এআইয়ের ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চীনা জাহাজে অভিযান চালাতে যাচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র

ওয়াশিংটন, ১৯ সেপ্টেম্বর- মার্কিন সামরিক বাহিনীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এআইয়ের সহায়তায় তৈরি একটি ভুল গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা একটি চীনা জাহাজে অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছিল মার্কিন সামরিক বাহিনী। তবে শেষ মুহূর্তে কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন, জাহাজটির পণ্য সম্পর্কে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য সঠিক ছিল না।
ঘটনাটি চলতি বছরের বসন্তে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সময় ঘটে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে ওই গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যে থাকা একটি চীনা জাহাজে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপাদান পরিবহন করা হচ্ছে।
বিষয়টি জানার পর মার্কিন সামরিক বাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নেয়। ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত চারটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, জাহাজটি আটকের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। দুটি সূত্র জানিয়েছে, সশস্ত্র মার্কিন সেনাসদস্যদের জাহাজটিতে ওঠার প্রস্তুতিও ছিল। একই সময়ে সামরিক বিমানও আকাশে উড়ছিল। কিন্তু অভিযান শুরুর ঠিক আগে কর্মকর্তারা গোয়েন্দা প্রতিবেদনটির উৎস ও তথ্য আরও গভীরভাবে যাচাই করেন। তখনই জানা যায়, প্রতিবেদনটি তৈরিতে এআই ব্যবহার করা হয়েছিল এবং একজন বিশ্লেষক যে চ্যাটবট ব্যবহার করেছিলেন, সেটি জাহাজে থাকা পণ্যকে ভুলভাবে শন উত্তেজনা বাড়িয়ে সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নিতে পারত। ফলে এআই-নির্ভর একটি ভুল তথ্য কতটা বড় সামরিক ও কূটনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, এই ঘটনাকে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছোক্ত করেছিল।
ঘটনার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র গোয়েন্দা প্রতিবেদনটিকে ‘পুরোপুরি মিথ্যা’ বলে বর্ণনা করেছে। ওই সূত্রের ভাষ্য, ভুল তথ্যের ভিত্তিতে মার্কিন বাহিনী চীনা জাহাজে অভিযান চালালে পরিস্থিতি ‘প্রায় যুদ্ধ শুরু করে দিতে পারত’।
কারণ, কোনো চীনা জাহাজের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান দুই পরাশক্তির মধ্যে দ্রুত উত্তেজনা বাড়িয়ে সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নিতে পারত। ফলে এআই-নির্ভর একটি ভুল তথ্য কতটা বড় সামরিক ও কূটনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, এই ঘটনাকে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাহাজটির প্রকৃত পণ্য কী ছিল, তা নির্ভুলভাবে জানা যায়নি। তবে এআই চ্যাটবট যে পণ্যকে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির উপাদান হিসেবে শনাক্ত করেছিল, সেটি আসলে তা ছিল না।
ঘটনার শুরু হয় মার্কিন স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডের একজন বিশ্লেষকের কাজ থেকে। তিনি হাওয়াইভিত্তিক ইউএস স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড প্যাসিফিক থেকে পাওয়া জাহাজের ম্যানিফেস্ট-সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে কাজ করছিলেন।
ওই তথ্যের সঙ্গে বিভিন্ন উন্মুক্ত উৎসের তথ্য এবং সরকারি ব্যবস্থায় থাকা গোপন সিগন্যাল গোয়েন্দা তথ্য মিলিয়ে তিনি একটি এআই চ্যাটবটকে প্রশ্ন করেন। কিন্তু চ্যাটবটটি এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে জাহাজটির পণ্য সম্পর্কে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।
এরপর ওই বিশ্লেষক আবার এআই ব্যবহার করে সেই ফলাফলকে একটি প্রচলিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কাঠামোয় সাজান। পরে প্রতিবেদনটি সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয়, বিশ্লেষকটি কোনো বাণিজ্যিক এআই চ্যাটবট ব্যবহার করেছিলেন, নাকি মার্কিন সরকারের নিজস্ব কোনো এআই ব্যবস্থা। তবে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিভিন্ন অংশে বর্তমানে একাধিক ধরনের এআই টুল ব্যবহার করা হচ্ছে।
চীনা জাহাজের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। সামরিক বিমান আকাশে ছিল এবং সশস্ত্র সদস্যরা জাহাজে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
ঠিক তখনই অভিজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কয়েকজন বিশ্লেষক মূল গোয়েন্দা তথ্য পরীক্ষা করে দেখেন। তারা বুঝতে পারেন, প্রতিবেদনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে মূল তথ্যের মিল নেই। এআই চ্যাটবট জাহাজের পণ্য সম্পর্কে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল, সেটি ছিল একটি ‘হ্যালুসিনেশন’—অর্থাৎ এআইয়ের তৈরি ভুল বা ভিত্তিহীন তথ্য। এরপরই পরিকল্পিত অভিযান বাতিল করা হয়।
সিএনএনের প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে এমন এক ‘ক্লোজ কল’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সম্ভাব্য বিপদ সামনে নিয়ে এসেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী বর্তমানে গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে সম্ভাব্য লক্ষ্য নির্বাচন, সামরিক সরঞ্জাম কোথায় মোতায়েন করা হবে তা নির্ধারণ, বাজেট ব্যবস্থাপনা, রসদ সরবরাহ ও লজিস্টিকস—প্রায় সব ক্ষেত্রেই এআই ব্যবহারের পরিধি বাড়াচ্ছে।
