তারেক রহমানের ভারত সফর না যাওয়ার পর আদানির বিদ্যুৎ কমায় উঠছে প্রশ্ন

গত ১০ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নিচ্ছেন না। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওই আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন বলেও ঢাকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এর পরদিনই গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটির উৎপাদন ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে। একই সময়ে বাংলাদেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ও লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আদানির পক্ষ থেকে অবশ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে রাজনৈতিক কোনো বিষয় উল্লেখ করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, এর আগে রেলওয়ে নেটওয়ার্কে চাপ, লোডিং বিধিনিষেধ ও কয়লা পরিবহনে বিঘ্নের কারণে গোড্ডা কেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহ কমে গিয়েছিল। পরে একটি ইউনিটে বয়লার-সংক্রান্ত ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সেটি বন্ধ করতে হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ত্রুটিপূর্ণ ইউনিটটি পুনরায় চালু করতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। ফলে আদানি পাওয়ারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে জ্বালানি সরবরাহ ও কারিগরি সমস্যাই প্রধান কারণ।
আগে থেকেই চাপে ছিল বিদ্যুৎব্যবস্থা
আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার আগেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত চাপে ছিল। গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকটের কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছিল না। ফলে গোড্ডা কেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের ঘাটতি আরও বেড়ে যায়।
১১ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি থাকলেও উৎপাদন ছিল প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে। ফলে বড় ধরনের লোডশেডিং তৈরি হয়।
২০১৭ সালের চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন
আদানি পাওয়ারের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ২০১৭ সালে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা হয়। কেন্দ্রটির দুটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদন সক্ষমতা ৮০০ মেগাওয়াট।
এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ কিনছে। ফলে সরবরাহ ব্যাহত হলে চুক্তি অনুযায়ী আদানি পাওয়ারের দায় কতটা এবং বাংলাদেশ কী ধরনের প্রতিকার বা ক্ষতিপূরণ পেতে পারে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ক্ষেত্রে চুক্তির নির্দিষ্ট শর্ত, সরবরাহের নিশ্চয়তা, জ্বালানি সংগ্রহের দায় এবং সরবরাহ ব্যাহত হলে ক্ষতিপূরণের বিধান পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক সময়ের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকটের মিল
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছিল। সফরের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’-এর প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছিল বাংলাদেশ। শেষ পর্যন্ত ১০ সেপ্টেম্বর তার ভারত সফরে না যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পরদিনই আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার ঘটনা সামনে আসে।
ঘটনার এই সময়গত নৈকট্য থেকেই রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে সন্দেহ ও প্রমাণ এক বিষয় নয়। এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য নথি বা নির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, ভারত সরকার বা আদানি পাওয়ার রাজনৈতিক কারণে ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করেছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ কি চাপ তৈরির হাতিয়ার?
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা থাকায় আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন জাতীয় গ্রিডে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে একটি বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করছে কি না, সে প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে।
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা এর আগে আদানি বিদ্যুৎচুক্তির বিভিন্ন শর্ত নিয়ে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে চুক্তিতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার মতো পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশের কী ধরনের সুরক্ষা রাখা হয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠছে।
তবে একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হওয়া এবং সেটিকে রাজনৈতিক চাপের অংশ হিসেবে দেখার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে কেন্দ্রটির কারিগরি প্রতিবেদন, কয়লা সরবরাহের তথ্য, উৎপাদন ডেটা এবং বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির শর্ত যাচাই করা প্রয়োজন।
সামনে যেসব প্রশ্ন
বর্তমান পরিস্থিতিতে আদানি পাওয়ার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি। ইউনিটটির সুনির্দিষ্ট ত্রুটি কী ছিল, মেরামত কত দ্রুত শুরু হয়েছে, ইউনিটটি কবে পূর্ণ উৎপাদনে ফিরবে এবং কয়লা সরবরাহে বিঘ্নের কারণ কী—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সরবরাহ কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের অধিকার ও প্রতিকার কী, সেটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা এখনো প্রমাণিত নয়। তাই বিষয়টি রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে নয়, বরং চুক্তির নথি, উৎপাদন ও সরবরাহের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করাই হবে সবচেয়ে যুক্তিসংগত।
বিদ্যুৎ একটি মৌলিক জাতীয় অবকাঠামো। এটি যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার না হয়—এমন নিশ্চয়তা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রমাণ ছাড়া কোনো কারিগরি সমস্যাকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করাও এড়িয়ে চলা জরুরি।
এস এম/ ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬







