যাওয়া সেই ওয়েট্রেসকে নিয়ে মানুষের আগ্রহও বেড়ে যায়। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হলো, অন্য রেস্টুরেন্ট কর্মীদের জন্য তাঁর কোনো পরামর্শ আছে কি না। মেলিনার উত্তর কিন্তু ৫০ হাজার ডলারের গল্পের মতো চমকপ্রদ ছিল না। খুব সাধারণ করেই বলেছিলেন, মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে এবং ভালোভাবে আচরণ করতে হবে। আজ প্রায় দুই দশক পরও মেলিনার গল্পটি মানুষকে টানে। কারণ এই গল্পে শেষ পর্যন্ত ৫০ হাজার ডলার আর গাড়ির চেয়েও বড় হয়ে ওঠে সাত বছর ধরে জমে থাকা এক মানুষের প্রতি আরেক মানুষের আচরণের মূল্য।

মেলিনা জানতেন না তাঁর ধৈর্যের কোনো পুরস্কার অপেক্ষা করছে। সোর্ডসের টেবিলে খাবার রাখতে গিয়ে কোনো দিন ভাবেননি, আজকের ভালো ব্যবহারের প্রতিদান একদিন ফিরে আসবে। তিনি শুধু প্রতিদিন নিজের কাজটি করে গেছেন। আর সোর্ডসও জীবিত অবস্থায় মুখে বলেননি, সেই ব্যবহার তাঁর মনে দাগ কেটেছে। শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধ হিসাবটি মিটিয়েছেন নিজের ভঙ্গিতে। রেস্টুরেন্টের টেবিলে নয়, বিলের নিচে নয়, টিপসের বাক্সেও নয়, একেবারে উইলের পাতায়। সাত বছর ধরে বকশিশে উদার না হওয়া সেই বদমেজাজি কাস্টমার জীবনের শেষ বকশিশটিই দিয়ে গেলেন সবচেয়ে বড় করে, ৫০ হাজার ডলার আর একটি গাড়ি।

তথ্যসূত্র:
Associated Press | ABC13 Houston | KGBT-TV | 2007

Back to top button
🌐 Read in Your Language