
কানাডার ইতিহাসে এই প্রথম টরন্টোয় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে Canada Investment Summit। আগামী সোমবার ও মঙ্গলবারের এ আয়োজন কোনো সাধারণ ব্যবসায়িক সম্মেলন নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৩০০ জন অতিথি ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী যোগ দিচ্ছেন এতে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বড় পেনশন ফান্ড, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল, বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো তহবিল ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। এসব প্রতিষ্ঠান সব মিলিয়ে প্রায় ১২০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্পদ পরিচালনা করে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে কানাডাকে নতুন করে তুলে ধরার বড় মঞ্চ হতে যাচ্ছে এই সম্মেলন। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সেখানে শুধু বিনিয়োগ আহ্বান করবেন না, বিশ্বের প্রভাবশালী বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরবেন কানাডার নিজস্ব শক্তি, সম্পদ ও সক্ষমতা। জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, অবকাঠামো থেকে দক্ষ জনশক্তি, সব মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য কানাডা যে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেই বার্তাই থাকবে আয়োজনের কেন্দ্রে।
আন্তর্জাতিক মহলে সম্মেলনটি নিয়ে আগ্রহও উল্লেখযোগ্য। শুরুতে প্রায় ১০০ জনকে আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা থাকলেও পরে অতিথি তালিকা প্রায় তিনগুণ হয়েছে। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত বিশ্বের নানা দেশে শিল্প, অবকাঠামো, খনি, জ্বালানি ও প্রযুক্তি প্রকল্পের গতিপথে প্রভাব ফেলে। ফলে টরন্টোর দুই দিনের এই সমাবেশ কানাডার জন্য বড় অঙ্কের আন্তর্জাতিক মূলধন আকর্ষণের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
টরন্টোর সম্মেলনে বিশ্বের বড় বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে ১৬০টির বেশি প্রকল্পের প্রস্তাব। জ্বালানি, খনিজ, বন্দর, পরিবহন ও অবকাঠামো থেকে ডেটা সেন্টার, প্রতিরক্ষা, পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি ও উন্নত উৎপাদন পর্যন্ত বিস্তৃত এই তালিকা দেখায়, কানাডার বিনিয়োগ সম্ভাবনা কতটা বৈচিত্র্যময়। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে দেশটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত, সেই আস্থাই তৈরি করতে চাইছে অটোয়া।
এর মধ্যে ১৫টি প্রকল্প এমন পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত তুলনামূলক দ্রুত নেওয়া সম্ভব। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার উত্তরাঞ্চলের Ksi Lisims LNG প্রকল্প তার একটি। আবার বেশ কিছু প্রকল্প এখনও উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে। ফলে সম্মেলনে একদিকে যেমন এখনই বিনিয়োগের সুযোগ থাকবে, অন্যদিকে আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের বড় প্রকল্পগুলোর সঙ্গেও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগেভাগে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।
কানাডার শক্তির তালিকাটিও দীর্ঘ। দেশটির রয়েছে বিপুল জ্বালানি সম্পদ, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, ইউরেনিয়াম, পানি ও কৃষিসম্পদ। উন্নত উৎপাদন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা শিল্পেও নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আইনের শাসন।
সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কোয়ান্টাম প্রযুক্তির আলাদা গুরুত্ব থাকছে। Cohere-এর প্রধান নির্বাহী Aidan Gomez এবং Xanadu Quantum Technologies-এর Christian Weedbrook-এর মতো উদ্যোক্তারা অংশ নিচ্ছেন। তাঁদের উপস্থিতি কানাডার আরেকটি দিক সামনে আনবে। দেশটি শুধু প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর দাঁড়িয়ে নেই, আগামী দিনের প্রযুক্তি তৈরির ক্ষেত্রেও তার নিজস্ব ভিত্তি রয়েছে।
