লন্ডনের ক্যানসার গবেষণার ৯২ হাজার পাউন্ড আত্মসাতের অর্থে বিয়ে ও হানিমুন শেষে কারাগারে তামিম
নজরুল মিন্টো

ক্যানসার গবেষণার জন্য বরাদ্দ অর্থ ফেরত আসার কথা ছিল একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের তহবিলে। সেই টাকা পৌঁছানোর আগেই বদলে গেল ব্যাংক হিসাবের তথ্য। প্রতিষ্ঠানের লেটারহেডে পাঠানো একটি ই-মেইল দেখে লন্ডনের রয়্যাল মার্সডেন এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট (The Royal Marsden NHS Foundation Trust) অর্থ পাঠাল। কিন্তু সেটি গেল প্রতিষ্ঠানের হিসাবে নয়, সেখানে কাজ করা এক তরুণের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে।
এরপর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শুরু হয় খরচের ধুম। ব্যক্তিগত দেনা শোধ, বিয়ের আয়োজন, হানিমুন, দামি জিনিস কেনা, স্বজনদের কাছে টাকা পাঠানো এবং কাতার যাওয়ার বিমান টিকিট। এমনকি ১৪ হাজার পাউন্ডের একটি আংটিও কেনা হয়েছিল সেই অর্থে। শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের সন্দেহে হিসাবটি জব্দ হয়, পুলিশ তদন্তে নামে এবং ধরা পড়ে পুরো ঘটনা।
যুক্তরাজ্যের লন্ডনে স্তন ক্যানসার গবেষণাবিষয়ক দাতব্য সংস্থা Breast Cancer Now থেকে প্রায় ৯২ হাজার পাউন্ড আত্মসাতের ঘটনায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ২৯ বছর বয়সী তামিম চৌধুরীকে দুই বছর ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। প্রতারণা ও অর্থ পাচারের অভিযোগে দোষ স্বীকারের পর গত ১ সেপ্টেম্বর রয়্যাল কোর্টস অব জাস্টিসে তাঁকে এই সাজা দেওয়া হয়।
সিটি অব লন্ডন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তামিম চৌধুরী পূর্ব লন্ডনের হ্যাকনিতে থাকতেন এবং ব্রেস্ট ক্যানসার নাউয়ের অর্থ বিভাগে কাজ করতেন। দাতব্য সংস্থাটি রয়্যাল মার্সডেনসহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে অনুদান দেয়। ২০২৩ সালে রয়্যাল মার্সডেনের কাছ থেকে ৯১ হাজার ৯৬৬ পাউন্ড ৭২ পেন্স ফেরত পাওয়ার কথা ছিল সংস্থাটির।
তদন্তে বেরিয়ে আসে, ২০২৩ সালের ১১ আগস্ট তামিম তাঁর অফিসের ই-মেইল ব্যবহার করে রয়্যাল মার্সডেনের কাছে পরিবর্তিত ব্যাংক তথ্য পাঠান। ই-মেইলটি ছিল ব্রেস্ট ক্যানসার নাউয়ের লেটারহেডে। তবে তাতে দেওয়া ব্যাংক হিসাবটি ছিল তাঁর নিজের স্যান্টান্ডার (Santander) ব্যাংক অ্যাকাউন্ট।
প্রায় এক বছর পর, ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট পুরো অর্থ তাঁর ব্যক্তিগত হিসাবে জমা হয়। অর্থ হাতে আসার পর খুব বেশি সময় নেননি তামিম। পুলিশ বলছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মাত্র দুই দিনেই তিনি ৪৯ হাজার ১০০ পাউন্ড ৪৭ পেন্স খরচ করেন।
তাঁর মোবাইল ফোন থেকে উদ্ধার করা বার্তায় দেখা যায়, অর্থ হাতানোর আগে তিনি নিজেকে চরম আর্থিক সংকটে থাকা ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তদন্তকারীরা পরে দেনা আদায়ের প্রতিষ্ঠানে তাঁর অর্থ পরিশোধের প্রমাণ পান। এ ছাড়া বিয়ে ও হানিমুনের ব্যয়, বিলাসপণ্য কেনা, নগদ অর্থ উত্তোলন, কাতারের বিমান টিকিট এবং স্বজনদের কাছে টাকা পাঠানোর তথ্যও মেলে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি আলেকজান্ডার ব্রাউন আংটি কিনতেই খরচ হয়েছিল ১৪ হাজার পাউন্ড। দাতব্য প্রতিষ্ঠানের গবেষণার অর্থ এভাবে ব্যক্তিগত ভোগে ব্যয় হওয়ার ঘটনাটি ধরা পড়ে মূলত ব্যাংকের সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তের পর। স্যান্টান্ডার হিসাবটি জব্দ করে পরে বন্ধ করে দেয়। ততক্ষণে সেখানে ৪২ হাজার ৮৬৬ পাউন্ড ২৫ পেন্স ছিল, যা উদ্ধার করা হয়।
ব্রেস্ট ক্যানসার নাউয়ের অভিযোগের পর ২০২৫ সালের জুনে সিটি অব লন্ডন পুলিশের জালিয়াতি তদন্ত দল তামিমকে গ্রেপ্তার করে। মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিটেকটিভ কনস্টেবল ইউসুফ মির্জা বলেন, জীবনরক্ষাকারী স্তন ক্যানসার গবেষণায় অর্থ জোগানো একটি প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসের জায়গাটিই ব্যবহার করেছিলেন তামিম।
দাতব্য সংস্থাটি জানিয়েছে, তদন্তে তারা পুলিশের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করেছে এবং ঘটনার পর নিজেদের অভ্যন্তরীণ আর্থিক ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করেছে। ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ উদ্ধার হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সংস্থাটির আর্থিক ক্ষতি হয়নি বলে তারা জানিয়েছে।
ছবি ও তথ্যসূত্র: সিটি অব লন্ডন পুলিশ।
এনএন/ ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬







