সম্পাদকের পাতা

এক ফুল দো মালি রিটার্নস

নজরুল মিন্টো

স্কারবরো সাউথওয়েস্টে এখন একটি বিগ বাজেটের রাজনৈতিক সিনেমার শুটিং চলছে। বহুল আকাঙ্ক্ষিত এ ছবির নাম, ‘এক ফুল দো মালি রিটার্নস’।

১৯৬৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘এক ফুল দো মালি’ ছিল দেবেন্দ্র গোয়েল পরিচালিত একটি সুপারহিট হিন্দি ছবি। সঞ্জয় খান, সাধনা ও বলরাজ সাহনি অভিনীত ছবিটির গল্প আবর্তিত হয়েছিল ভালোবাসা, আত্মত্যাগ এবং একটি শিশুকে ঘিরে দুই বাবার টানাপোড়েন নিয়ে। সময়ের সঙ্গে ছবিটির নাম অবশ্য মূল কাহিনি ছাড়িয়ে লোকমুখে অন্য অর্থও পেয়েছে। একজন নারীকে ঘিরে দুই পুরুষের প্রতিযোগিতা দেখা দিলেই রসিকজনেরা সুযোগ বুঝে বলে ওঠেন, ‘এক ফুল দো মালি’।

স্কারবরো সাউথওয়েস্টের আসন্ন প্রাদেশিক উপনির্বাচনেও তেমন একটি দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে। আলোচনায় থাকা প্রধান তিন প্রতিযোগীর মধ্যে একমাত্র নারী এনডিপির ফাতেমা শাবান। তাঁর দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী লিবারেল পার্টির আহসানুল হাফিজ এবং প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ পার্টির ডা. নূর তরুন। সেই সুবাদে এলাকার রসিকজনেরা ইতিমধ্যে ফাতেমাকে ‘ফুল’ এবং আহসানুল ও তরুনকে ‘দুই মালি’ বানিয়ে দিয়েছেন।

অবশ্য নির্বাচনের কাস্টিং সিনেমার পোস্টারের চেয়ে একটু উদার। গ্রিন পার্টির মার্ক বেকারিংয়ের পাশাপাশি নিউ ব্লু পার্টির ক্রিস রিসও প্রার্থী হিসেবে ঘোষিত হয়েছেন। ফলে পোস্টারে মূল চরিত্র তিনজন হলেও নির্বাচনী পর্দায় ঘোষিত চরিত্র এখন অন্তত পাঁচজন। আর প্রযোজক-পরিচালকেরা যত বাঘা বাঘাই হোন না কেন, পর্দার আড়ালে দাপুটে পার্শ্বচরিত্র হিসেবে সক্রিয় রয়েছেন ‘কুটিমুটি’রাও।

এই আসনটি ২০১৮ সাল থেকে এনডিপির দখলে। ওই বছর ডলি বেগম এখানে প্রথমবার এনডিপির পতাকা ওড়ান। এরপর ২০২২ ও ২০২৫ সালেও তিনি জয়ী হন। টানা তিন নির্বাচনের সাফল্যে এনডিপি স্বাভাবিকভাবেই আসনটিকে নিজেদের রাজনৈতিক বাগান বলে মনে করে। সমস্যা হলো, সেই বাগানের সবচেয়ে পরিচিত মুখ ডলি বেগম এখন কমলা রঙের পোশাক খুলে লাল রঙের ফেডারেল ঠিকানায় চলে গেছেন। বাগানটি একই জায়গায় আছে, কিন্তু পুরোনো মালিকানার সাইনবোর্ডটি আর আগের রঙে নেই।

এনডিপি অবশ্য বাগানটি হাতছাড়া করতে রাজি নয়। তাদের প্রার্থী ফাতেমা শাবান স্কারবরো সাউথওয়েস্টের পরিচিত মুখ। দেখতে যেমন সুন্দরী, কথাবার্তায়ও তেমনই। সিনেমার নায়িকারাও তাঁর কাছে হার মানেন। তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থিতি, সাবলীল কথাবার্তা আর হাসি, এই তিনটিই প্রচারের মাঠে তাঁর বাড়তি পুঁজি। মিশরীয় বাবা ও স্লোভাক মায়ের সন্তান ফাতেমা স্থানীয় বাসিন্দা এবং ভাড়াটেদের অধিকার নিয়ে সক্রিয় সংগঠক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এনডিপির সঙ্গে যুক্ত। ২০২৫ সালের ফেডারেল নির্বাচন এবং ২০২৬ সালের ফেডারেল উপনির্বাচনে এই আসন থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। অর্থাৎ এলাকার রাস্তা, বাড়ির দরজা এবং ভোটারদের দরজার ঘণ্টা তাঁর বেশ পরিচিত। তাঁর সেই লাখ টাকার হাসি দেখতে বুড়োরাও তাঁর অফিসে গিয়ে বসে থাকেন।

