উত্তর আমেরিকা

ভারতের জামনগর তেল শোধনাগার পরিদর্শনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও

জামনগর তেল শোধনাগার

ওয়াশিংটন, ২৩ অক্টোবর- ভারতের গুজরাটের জামনগরে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম একক স্থানের তেল শোধনাগার পরিদর্শন করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।

ভারতের শীর্ষ ধনকুবের মুকেশ আম্বানির মালিকানাধীন রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের জামনগর শোধনাগার ঘিরে তাঁর এই সফর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্য, রাশিয়ার তেল এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ, ওয়াশিংটন এই তেল শোধনাগারকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে।

বুধবার রিলায়েন্সের এই বিশাল শিল্পাঞ্চল পরিদর্শন করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। জ্বালানি খাতে দুই দেশের বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখাই ছিল তাঁর এই সফরের মূল উদ্দেশ্য।

রুবিওর সঙ্গে ছিলেন ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর। রিলায়েন্সের কর্ণধার মুকেশ আম্বানি, অনন্ত আম্বানিসহ আম্বানি পরিবারের সদস্যরা তাঁদের স্বাগত জানান।

মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর জানিয়েছেন, গত এক বছরে ভারতের মোট এলপিজি আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ১০ শতাংশেরও কম থেকে বেড়ে ৬৭ শতাংশ হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে রিলায়েন্সের প্রস্তাবিত নতুন তেল শোধনাগার প্রকল্পও দুই দেশের সহযোগিতার আরেকটি ক্ষেত্র। প্রকল্পটি চালু হলে প্রায় পাঁচ দশক পর যুক্তরাষ্ট্রে নতুন একটি বড় তেল শোধনাগার তৈরি হবে।

জামনগরে গিয়ে রুবিও রিলায়েন্সের বন্যপ্রাণী উদ্ধারকেন্দ্র ভান্তারা এবং প্রতিষ্ঠানটির নতুন জ্বালানি উৎপাদনকেন্দ্রও ঘুরে দেখেন। সেখানে সৌরশক্তি, ব্যাটারি সংরক্ষণ এবং অন্যান্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে।

জামনগর শোধনাগার কেন গুরুত্বপূর্ণ?

রিলায়েন্সের জামনগর শোধনাগার কমপ্লেক্সে প্রতিদিন ১৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রয়েছে। এটি বিশ্বের মোট তেল পরিশোধন সক্ষমতার প্রায় দেড় শতাংশ। ১৯৯৯ সালে চালু হওয়া প্রথম শোধনাগারটির দৈনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা ৬ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল। ২০০৮ সালে চালু হওয়া দ্বিতীয় শোধনাগারটি মূলত রপ্তানির জন্য ব্যবহৃত হয়।

এই শোধনাগারে ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করা যায়। রিলায়েন্সের দাবি, এখন পর্যন্ত এখানে ২১৬টিরও বেশি ধরনের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে।

বিশ্ববাজারে ডিজেল, পেট্রল ও উড়োজাহাজের জ্বালানি সরবরাহে এই শোধনাগারের বড় ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ডিজেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাতের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়েও রিলায়েন্সের সঙ্গে রুবিওর আলোচনা করার কথা রয়েছে।

বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের অনুমান অনুযায়ী, অক্টোবরে জামনগরে ভেনেজুয়েলার তেল আমদানির পরিমাণ দৈনিক প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে।

রাশিয়ার তেল নিয়ে ওয়াশিংটনের হিসাব

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর ভারত রুশ তেলের অন্যতম বড় ক্রেতায় পরিণত হয়। চীনের পর রাশিয়ার তেলের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা ভারত। রিলায়েন্সও রাশিয়া থেকে তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছিল। ২০২২ সালের আগে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবহৃত তেলের মাত্র ৩ শতাংশ রাশিয়া থেকে আসত। ২০২৫ সালে তা বেড়ে প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছায়।

রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার কারণে ২০২৫ সালের আগস্টে ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর প্রভাব রিলায়েন্সের ওপরও পড়ে। পরে প্রতিষ্ঠানটি রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমালেও ২০২৬ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে জামনগরে প্রক্রিয়াজাত করা তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রাশিয়া থেকে এসেছিল।

রুবিও বলেছেন, ভারত জ্বালানি আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনছে। তবে একদিনের মধ্যে রাশিয়ার তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো কঠিন। তিনি ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রেও বিনিয়োগ করছে আম্বানির প্রতিষ্ঠান

রিলায়েন্স যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ব্রাউনসভিল বন্দরে নতুন একটি তেল শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। প্রায় ৩০০ কোটি থেকে ৪০০ কোটি ডলারের এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পাঁচ দশকের মধ্যে এটি হবে যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত অন্যতম বড় নতুন তেল শোধনাগার। ২০২৯ সালের দিকে সেখানে উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে।

রুবিওর সফরের সময় এই বিনিয়োগও ওয়াশিংটনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার তেল বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী, অন্যদিকে নিজেদের জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে চায়।

তবে মুকেশ আম্বানির সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইলন মাস্কের বিরোধের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ভারতে স্টারলিংকের কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতার মধ্যে মাস্ক অভিযোগ করেছেন, আম্বানির জিওকে সুবিধা দিতে স্টারলিংকের প্রবেশ বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। তবে রিলায়েন্সের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা কখনোই প্রতিযোগিতাকে ভয় পায়নি।

সব মিলিয়ে, রুবিওর জামনগর সফর শুধু একটি তেল শোধনাগার পরিদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাশিয়ার তেল, ভেনেজুয়েলার তেল সরবরাহ, যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম এবং ভারত-মার্কিন বাণিজ্যিক সম্পর্ক—সবকিছুই এই সফরকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

এস এম/ ২৩ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language