
১৯৮৭ সালের ১ নভেম্বর, রোববার সকাল। হিউস্টনের Quick-n-Easy নামের ছোট্ট একটি কনভেনিয়েন্স স্টোরের সামনে এসে থামে একটি ট্যাক্সি। আগের রাতে কাজ শেষে পরিচিত সাজেদুল চৌধুরীর বাসায় যাওয়ার কথা ছিল মোহাম্মদ জাকির হাসানের। দোকানের কাছাকাছি হওয়ায় সেখানে প্রায়ই রাত কাটাতেন তিনি। কিন্তু সেদিন আর যাননি। তাই সকাল হতেই তাঁকে খুঁজতে বের হন সাজেদুল। দোকানে এসে দেখেন, পার্কিং লটে জাকিরের গাড়ি দাঁড়িয়ে, ভেতরে আলো জ্বলছে, অথচ দরজা তালাবদ্ধ।
দৃশ্যটি দেখে সাজেদুলের মনে অস্বস্তি জাগে। তিনি নিজেও ওই দোকানে কাজ করতেন, তাই তাঁর কাছে চাবি ছিল। সেই চাবি দিয়ে সঙ্গে থাকা ট্যাক্সিচালককে নিয়ে ভেতরে ঢোকেন। কাউন্টারের নিচের সেফ খোলা, ভেতরে পড়ে আছে শুধু কয়েকটি কয়েন। এরপর ট্যাক্সিচালক দোকানের পেছনের দিকে গিয়ে দেখতে পান, বাথরুমের মেঝেতে রক্তের মধ্যে কুঁকড়ে পড়ে আছে জাকির হাসানের নিথর দেহ।
তাঁকে খুব কাছ থেকে তিনটি গুলি করা হয়েছিল। দুটি মাথায়, একটি বুকে। দোকানের ক্যাশ রেজিস্টারে শেষ লেনদেনটি হয়েছিল রাত ১টা ৩ মিনিটে। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে মানুষটি কাউন্টারের পেছনে দাঁড়িয়ে কাজ করছিলেন, সকাল হওয়ার আগেই তাঁর জীবন থেমে যায়। মাত্র ২৮ বছর বয়সে।
মোহাম্মদ জাকির হাসান আমেরিকায় এসেছিলেন অন্য অনেক অভিবাসীর মতোই একটি স্বপ্ন নিয়ে। পরিশ্রম করবেন, টাকা জমাবেন, একদিন নিজের একটি ব্যবসা দাঁড় করাবেন। আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে তাঁকে পরিশ্রমী ও মিতব্যয়ী মানুষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। কনভেনিয়েন্স স্টোরে কাজ করতেন আর টাকা জমাচ্ছিলেন নিজের একটি দোকান কেনার জন্য। অন্যের দোকানের কাউন্টারের পেছনে দাঁড়িয়ে জাকির আসলে গড়ে তুলছিলেন নিজের ভবিষ্যৎ।
কিন্তু ১৯৮৭ সালের সেই রাতেই থেমে যায় তাঁর আমেরিকান স্বপ্ন। প্রথম দেখায় ঘটনাটি ছিল একটি ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ড। সেফ থেকে টাকা উধাও, দোকানের কর্মী নিহত। কিন্তু তদন্ত যত এগোয়, ততই বেরিয়ে আসতে থাকে পরিচিত মুখ, পালিয়ে যাওয়া দুই তরুণ, অস্ত্রের সূত্র আর এমন সব সাক্ষ্য, যা পুরো হত্যাকাণ্ডকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
তদন্তের কেন্দ্রে উঠে আসে দুই বাংলাদেশির নাম, সৈয়দ মোহাম্মদ রব্বানী ও শিবলি খান। জাকির তাঁদের চিনতেন। আর রাষ্ট্রপক্ষের মামলার ভাষ্য অনুযায়ী, সেই পরিচয়ই শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হাসানুর রহমান পরে আদালতে বলেন, রব্বানী তাঁকে জানিয়েছিলেন, তিনি ও শিবলি জাকিরের দোকানে গিয়ে ডাকাতির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। একপর্যায়ে তাঁরা বুঝতে পারেন, জাকির তাঁদের চিনতে পেরেছেন। তিনি বেঁচে থাকলে তাঁদের শনাক্ত করতে পারবেন। তখনই তাঁকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
হাসানুর রহমানের সাক্ষ্য অনুযায়ী, রব্বানী তাঁকে বলেছিলেন, জাকির বুঝতে পেরেছিলেন কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে এবং কাউন্টারের কাছে থাকা নিরাপত্তা বোতাম চাপার চেষ্টা করেছিলেন। এরপর রব্বানী ও শিবলি তাঁকে দোকানের পেছনের কুলারের দিকে তাড়া করেন। তারপর গুলি। একটি নয়, তিনটি। দুটি মাথায়, একটি বুকে। পরে জাকিরের মরদেহ পাওয়া যায় দোকানের পেছনের বাথরুমের মেঝেতে; সেখানে গুলির চিহ্নও পাওয়া যায়।
হত্যার রাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও উঠে আসে হাসানুর রহমানের সাক্ষ্যে। রাত দুইটা থেকে আড়াইটার দিকে শিবলি তাঁর বাসায় গিয়ে অস্বাভাবিক জোরে দরজায় ধাক্কা দেন এবং নাম ধরে ডাকেন। রহমান দরজা খোলেননি। পরে গ্র্যান্ড জুরির সামনে তিনি বলেছিলেন, বাইরে শিবলির সঙ্গে রব্বানীর কণ্ঠও শুনেছিলেন। জাকিরের হত্যার খবর জানার কয়েক দিন পর তিনি দুজনকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করেন।
রহমান আদালতে বলেন, প্রথমবার প্রশ্ন করতেই রব্বানীকে নার্ভাস দেখাচ্ছিল। তিনি রহমানকে বলেন, “তুমি এতে জড়িয়ো না।” কিন্তু কয়েক দিন পর আবার কথা হলে রব্বানী জানান, তিনি ও শিবলি দুজনই দোকানে ছিলেন এবং জাকির হত্যায় জড়িত ছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দোকানে ডাকাতি করার পর তাঁরা তাঁকে হত্যা করেন, কারণ তিনি দুজনকেই শনাক্ত করতে পারতেন। শিবলি রহমানকে বলেছিলেন, ডাকাতিতে তিন থেকে চারশ ডলার নেওয়া হয়েছিল। তবে Quick-n-Easy-এর ব্যবস্থাপক আদালতে সাক্ষ্য দেন, সেফ থেকে ৬৩০ ডলার নিখোঁজ ছিল।
হত্যার পর রব্বানী ও শিবলির চলাফেরা সন্দেহ আরও বাড়ায়। নিজের নিরাপত্তার ভয়ে হাসানুর রহমান পুলিশকে কিছু জানাননি। অথচ ৯ নভেম্বর, হত্যার আট দিন পর, তিনিই দুজনকে গাড়িতে করে লুইজিয়ানা নিয়ে যান এবং একটি গ্রেহাউন্ড বাসস্টেশনে নামিয়ে দেন। সেখান থেকে রব্বানী ও শিবলি নিউইয়র্কের টিকিট কাটেন।
২৩ নভেম্বর ব্রুকলিনে তাঁদের দেখা হয় মোহাম্মদ আবদুস সালামের সঙ্গে। আদালতের নথিতে সালামকে ব্রুকলিনের বাসিন্দা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি সাক্ষ্য দেন, সেদিন রব্বানী ও শিবলির কাছে দুটি পিস্তল দেখেছিলেন। পরে রব্বানীর হাতে আর অস্ত্র দেখেননি, কিন্তু শিবলির কাছে একটি পিস্তল ছিল। একই দিন নিজের সদ্য কেনা খালি ব্রিফকেসের ভেতর একটি বন্দুক খুঁজে পান সালাম। আগেই রব্বানী তাঁর কাছে ব্রিফকেসটি কোথায় রাখা আছে এবং তালার নম্বর জানতে চেয়েছিলেন। সালাম বন্দুকটি নিউইয়র্ক পুলিশের কাছে জমা দেন।
