মধ্যপ্রাচ্য

হরমুজ সংকটে সুপারট্যাঙ্কার কেনার হিড়িক, ২৫ বছরের রেকর্ড

সুপারট্যাঙ্কার

তেহরান,১৭ সেপ্টেম্বর- যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা এড়াতে সমুদ্রপথে বাণিজ্য রুট পরিবর্তিত হচ্ছে এবং দূরপাল্লার পথে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের চাহিদা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে চলতি বছরে বিপুল সংখ্যক সুপারট্যাঙ্কার কেনার আদেশ দিয়েছেন জাহাজ মালিকরা।

২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের এই বিপুল কেনাকাটা অন্তত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এই প্রবণতা থেকে বোঝা যাচ্ছে, ক্রেতারা মধ্যপ্রাচ্যের উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে আটলান্টিক অঞ্চল থেকে দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিয়ে তেল পরিবহনের বিষয়টি ক্রমেই গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার প্রক্রিয়া চললেও দীর্ঘ দূরত্বের তেল বাণিজ্য অব্যাহত থাকবে, জাহাজ মালিকদের মধ্যে এমন প্রত্যাশাও এর মাধ্যমে প্রতিফলিত হচ্ছে।

শিপিং অ্যানালিটিক্স বা বিশ্লেষণধর্মী প্রতিষ্ঠান ‘ভেসন নটিক্যাল’-এর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক রেবেকা গালানোপুলোস বলেন, আমরা মনে করি আটলান্টিক থেকে এশিয়ায় দীর্ঘ দূরত্বের তেল পরিবহন বাড়ার ওপর বাজি ধরা জাহাজ মালিকরাই ভিএলসিসি বা বিশাল আকৃতির অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাঙ্কারের নতুন করে চাহিদা তৈরির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছেন।

হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রভাব বিশ্বজুড়ে

এশিয়া ও ইউরোপের তেল শোধনাগারগুলোকে এখন গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ দিয়ে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার কারণে তৈরি হওয়া ঘাটতি পূরণে বিকল্প উৎসের সন্ধান করতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং আটলান্টিক অঞ্চলের অন্যান্য সরবরাহকারী দেশগুলোও উৎপাদন বাড়াচ্ছে।

ডেটা ইন্টেলিজেন্স বা তথ্য-বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘ভর্টেক্সা’-র বিশ্লেষক আইওনিস পাপাদিমিত্রু জানান, দক্ষিণ আমেরিকার পূর্ব উপকূলের দেশগুলো, বিশেষ করে ব্রাজিল, গায়ানা ও আর্জেন্টিনা রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকে আরও বাড়াবে। তিনি বলেন, ২০৩০ সাল নাগাদ এই অঞ্চলে দৈনিক তেল উৎপাদন প্রায় ২৫ লাখ ব্যারেল বাড়তে পারে। এই তেল মূলত ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারের চাহিদা মেটাবে এবং দীর্ঘ দূরত্বের বাণিজ্যের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে। তিনি উল্লেখ করেন, বড় আকারের জাহাজে করে দীর্ঘ দূরত্বের বাণিজ্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে তেল পরিবহন করে ওমান উপসাগরে অপেক্ষমাণ আরও বড় ট্যাঙ্কারে তা স্থানান্তর বা ‘রিলোড’ করার প্রয়োজনীয়তাও ভিএলসিসি এবং অপেক্ষাকৃত ছোট ‘সুয়েজম্যাক্স’ ট্যাঙ্কারের চাহিদা বাড়াচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারীরা দেখছেন, জাহাজ মালিকরা হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের সময় ইরানি হামলার ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক। তাই তারা বাড়ার প্রত্যাশাও ক্রমেই বাড়ছে।

পারস্য উপসাগর থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে তেল পরিবহন করে ওমান উপসাগরে অপেক্ষমাণ আরও বড় ট্যাঙ্কারে তা স্থানান্তর বা ‘রিলোড’ করার প্রয়োজনীয়তাও ভিএলসিসি এবং অপেক্ষাকৃত ছোট ‘সুয়েজম্যাক্স’ ট্যাঙ্কারের চাহিদা বাড়াচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারীরা দেখছেন, জাহাজ মালিকরা হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের সময় ইরানি হামলার ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক। তাই তারা নিজেরাই নিজস্ব জাহাজ সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সৌদি আরবের যে পাইপলাইন দিয়ে তেল পশ্চিমে লোহিত সাগরের দিকে নেওয়া হতো, সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটিকে এই প্রক্রিয়ায় অনেক বড় পরিসরে অন্তত সাময়িকভাবে অংশ নিতে হবে। নরওয়েতে আয়োজিত এক সম্মেলনে এ কথা বলেছেন ট্যাঙ্কার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘ফ্রন্টলাইন’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) লার্স বারস্টাড।