এর অন্যতম কারণ হলো দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। মার্কিন কর্মকর্তাদের যুক্তি, ভবিষ্যতে চীনসহ কোনো প্রতিপক্ষ যদি সামরিক ক্ষেত্রে এআই ব্যবহার করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে থাকতে পারে না। এ কারণেই মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর সামরিক ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের গতি বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ চলতি বছরের জানুয়ারিতে তাঁর দফতরের ‘আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যাকসেলারেশন স্ট্র্যাটেজি’ প্রকাশ করেন। এতে সামরিক বাহিনীতে এআই নিয়ে পরীক্ষামূলক কাজ বাড়ানো, আমলাতান্ত্রিক বাধা কমানো এবং বিপুলসংখ্যক সামরিক ও বেসামরিক কর্মীর হাতে এআই প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক সিএনএন সম্প্রচারেও হেগসেথের এআইকে সামরিক ব্যবস্থার আরও বিস্তৃত অংশে যুক্ত করার উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো, মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যবস্থায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিন্ন নীতিমালা বা যাচাইয়ের একক কাঠামো নেই বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিভিন্ন সামরিক শাখা, দফতর ও গোয়েন্দা ইউনিট নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা আলাদা এআই টুল ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে এসব টুলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সক্ষমতা ও তথ্য যাচাইয়ের পদ্ধতিতেও পার্থক্য রয়েছে।
ফলে কোনো এআই-নির্ভর বিশ্লেষণ সামরিক সিদ্ধান্তে ব্যবহারের আগে সেটি কীভাবে যাচাই করা হবে, সে বিষয়ে সর্বত্র একই ধরনের নিয়ম নেই।
সিএনএনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এই বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থায় একদিকে দ্রুত উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকিও বাড়ছে।
গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি সামরিক লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণেও এআই ব্যবহারের পরিধি বাড়ছে। আর এখানেই ঝুঁকিটা সবচেয়ে বেশি। কারণ, ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কোনো লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন করা হলে তার পরিণতি সরাসরি প্রাণহানি কিংবা সামরিক সংঘাতে গড়াতে পারে।
সামরিক নীতিমালার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু ‘মানব পর্যবেক্ষণ’ ব্যবস্থা থাকলেই কীভাবে বেসামরিক হতাহতের ঘটনা কিংবা নিজেদের বাহিনীর ওপর ভুল হামলা ঠেকানো যাবে, সে বিষয়ে এখনও সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই।
গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করছেন, এআইয়ের দ্রুত প্রসার বিশ্লেষকদের ওপর আরও দ্রুত তথ্য তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়ার চাপ তৈরি করছে। এতে ভুলের সুযোগও বাড়ছে।
বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের বিশ্লেষকেরা এআই টুল ব্যবহারে বেশি অভ্যস্ত হওয়ায় তাদের কেউ কেউ এসব ব্যবস্থার ফলাফল যথেষ্ট সমালোচনামূলকভাবে যাচাই না করেই গ্রহণ করতে পারেন বলে কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে।
একজন সূত্রের ভাষায়, “এআই আপনাকে দ্রুত একটি খারাপ ধারণায় পৌঁছে দিতে পারে।” চীনা জাহাজের ঘটনাটি সেই আশঙ্কার বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
এআই চ্যাটবটের ভুল বা ভিত্তিহীন তথ্য তৈরির প্রবণতাকে সাধারণভাবে ‘হ্যালুসিনেশন’ বলা হয়। এই ধরনের ঘটনা সরকারি ও গোয়েন্দা ব্যবস্থায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিচ্ছিন্ন নয় বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে।
সাধারণ ব্যবহারে এ ধরনের ভুল হয়তো একটি ভুল উত্তর বা ভুল তথ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। কিন্তু সামরিক গোয়েন্দা ব্যবস্থায় একই ধরনের ভুলের পরিণতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
বিশেষ করে যখন কোনো রাষ্ট্রীয় সামরিক বাহিনী সেই তথ্যের ভিত্তিতে অস্ত্র ব্যবহার, লক্ষ্যবস্তুতে হামলা কিংবা অন্য দেশের সামরিক সম্পদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তখন একটি ছোট ভুলও বড় ধরনের সংঘাত তৈরি করতে পারে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী এআই ব্যবহারের মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কমাতে চাইছে। কিন্তু চীনা জাহাজের ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে, সামরিক ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নির্ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যের প্রয়োজন রয়েছে।
কারণ, এআই যদি বিপুল পরিমাণ তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছায় এবং মানুষ সেই সিদ্ধান্ত যথেষ্ট যাচাই না করে গ্রহণ করে, তাহলে প্রযুক্তি সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়ালেও ভুলের গতিও বাড়িয়ে দিতে পারে।
এ কারণেই সামরিক ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের পাশাপাশি মানবিক যাচাই, স্বাধীন গোয়েন্দা মূল্যায়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে একাধিক স্তরে তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
চীনা জাহাজের ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত বড় কোনো সংঘাতে গড়ায়নি। কিন্তু অভিযান শুরুর এত কাছাকাছি গিয়ে ভুলটি ধরা পড়ায় প্রশ্ন উঠেছে—যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত এআই ব্যবহারের প্রতিযোগিতায় মানবিক যাচাইয়ের জায়গাটি কতটা শক্তিশালী রাখা হচ্ছে?
এস এম/ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬







