সম্পাদকের পাতা

বিশ্ববাজার ধরতে কানাডাকেই বেছে নিচ্ছে মার্কিন ব্যবসায়ীরা

নজরুল মিন্টো

যুক্তরাষ্ট্র থেকে এখন উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছেন মার্কিন ব্যবসায়ীরা। কেউ নিজেদের কারখানার উৎপাদন কানাডায় সরিয়ে নিচ্ছেন, কেউ নতুন পণ্য তৈরির জায়গা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন অন্টারিও বা কুইবেককে, আবার কেউ হিসাব কষছেন কানাডায় শক্ত ঘাঁটি তৈরি করলে ইউরোপ, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাজারে পৌঁছানো কতটা সহজ হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল উৎপাদনকে আমেরিকায় ফিরিয়ে আনা। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পণ্য বিক্রি করা কিছু মার্কিন কোম্পানির কাছে সেই শুল্কই এখন কানাডাকে আরও সুবিধাজনক ব্যবসাকেন্দ্রে পরিণত করছে।

ম্যাসাচুসেটসভিত্তিক Wildlife Acoustics তাদের প্রধান পণ্যগুলোর উৎপাদনের বড় অংশ ২০২৭ সালে অন্টারিওর মার্কহ্যামে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে কানাডায় উৎপাদন করলে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় খরচ প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। ভারমন্টের Howell Ski Bindings আবার ভবিষ্যৎ উৎপাদনের জন্য কুইবেককে বেছে নেওয়ার কথা ভাবছে। দুটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসাই আন্তর্জাতিক বাজারনির্ভর। ফলে তাদের কাছে প্রশ্নটি শুধু কোথায় কারখানা হবে তা নয়, বরং কোথা থেকে কম খরচে ও কম বাধায় বিশ্বের আরও বেশি বাজারে পণ্য পৌঁছানো যাবে। এই জায়গাতেই কানাডার বড় সুবিধা।

গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার হিসাবে দেশটির ১৫টি কার্যকর মুক্তবাণিজ্য চুক্তি ৫১টি দেশের বাজারের সঙ্গে যুক্ত। এই বাণিজ্য নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে প্রায় দেড়শ কোটি মানুষ এবং বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ৬১ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে CETA, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্যসহ সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে CPTPP এবং উত্তর আমেরিকার বাণিজ্যব্যবস্থা কানাডায় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সামনে একসঙ্গে কয়েকটি মহাদেশের দরজা খুলে দেয়। কানাডা একমাত্র জি-৭ দেশ, যার অন্য সব জি-৭ দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি কার্যকর রয়েছে।

ট্রাম্পের চাপিয়ে দেওয়া শুল্কের পর কানাডার এই সুবিধা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে বসে কোনো কোম্পানি যদি বিদেশ থেকে ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল কিংবা অন্য কোনো কাঁচামাল আমদানি করে, শুল্কের কারণে তার উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। এরপর সেই পণ্য ইউরোপ বা এশিয়ায় বিক্রি করতে গেলে তাকে বিদেশি প্রতিযোগীদের সঙ্গে লড়তে হয়। ফলে ট্রাম্পের শুল্ক শুধু আমদানির খরচ বাড়াচ্ছে না, বিশ্ববাজারে কিছু মার্কিন কোম্পানির প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতাও কমিয়ে দিচ্ছে।

অন্যদিকে কানাডার আকর্ষণ শুধু মুক্তবাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন ব্যবসায়িক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশটির করব্যবস্থাও সুবিধাজনক। গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, নতুন বিনিয়োগের ওপর কানাডার কার্যকর করের হার জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায়ও কম। এর সঙ্গে রয়েছে উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মীবাহিনী, তুলনামূলক স্থিতিশীল আর্থিক ব্যবস্থা এবং নিয়মকানুনের ধারাবাহিকতা। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে এগুলো বড় সুবিধা।

উৎপাদন খাতেও কানাডা দিচ্ছে আলাদা প্রণোদনা। অন্টারিওতে উৎপাদন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ‘অন্টারিও মেইড’ উৎপাদন বিনিয়োগ করছাড়ের আওতায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ফেরতযোগ্য করসুবিধা পাওয়া যায়, বছরে যার সর্বোচ্চ পরিমাণ ৩০ লাখ ডলার। পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি উৎপাদন এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণের নির্দিষ্ট বিনিয়োগে ফেডারেল সরকারও ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ফেরতযোগ্য করছাড় দিয়ে থাকে। অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠান কানাডায় কারখানা বা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালে শুধু বিশ্ববাজারে প্রবেশের সুবিধাই নয়, বিনিয়োগের খরচ কমানোর সুযোগও পেতে পারে।

এর সঙ্গে রয়েছে কানাডার ভৌগোলিক সুবিধা। দেশের বড় শিল্পাঞ্চলগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের খুব কাছাকাছি। আবার পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলের বন্দর দিয়ে সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে ইউরোপ ও এশিয়ার সঙ্গে। ইনভেস্ট ইন কানাডার হিসাবে দেশে ১৩টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ১৭টি সমুদ্রবন্দর এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১১৭টি সীমান্ত ক্রসিং রয়েছে। ফলে কানাডায় উৎপাদন ঘাঁটি গড়েও একটি মার্কিন কোম্পানি নিজের দেশের বিশাল বাজারের কাছাকাছি থাকতে পারে, একই সঙ্গে সহজে পৌঁছাতে পারে বিশ্বের অন্য বড় বাজারে।

অন্টারিওর সরকারি ক্রয়নীতিও মার্কিন কোম্পানিগুলোকে নতুন করে হিসাব করতে বাধ্য করছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে অন্টারিও সরকার অনেক সরকারি কেনাকাটা ও চুক্তিতে মার্কিন কোম্পানির অংশগ্রহণ সীমিত করেছে। ফলে যেসব মার্কিন প্রতিষ্ঠানের বড় গ্রাহক অন্টারিও সরকার বা প্রাদেশিক সরকারি সংস্থা, তাদের জন্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রে বসে ব্যবসা চালানো আগের মতো সহজ নয়। কানাডায় কার্যক্রম ও উৎপাদন বাড়ালে একদিকে অন্টারিওর বাজারের কাছে থাকা যায়, অন্যদিকে কানাডার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধাও কাজে লাগানো যায়। ফলে কানাডায় উপস্থিতি বাড়ানো এখন তাদের কাছে সরাসরি ব্যবসায়িক হিসাবেরও অংশ।

বিদেশি বিনিয়োগের পরিসংখ্যানেও কানাডার প্রতি আগ্রহের বড় চিত্রটি ধরা পড়ে। ২০২৫ সালে কানাডায় প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৯৩.২ বিলিয়ন ডলার, যা গত ১০ বছরের গড়ের চেয়ে ৬১ শতাংশ বেশি। একই বছরে বিদেশি কোম্পানিগুলো তাদের কানাডীয় কার্যক্রমে ৩৩.২ বিলিয়ন ডলার পুনর্বিনিয়োগ করেছে। অর্থাৎ নতুন বিনিয়োগ আসার পাশাপাশি যারা ইতোমধ্যে কানাডায় ব্যবসা করছে, তাদের একটি বড় অংশও এখানে আরও অর্থ ঢালছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প চেয়েছিলেন শুল্কের দেয়াল তুলে উৎপাদনকে আমেরিকায় ফিরিয়ে আনতে এবং কানাডার ব্যবসাকে যুক্তরাষ্ট্রে টেনে নিতে। কিন্তু সেই কৌশল এখন উল্টো ফল দেখাচ্ছে। তিনি যতই শুল্কের দেয়াল উঁচু করছেন, ততই মার্কিন ব্যবসায়ীরা সীমান্তের এপারে তাকিয়ে দেখছেন। তাঁদের হিসাব বলছে, বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর পথে কানাডাই এখন খুলে দিচ্ছে সম্ভাবনার বড় দুয়ার।

তথ্যসূত্র: Toronto Star, Global Affairs Canada

Back to top button