ড্রোন হামলার মাধ্যমে পাইপলাইনটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে বৃহত্তম ট্যাঙ্কারগুলোর মাধ্যমে তেল পরিবহনের খরচ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ‘অ্যালাইড শিপব্রোকিং’-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে ফেব্রুয়ারিতে যেখানে ভিএলসিসির স্পট রেট বা তাৎক্ষণিক ভাড়ার হার ছিল দৈনিক প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার ডলার, তা সম্প্রতি বেড়ে ৫ লাখ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল অন্যত্র স্থানান্তরের জন্য ছোট বা মাঝারি জাহাজে করে তা বাইরে নিয়ে আসার প্রক্রিয়ায় জাহাজগুলো দীর্ঘ সময় আটকে থাকে এবং অপেক্ষার সময় বেড়ে যায়। এতে জাহাজের চাহিদা আরও বাড়ছে।

চাহিদা এতটাই বেশি যে সম্মেলনটির আয়োজক ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ‘প্যারেটো সিকিউরিটিজ’-এর হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে একটি নতুন তেলবাহী ট্যাঙ্কারের অর্ডার দেওয়ার চেয়ে ১০ বছরের পুরনো ট্যাঙ্কার কেনা বেশি ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।

‘অ্যালাইড শিপব্রোকিং’-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি ভিএলসিসি নির্মাণে খরচ হয় প্রায় ১৩ কোটি (১৩০ মিলিয়ন) ডলার। নতুন জাহাজ কেনার এই হিড়িক শুধু ভবিষ্যতের তেল সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। ‘ভেসন নটিক্যাল’-এর তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের সংকট ও অতিরিক্ত সরবরাহের পর এখন বহর নবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ বিদ্যমান ভিএলসিসি বহরের প্রায় ২০ শতাংশ জাহাজের বয়সই ২০ বছরের বেশি।

‘অ্যালাইড শিপব্রোকিং’-এর ফ্রেইট মার্কেট বিশ্লেষক পাভলোস ফাকিনোস জানান, সাম্প্রতিক চুক্তিগুলোর মধ্যে এমন জাহাজও রয়েছে, যেগুলো ২০২৯ ও ২০৩০ সালে হস্তান্তর করা হবে। এটি ইঙ্গিত দেয়, জাহাজ মালিকরা নিশ্চিত হয়েছেন যে মাঝারি মেয়াদেও এই চাহিদা বজায় থাকবে।

ডেটা ইন্টেলিজেন্স ফার্ম ‘কেপলার’-এর তথ্য অনুযায়ী, পুরনো ভিএলসিসিগুলোকে ভাঙার বা স্ক্র্যাপ করার পরিবর্তে ক্রেতারা কিনে নিচ্ছেন। এগুলো মূলত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা গোপন জাহাজ বহরের অংশ হয়ে উঠছে, যা পশ্চিমা মূলধারার শিপিং ও বিমা ব্যবস্থার বাইরে থেকে রাশিয়া, ইরান ও ভেনেজুয়েলার মতো দেশের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন তেল পরিবহনে ব্যবহৃত হয়।

শিপিং অ্যানালিটিক্স প্ল্যাটফর্ম ‘সিগন্যাল গ্রুপ’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর যেখানে ৯৩টি ‘ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার’-এর আদেশ দেওয়া হয়েছিল, সেখানে ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ২১৭টি জাহাজের আদেশ দেওয়া হয়েছে। ‘অ্যালাইড শিপব্রোকিং’-এর হিসাবে এই সংখ্যা ৮৩ থেকে বেড়ে ১৬৪-তে দাঁড়িয়েছে। উল্লেখ্য, বিশাল আকৃতির অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলো একটি জাহাজে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করতে সক্ষম।

এস এম/ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

Back to top button
🌐 Read in Your Language