২৬ নভেম্বর রব্বানী ও শিবলি আবার হিউস্টনে ফিরে আসেন। কয়েক দিন সাজেদুল চৌধুরীর বাসায়ও থাকেন। তাঁদের আচরণে সন্দেহ হওয়ায় ১ ডিসেম্বর সাজেদুল হ্যারিস কাউন্টি শেরিফের একজন কর্মকর্তাকে খবর দেন। পুলিশ আসছে শুনে রব্বানী ও শিবলি কাপড়চোপড় নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু বাইরে পুলিশ অপেক্ষা করছিল। নিউইয়র্কের নম্বরপ্লেট লাগানো একটি গাড়িতে চলে যাওয়ার চেষ্টা করার সময় দুজনই গ্রেপ্তার হন।
গ্রেপ্তারের পর অস্ত্রের সূত্র ধরে তদন্ত আরও এগোয়। রব্বানী পুলিশকে জানান, তাঁর ও শিবলির কাছে দেখতে প্রায় একই রকম দুটি অস্ত্র ছিল। শিবলির নির্দেশে ৩০ নভেম্বর দ্বিতীয় অস্ত্রটি তিনি একটি কনভেনিয়েন্স স্টোরের ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিলেন। তাঁর দেওয়া নির্দেশনা ধরে পুলিশ সেখান থেকে .৩৮ ক্যালিবারের একটি Rohm রিভলভার ও একজোড়া গ্লাভস উদ্ধার করে। ময়নাতদন্তে জাকিরের বুক থেকে পাওয়া গুলিটি পরীক্ষা করে আগ্নেয়াস্ত্র বিশেষজ্ঞ আদালতে বলেন, সেটি ওই ডাস্টবিন থেকে উদ্ধার করা রিভলভার থেকেই ছোড়া হয়েছিল। নিউইয়র্কে পাওয়া অস্ত্রটিও ছিল একই ধরনের .৩৮ ক্যালিবার Rohm রিভলভার।
তারপরও একটি প্রশ্ন থেকে যায়। জাকিরকে সরাসরি কে গুলি করেছিল, রব্বানী নাকি শিবলি? জুরি সেই প্রশ্নের আলাদা উত্তর দেয়নি। টেক্সাসের ‘ল অব পার্টিজ’ বা সহযোগী দায়বদ্ধতার আইনে একজন নিজে গুলি না চালালেও হত্যায় সহায়তা, উৎসাহ বা সহযোগিতা করলে একই অপরাধে দোষী হতে পারেন। আদালত পরে বলে, রাষ্ট্রপক্ষ নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করতে না পারলেও যে রব্বানীর হাত থেকেই প্রাণঘাতী গুলি বের হয়েছিল, অন্তত সহযোগী হিসেবে হত্যাকাণ্ডে তাঁর অংশগ্রহণ প্রমাণের জন্য সাক্ষ্য যথেষ্ট ছিল। সেই মামলায় রব্বানী ক্যাপিটাল মার্ডারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন এবং তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
জাকির হত্যার ঘটনার পাশে আদালতের নথিতে উঠে আসে আরও একটি রহস্যময় মৃত্যু। প্রায় এক মাস পর, ৩০ নভেম্বর, খায়রুল কবির নামে এক ব্যক্তিকে তাঁর অ্যাপার্টমেন্টের বাথরুমে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর দুই হাত পেছনে হাতকড়া পরানো এবং মাথায় গুলির ক্ষত ছিল। আগের দিন শিবলি খান তাঁর বাসায় গিয়েছিলেন। খায়রুলের বন্ধু মইনুদ্দিন সালেহ আদালতে বলেন, শিবলি চলে যাওয়ার পর খায়রুল জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলেছিলেন, “পিন্টু বাইরে আছে।” আদালতের নথিতে পিন্টু বলতে রব্বানীকেই বোঝানো হয়েছে। রব্বানীর সাজা নির্ধারণের সময় রাষ্ট্রপক্ষ এই ঘটনা আদালতে তুলেছিল। তবে প্রকাশিত রায়ে রব্বানী বা শিবলিকে খায়রুল কবির হত্যায় দোষী সাব্যস্ত করার কোনো তথ্য নেই।
কিন্তু শিবলি খানের শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর প্রকাশিত এই আপিল রায়ে নেই। জাকির হত্যার রাত, নিউইয়র্ক যাত্রা, অস্ত্র নিয়ে দেখা যাওয়া, হিউস্টনে ফিরে আসা এবং রব্বানীর সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া পর্যন্ত তাঁর উপস্থিতির বিস্তারিত বর্ণনা আছে। অথচ তাঁর নিজের বিচার, সাজা কিংবা পরবর্তী জীবনের কোনো বিবরণ ওই রায়ে পাওয়া যায় না।
পরবর্তী সাড়ে তিন দশকে হন্তারক সৈয়দ রব্বানীর নাম ঘিরে তৈরি হয়েছে আরেকটি দীর্ঘ আইনি ইতিহাস। তাঁর আপিল প্রায় ২৮ বছর পড়ে ছিল, পরে মৃত্যুদণ্ড বাতিল হয়েছে, গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তিনি এখনও কারাগারে আছেন। সেই গল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে আদালতে, সংবাদমাধ্যমে, মানবাধিকার মহলে। কিন্তু সেই আলোচনার আড়ালে হারিয়ে গেছেন যে মানুষটির হত্যাকাণ্ড থেকে এই দীর্ঘ মামলার শুরু, তিনি মোহাম্মদ জাকির হাসান।
জাকিরের জন্য কোনো আপিলের অপেক্ষা ছিল না, নতুন কোনো শুনানিও ছিল না। তাঁকে ফিরিয়ে আনার মতো কোনো আদালতের রায়ও আর আসতে পারত না। ২৮ বছরের এই তরুণ অন্যের দোকানে কাজ করে নিজের একটি দোকান কেনার স্বপ্ন দেখতেন। সামনে পড়ে ছিল একটি অনিশ্চিত কিন্তু সম্ভাবনায় ভরা জীবন। ব্যবসা হতে পারত, সংসার হতে পারত, সন্তান হতে পারত। কিন্তু যে দোকানের কাউন্টারের পেছনে দাঁড়িয়ে নিজের ভবিষ্যতের জন্য টাকা জমাচ্ছিলেন, সেই কর্মস্থলেই এক রাতে থেমে যায় তাঁর জীবন।
চার দশক পর পুরোনো আদালতের নথি খুললে পাওয়া যায় গুলির হিসাব, অস্ত্রের হিসাব, সাক্ষীর বয়ান, পালিয়ে যাওয়ার পথ আর দীর্ঘ বিচারের ইতিহাস। পাওয়া যায় দোকানের সেফ থেকে হারিয়ে যাওয়া ৬৩০ ডলারের হিসাবও। কিন্তু কোনো নথিই বলতে পারে না, ২৮ বছর বয়সে থেমে যাওয়া জাকির হাসানের সামনে আর কতটা জীবন ছিল, কত স্বপ্ন ছিল, কত সম্ভাবনা ছিল। আদালত হত্যার বিচার করতে পারে, কিন্তু কেড়ে নেওয়া সেই জীবন আর ফিরিয়ে দিতে পারে না।
তথ্যসূত্র:
Texas Court of Criminal Appeals
The Texas Tribune