এনডিপির আশাবাদের পেছনে একটি গাণিতিক হিসাবও রয়েছে। নির্বাচনী পূর্বাভাসবিষয়ক ওয়েবসাইট 338Canada সম্প্রতি মডেলভিত্তিক প্রক্ষেপণে স্কারবরো সাউথওয়েস্টে এনডিপিকে এগিয়ে রেখেছে। তবে এটিকে সরাসরি জনমত জরিপ বলা ঠিক হবে না। আগের নির্বাচনের ফল, প্রাদেশিক ও আঞ্চলিক জনমত এবং গাণিতিক মডেল মিলিয়ে 338Canada সম্ভাব্য ফলের একটি চিত্র তৈরি করে। সহজ ভাষায়, এটি নির্বাচনী আবহাওয়ার পূর্বাভাস। আকাশে মেঘ দেখে বৃষ্টির সম্ভাবনা বলা যায়, কিন্তু ছাতা খুলতেই হবে কি না, সেটি শেষ পর্যন্ত আকাশই ঠিক করে।

অন্যদিকে কানাডাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Mainstreet Research-এর পরিচালিত একটি জরিপে হিসাবটি একেবারে উল্টো দেখা গিয়েছিল। স্কারবরো সাউথওয়েস্টের ৪৬৪ জন বাসিন্দার মতামতের ভিত্তিতে প্রকাশিত ওই জরিপে সিদ্ধান্ত জানানো ভোটারদের মধ্যে অন্টারিও লিবারেল পার্টির সমর্থন ছিল ৪৩ শতাংশ। প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ পার্টি পেয়েছিল ২৯ শতাংশ এবং এনডিপি ১৯ শতাংশ। বাকি প্রায় ৯ শতাংশ গ্রিন পার্টি কিংবা অন্য কোনো বিকল্পের দিকে ছিলেন। তবে মোট উত্তরদাতার ২২ শতাংশ তখনো সিদ্ধান্তহীন ছিলেন। তা ছাড়া জরিপটি যখন করা হয়, তখন বর্তমান প্রার্থীদের কেউই চূড়ান্ত হননি।

এই জরিপে লিবারেলরা পিসির চেয়ে ১৪ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে ছিল। কিন্তু জরিপের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সংখ্যা ৪৩, ২৯ কিংবা ১৯ নয়; সংখ্যাটি ছিল ২২। কারণ পুরো নমুনার ২২ শতাংশ ভোটার তখনো সিদ্ধান্ত নেননি। নির্বাচনে অনির্ধারিত ভোটাররা অনেকটা আমাদের কমিউনিটির ফ্রি পিকনিকের অতিথিদের মতো। আয়োজন কে করেছে, তা নিয়ে তাঁদের বিশেষ মাথাব্যথা নেই; ‘ফ্রি’ শুনলেই তাঁরা হাজির হয়ে যান। তাঁদের ব্যাপক উপস্থিতিতে পিকনিকের হিসাব যেমন মুহূর্তে বদলে যায়, নির্বাচনের অঙ্কও তেমনই ওলটপালট হতে পারে। আবার ‘ফ্রি’ কথাটি শুনে যাঁদের আত্মসম্মানে বাধে, তাঁরা না এলে হিসাব দাঁড়ায় অন্যরকম। নির্বাচনের দিন সিদ্ধান্তহীন এই ২২ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে যান কি না এবং গেলে কার নামের পাশে চিহ্ন দেন, তার ওপরই পুরো অঙ্ক বদলে যেতে পারে।

লিবারেল প্রার্থী আহসানুল হাফিজের ভরসা এই জরিপ, দলের সাম্প্রতিক গতি এবং নিজের সাংগঠনিক শক্তি। প্রায় ২৫ বছর আগে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে কানাডায় আসা আহসানুল পড়াশোনার সময় পিৎজা ডেলিভারি করতেন। এখন অন্টারিওজুড়ে তাঁর ৩০টি ডমিনোজ পিৎজা স্টোর রয়েছে। পিৎজা মানুষের দরজায় পৌঁছে দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর অনেক দিনের। এবার তিনি নিজেই ভোটারদের দরজায় পৌঁছাচ্ছেন। তবে নির্বাচন পিৎজার মতো নয়। পিৎজা দেরি হলে গ্রাহক ফোন করেন, আর ভোট দেরি হলে প্রার্থীই ভোটারকে ফোন করেন। অর্ডার দিলেই ভোট বাড়িতে পৌঁছে যায় না; প্রতিটি ভোট আলাদাভাবে অর্জন করতে হয়।

প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ প্রার্থী ডা. নূর তরুনও এ এলাকার ভোটারদের অপরিচিত নন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে স্কারবরোতে বসবাসকারী এই পারিবারিক চিকিৎসক গ্রেটার টরন্টো এলাকায় ছয়টি মেডিকেল ক্লিনিক ও একটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাকেন্দ্র পরিচালনা করেন। ২০২৫ সালের ফেডারেল নির্বাচনে তিনি কনজারভেটিভ প্রার্থী হিসেবে ১৬ হাজার ৬৫২ ভোট পেয়েছিলেন, যা মোট বৈধ ভোটের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ।

সমস্যা হলো, 338Canada যখন এনডিপিকে এগিয়ে রেখেছে, Mainstreet Research তখন লিবারেলদের সামনে বসিয়েছে, আর ডা. তরুনের পকেটে রয়েছে আগের নির্বাচনের প্রায় ১৭ হাজার ভোটের হিসাব। তার ওপর ঘোষিত প্রার্থীদের সামনে রেখে নতুন কোনো প্রকাশ্য প্রার্থীকেন্দ্রিক জরিপ এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে তিন প্রধান শিবিরই নিজের সুবিধামতো অঙ্ক কষতে পারছে। এনডিপি বলছে, আসনটি আমাদের। লিবারেল বলছে, জরিপটি দেখুন। পিসি বলছে, তরুনের আগের ভোটগুলো আগে গুনে নিন। আর গ্রিন প্রার্থী মার্ক বেকারিং ও নিউ ব্লুর ক্রিস রিস মনে করিয়ে দিচ্ছেন, নির্বাচনের অঙ্ক শুধু তিনজনকে ধরে কষলে উত্তর ভুলও হতে পারে।

অতএব, স্কারবরো সাউথওয়েস্টের নির্বাচন এখন বেশ জটিল অঙ্ক। এখানে দলীয় ঐতিহ্য আছে, ব্যক্তিগত পরিচিতি আছে, অভিবাসী সম্প্রদায়ের নিজস্ব হিসাব আছে, দলবদলের প্রতিক্রিয়া আছে এবং বিপুলসংখ্যক অনির্ধারিত ভোটারও আছেন। তিন দলের হাতে তিনটি ক্যালকুলেটর, অথচ প্রত্যেকটির পর্দায় উত্তর আসছে আলাদা। কে কাকে পেছনে ফেলবেন, তা এখনই বলা কঠিন।

রসিকজনেরা আপাতত ফাতেমাকে মাঝখানে রেখে বলছেন, ‘এক ফুল দো মালি’, ভোট নিয়ে টানাটানি। কিন্তু গণতন্ত্রের বাগানে ফুল কিংবা মালি, কোনো প্রার্থীই মালিক নন। এই বাগানের প্রকৃত মালিক ভোটাররা। প্রার্থীরা যতই পানি ঢালুন, সার ছড়ান কিংবা বাগানের চারপাশে রঙিন সাইনবোর্ড লাগান, শেষ পর্যন্ত বাগানের চাবি কার হাতে যাবে, সেই সিদ্ধান্ত ভোটাররাই নেবেন।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত স্কারবরো সাউথওয়েস্ট প্রাদেশিক উপনির্বাচনের ভোটের তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। ইলেকশনস অন্টারিওর প্রকাশিত সময়সীমা অনুযায়ী, উপনির্বাচন ৫ আগস্টের মধ্যে ডাকতে হবে এবং ভোট গ্রহণ করতে হবে ৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। অর্থাৎ ছবির কাস্টিং প্রায় শেষ, পোস্টারও তৈরি; এখন শুধু হল বুকিংয়ের সরকারি ঘোষণাটি বাকি।

শিগগিরই স্কারবরো সাউথওয়েস্টে মহাসমারোহে শুভমুক্তি পেতে যাচ্ছে ২০২৬ সালের বহুল আলোচিত রাজনৈতিক ছবি, ‘এক ফুল দো মালি রিটার্নস’। এক দিন, একযোগে, সব ভোটকেন্দ্রে প্রদর্শনী। প্রবেশাধিকার শুধু তালিকাভুক্ত ভোটারের। এলাকার বাইরের আগ্রহী দর্শকেরা ফল ঘোষণার রাতে রুপালী পর্দায় চোখ রাখুন।

এনএন/ ০৪ আগস্ট ২০২৬


Back to top button