তবে বড় পুঁজি আকর্ষণের জন্য সম্ভাবনা দেখানোই যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা জানতে চান একটি প্রকল্প কত দ্রুত অনুমোদন পাবে, বিভিন্ন স্তরের সরকারের মধ্যে একই কাজের পুনরাবৃত্তি কতটা কমানো হয়েছে, প্রদেশগুলোর মধ্যে ব্যবসার বাধা কতটা সরেছে এবং দীর্ঘমেয়াদে নীতির ধারাবাহিকতা থাকবে কি না।
অটোয়া এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছে। বড় প্রকল্পের অনুমোদনের সময় কমানো, কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে প্রশাসনিক পুনরাবৃত্তি কমানো এবং আন্তঃপ্রাদেশিক বাণিজ্যের বাধা সরানোর কাজ চলছে। সম্মেলনে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের পাশাপাশি অধিকাংশ প্রাদেশিক প্রিমিয়ারের উপস্থিতির কথা রয়েছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামনে কানাডা একটি সমন্বিত অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে।
আরেকটি বিষয়ও নজর কাড়ছে। সম্মেলনের শেষ দিকে বক্তা হিসেবে থাকবেন সাবেক কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপার, যিনি এখন Alberta Investment Management Corporation-এর চেয়ারম্যান। কার্নি সরকারের এই বিনিয়োগ সম্মেলনে সাবেক কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে। অর্থনীতি ও বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কানাডা যে দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতা দেখাতে চায়, তার একটি প্রতীক হিসেবেও এটি দেখা যায়। বড় বিনিয়োগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো, সরকার বদলালেও মৌলিক অর্থনৈতিক লক্ষ্য যেন বদলে না যায়।
মার্ক কার্নির পেশাগত অভিজ্ঞতাও কানাডার জন্য বাড়তি সুবিধা। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি Bank of Canada ও Bank of England-এর গভর্নর ছিলেন। পরে Brookfield Asset Management-এ কাজ করেছেন এবং বহু বিলিয়ন ডলারের তহবিল সংগ্রহে যুক্ত ছিলেন। ওয়াল স্ট্রিট থেকে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবার সেই অভিজ্ঞতাকে কানাডার অর্থনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগানোর সুযোগ এসেছে।
সম্মেলন থেকে কতটি চুক্তি সঙ্গে সঙ্গে ঘোষণা হবে, সেটিই অবশ্য একমাত্র মাপকাঠি নয়। বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত সাধারণত দীর্ঘ যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে আসে। প্রকল্পের আয়, ঝুঁকি, সরবরাহ ব্যবস্থা, ক্রেতা, অনুমোদন ও অর্থায়নের কাঠামো সবকিছু মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগে। কিন্তু প্রথম কাজ হলো বিনিয়োগকারীর নজরে আসা এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় কানাডার জন্য আলাদা জায়গা তৈরি করা।
এই জায়গাতেই TD Bank-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ব্যাংকটি মনে করছে, বড় প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন, কর ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা বাড়ানো, দ্রুত বেড়ে ওঠা কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় হতে সহায়তা করা এবং দক্ষ কর্মীর সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে কানাডায় একটি “investment supercycle” শুরু হতে পারে।
TD Bank-এর সবচেয়ে আশাবাদী হিসাবে আগামী দশকে কানাডায় বিনিয়োগের পরিমাণ ১.৫ থেকে ১.৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এটি একটি পূর্বাভাস, তবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ কানাডার বিনিয়োগ সম্ভাবনা এখন আর শুধু সরকারের বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই, দেশের বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সুযোগ দেখতে পাচ্ছে।
টরন্টোর সম্মেলনের পর কার্নির পরবর্তী বড় মঞ্চ হবে ইউরোপ। ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে তাঁর সফর এমন সময়ে হচ্ছে, যখন কানাডা ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও গভীর করতে চাইছে। একই সপ্তাহে তাই বিশ্বমঞ্চে কানাডার দুটি দিক সামনে আসবে। টরন্টোয় অর্থনীতি ও বিনিয়োগ, স্ট্রাসবুর্গে বাণিজ্য ও কূটনীতি।
তথ্যসূত্র:
Government of Canada
The Globe and Mail
Toronto Star







