পাকিস্তান ক্রিকেটের অধঃপতনের জন্য ইমরান খানের ঘরোয়া কাঠামোকে দায়ী করলেন হারুন রশিদ

ইসলামাবাদ,১২ সেপ্টেম্বর- বেশ কয়েক বছর ধরে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান ক্রিকেট। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপসহ আইসিসির সর্বশেষ চারটি টুর্নামেন্টের কোনোটিতেই দলটি সেমিফাইনালে উঠতে পারেনি। এর মধ্যে ইংল্যান্ডের মাটিতে টেস্টে টানা পরাজয়ের পর দেশটির ক্রিকেট পরিচালনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সাবেক প্রধান নির্বাচক ও প্রধান কোচ হারুন রশিদ দলের এই অধঃপতনের জন্য কারাবন্দী ইমরান খানের আমলে ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোয় আনা বড় ধরনের পরিবর্তনকে দায়ী করেছেন। ১৯৯২ সালে পাকিস্তানকে একমাত্র ওয়ানডে বিশ্বকাপ শিরোপা জেতানো দলের অধিনায়ক ছিলেন ইমরান খান। ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ইমরান অস্ট্রেলিয়ার মডেল অনুসরণ করে পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের নির্দেশ দেন। এর অংশ হিসেবে প্রথম শ্রেণির দলের সংখ্যা কমিয়ে ছয়টিতে নামিয়ে আনা হয়। ইমরানের শাসনামলে ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামো পর্যালোচনার জন্য গঠিত টাস্ক ফোর্সের সদস্য ছিলেন হারুন। তিনি জানান, ওই টাস্ক ফোর্সের প্রস্তাব করা একটি ‘হাইব্রিড মডেল’ ইমরান প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
‘স্ম্যাশ ইট’ স্পোর্টস চ্যানেলের একটি পডকাস্টে হারুন বলেন, তিনি ক্রিকেট বোর্ড ও টাস্ক ফোর্সের অংশ ছিলেন। তার মনে আছে, ইমরানের সঙ্গে বৈঠকের সময় ঘরোয়া ক্রিকেটের জন্য একটি হাইব্রিড মডেল প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু ইমরান সেটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে দেন।
হারুন ২০২০ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডে প্রধান নির্বাচক, প্রধান কোচ, হাই-পারফরম্যান্স ও ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান এবং টিম ম্যানেজারসহ বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন। তার মতে, টাস্ক ফোর্সের পরামর্শ ছিল বিভাগীয় দলগুলোকে বহাল রেখে ধীরে ধীরে ঘরোয়া দলের সংখ্যা কমিয়ে আনা।
সাবেক এই নির্বাচক বলেন, একজন প্রধানমন্ত্রী কতটা সময় দিতে পারেন, সেটি বিবেচনায় নিয়েই তাদের ঘরোয়া ক্রিকেটের একটি সংশোধিত পরিকল্পনা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তারা সেই পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন এবং সেটি ছিল একটি ‘হাইব্রিড’ বা মিশ্র পদ্ধতির পরিকল্পনা। হারুন জানান, ইমরান ঘরোয়া ক্রিকেটে দলের সংখ্যা মাত্র পাঁচ থেকে ছয়টির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছিলেন।
হারুন জানান, টাস্ক ফোর্স শুরুতে আটটি দল নিয়ে একটি কাঠামোর প্রস্তাব করেছিল। এতে বিভাগীয় দলগুলোরও ঘরোয়া ক্রিকেটে অংশ নেওয়ার সুযোগ রাখার কথা ছিল। তবে ইমরান দলের সংখ্যা আরও কমিয়ে আনতে চেয়েছিলেন বলে জানান তিনি।
হারুন বলেন, তারা ইমরানকে জানিয়েছিলেন, পাকিস্তানের ক্রিকেটের জন্য ‘হাইব্রিড’ মডেলটিই সবচেয়ে উপযুক্ত। কারণ এতে দলের সংখ্যা কমিয়ে আটটিতে আনা হলেও ঘরোয়া ক্রিকেটে বিভাগীয় দলগুলোর অংশগ্রহণ বজায় থাকত।
তবে তাদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত এক বৈঠকে ইমরান সেই হাইব্রিড মডেল প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি আটটি নয়, বরং ঘরোয়া কাঠামোয় সর্বোচ্চ পাঁচ থেকে ছয়টি দল দেখতে চেয়েছিলেন। হারুনরা তাকে বলেছিলেন, নতুন ঘরোয়া কাঠামোয় ধাপে ধাপে পরিবর্তন আনা ভালো হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তই মেনে নিতে হয়েছিল। হারুনের মতে, ইমরানের উদ্দেশ্য হয়তো ভালো ছিল, কিন্তু পাকিস্তানের ক্রিকেটের জন্য সেই সিদ্ধান্ত ফলপ্রসূ হয়নি।
২০২২ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারিত হওয়ার পর ইমরান বর্তমানে একাধিক মামলার মুখোমুখি হয়ে আদিয়ালা জেলে বন্দী রয়েছেন। জাতীয় দলের ধারাবাহিকতাহীন পারফরম্যান্সের কারণে পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের বিষয় হয়ে আছে। সম্প্রতি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম দুটি টেস্টে শোচনীয় পরাজয়ের পর পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড সাতজন খেলোয়াড়কে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরত পাঠায়। এ প্রসঙ্গে হারুন ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোর সঙ্গে পাকিস্তানের কাঠামোর তুলনা করেন।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারত কেন শক্তিশালী একটি দলে পরিণত হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হারুন দেশটির ঘরোয়া ক্রিকেট ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেন। তার মতে, ভারতীয় ক্রিকেটের সাফল্যের পুরো কৃতিত্ব শুধু আইপিএলকে দেওয়া ঠিক নয়। দেশটির ঐতিহ্যবাহী ঘরোয়া টুর্নামেন্টগুলোও ক্রিকেটের জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে।
হারুন বলেন, মানুষ আইপিএল নিয়ে কথা বলে, কিন্তু ভারতে এখনো রঞ্জি ট্রফি, দুলীপ ট্রফি, মুশতাক আলী ট্রফি ও বিজয় হাজারে ট্রফির মতো টুর্নামেন্ট রয়েছে। পাশাপাশি দেশটির রাজ্যভিত্তিক অ্যাসোসিয়েশনগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং ক্লাব পর্যায়েও তাদের নিজস্ব নিয়মিত ঘরোয়া টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়।
পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক এই কর্মকর্তার মতে, পাকিস্তানের উচিত অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে এসে আঞ্চলিক অ্যাসোসিয়েশন ও বিভাগগুলোকে আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন দেওয়া। তিনি বলেন, বর্তমানে পাকিস্তানে সব ক্ষমতা পিসিবির হাতে কেন্দ্রীভূত। অথচ অতীতের মতো ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করে আঞ্চলিক অ্যাসোসিয়েশন ও বিভাগগুলোকে আরও বেশি স্বাধীনতা দেওয়া প্রয়োজন।
এস এম/ ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬







